যৌন নির্যাতনের দায়ে প্রযোজকের ১৫ বছরের কারাদণ্ড

হার্ভি ওয়েনস্টিন। রয়টার্স

যৌন নিপীড়নের মামলায় নতুন করে বিচারের পর হলিউডের সাবেক প্রভাবশালী প্রযোজক হার্ভি ওয়েনস্টিনকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন নিউইয়র্কের আদালত। ২০০৬ সালে সাবেক প্রযোজনা সহকারী মিরিয়াম হ্যালিকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় গতকাল বুধবার এই সাজা ঘোষণা করা হয়।

ওয়েনস্টিননের বিরুদ্ধে নিউইয়র্কে দীর্ঘ ৯ বছরের আইনি লড়াইয়ের এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। ২০২০ সালে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া আগের সাজা চার বছর পর বাতিল হয়ে যায়। এরপর নতুন করে বিচার ও দুটি অমীমাংসিত বিচারপ্রক্রিয়ার পর আবারও তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। নতুন কোনো আপিল সফল না হলে নিউইয়র্কের এই সাজায় তাঁকে কারাগারেই থাকতে হবে।

মামলাটির সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া #মিটু আন্দোলনেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ওয়াইনস্টিনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরই হলিউডসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বহু নারী যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে শুরু করেন।

বুধবার আদালতে ওয়েনস্টিন নিজের বক্তব্যে কারাগারে তাঁর জীবনযাত্রার অভিযোগও তোলেন। নিউইয়র্কের রাইকার্স আইল্যান্ডে বন্দী থাকা অবস্থায় তিনি ‘নির্যাতনমূলক’ পরিবেশের মধ্যে আছেন বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, সেখানে তাঁকে ‘মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত’ করা হচ্ছে এবং পশুর চেয়েও খারাপ আচরণ করা হচ্ছে। বাকি সময় বন্দীদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে চান বলেও জানান তিনি।

নিজের বক্তব্যে ওয়েনস্টিন বলেন, তিনি ‘নিখুঁত মানুষ নন’ এবং জীবনে ভুল করেছেন। ২০১৭ সালের পর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবতে গিয়ে তাঁর আচরণ অন্যদের ওপর কীভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তা তিনি বুঝতে পেরেছেন বলেও জানান। যাঁরা তাঁর কর্মকাণ্ডে আহত হয়েছেন, তাঁদের কাছে ক্ষমা চান তিনি। তবে একই সঙ্গে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।  

হার্ভি ওয়েনস্টিন। রয়টার্স

অন্যদিকে আদালতে আবেগঘন বক্তব্য দেন মিরিয়াম হ্যালি। তিনি বলেন, প্রথমবারের সাজা ঘোষণার ছয় বছর পর আবারও আদালতে দাঁড়াতে হবে, তা তিনি কখনো ভাবেননি। আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটিকে তিনি অত্যন্ত ক্লান্তিকর ও অস্বস্তিকর বলে বর্ণনা করেন। জেরার সময় তাঁকে অপমানজনক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে এবং অনলাইনে হয়রানি ও হুমকিও পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
হ্যালির ভাষায়, অনেক সময় তাঁর মনে হয়েছে যেন ওয়াইনস্টিন নন, তিনিই বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। এমনকি একাধিকবার মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর কথাও ভেবেছিলেন তিনি।

২০০৬ সালের ১০ জুলাই নিউইয়র্কের সোহো এলাকায় ওয়েনস্টিনের অ্যাপার্টমেন্টে জোরপূর্বক তাঁকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছিল বলে হ্যালি আদালতে অভিযোগ করেন। ২০২০ সালের প্রথম বিচারেও তিনি ওয়েনস্টিনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। সেই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ওয়েনস্টিনের সাজা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে নিউইয়র্কের সর্বোচ্চ আদালত সেই দণ্ড বাতিল করে নতুন বিচারের নির্দেশ দেন। পরে ২০২৫ সালের পুনর্বিচারে আবারও সাক্ষ্য দেন হ্যালি। শেষ পর্যন্ত জুরি ওয়াইনস্টিনকে প্রথমস্তরের যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে।

আরও পড়ুন

এদিকে নিউইয়র্কের মামলার পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়াতেও ওয়াইনস্টিনের বিরুদ্ধে সাজা রয়েছে। ২০১৩ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি হোটেলে ইতালীয় মডেল ও অভিনেত্রী এভজেনিয়া চেরনিশোভাকে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় তাঁকে সেখানে আবার সাজা দেওয়ার প্রক্রিয়া সামনে রয়েছে। বিচারক কার্টিস ফারবার জানিয়েছেন, নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ার সাজা একই সময়ে চলবে, নাকি পরপর কার্যকর হবে, সেটি ক্যালিফোর্নিয়ার কর্তৃপক্ষকে নির্ধারণ করতে হবে।

আদালতে ওয়েনস্টিনের আইনজীবীরা তাঁর শারীরিক অবস্থার বিষয়টিও সামনে এনেছেন। ৭৪ বছর বয়সী সাবেক এই প্রযোজক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন এবং চলাফেরায়ও তাঁর গুরুতর সমস্যা রয়েছে। ফলে নতুন এই সাজা তাঁর বাকি জীবন কারাগারে কাটানোর সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে নিউইয়র্কের সহকারী জেলা অ্যাটর্নি নিকোল ব্লামবার্গ আদালতে ওয়েনস্টিনের জন্য ২০ বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি মুক্তির পর পাঁচ বছরের তত্ত্বাবধানের আবেদন করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ওয়াইনস্টিন নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য যথেষ্ট অনুশোচনা দেখাননি এবং প্রকাশ্যে অভিযোগকারীদের দোষারোপ করে গেছেন। ২০২৫ সালে ক্যান্ডেস ওয়েন্সের পডকাস্টে দেওয়া ওয়াইনস্টিনের সাক্ষাৎকারের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

রায়ের পর ম্যানহাটানের জেলা অ্যাটর্নি অ্যালভিন এল ব্র্যাগ জুনিয়র বলেন, এ দিনটি মূলত যৌন নিপীড়নের শিকার ব্যক্তিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মিরিয়াম হ্যালির বক্তব্যের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এই দীর্ঘ ও কঠিন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেও হ্যালি এবং অন্য ভুক্তভোগীরা যে সাহস দেখিয়েছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ।

ভ্যারাইটি অবলম্বনে