সে–ই কবে এসেছিল ‘বেসিক ইন্সটিংক্ট’! সেই সাফল্যের হাত ধরে নব্বইয়ের দশকে এসেছিল এক গাদা ইরোটিক থ্রিলার। ‘ফ্যাটাল অ্যাট্রাকশন’, ‘বডি হিট’, ‘সিঙ্গেল হোয়াইট ফিমেল’–এর মতো অনেক সিনেমা বিশ্বজুড়ে সাড়াও ফেলেছিল, কিন্তু কোনোটিই পল ভেরহোভেনের সিনেমাটির মতো হয়নি। নতুন শতকে সুপারহিরো, ফ্র্যাঞ্চাইজি সিনেমা আর ওটিটির উত্থানের পর ইরোটিক থ্রিলার হয়ে পড়ে বিস্তৃত এক ঘরানা। তাই গত ১৯ ডিসেম্বর জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার: ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ’–এর সঙ্গে যখন ‘দ্য হাউসমেইড’ মুক্তি পায়; খুব বেশি আশা ছিল না। এ সময়ে হলে গিয়ে কেউ ইরোটিক থ্রিলার দেখবে না—এমন আশঙ্কা করা বিশ্লেষকের সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। একমাত্র আশা ছিল ‘আবেদনময়ী’ সিডনি সুইনি। তবে মুক্তির পর দ্রুতই পাল্টে গেল পটভূমি; মাত্র ৪৫ মিলিয়ন ডলার বাজেটের সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ৩০০ মিলিয়নের বেশি ব্যবসা করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। সঙ্গে হয়তো ধুলোজমা ইরোটিক থ্রিলার ঘরানাতেও আলো ফেলেছে।
একনজরে সিনেমা: দ্য হাউসমেইড ধরন: ইরোটিক থ্রিলার নির্মাতা: পল ফিগ অভিনয়: আমান্ডা সেফ্রিড, সিডনি সুইনি ও ব্র্যান্ডন স্ক্লেনার স্ট্রিমিং: অ্যামাজন প্রাইম (রেন্ট) দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ১৩ মিনিট
ফ্রিডা ম্যাকফ্যাডেনের একই নামের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা বানিয়েছেন পল ফিগ। ফিগ মূলত কমেডি বানান, স্পাই-কমেডিও মন্দ করেন না; এবার বানালেন ইরোটিক থ্রিলার। ঘনিষ্ঠ দৃশ্য, অপ্রত্যাশিত মোড়— এই ঘরানার ছবির সব মসলাই এখানে মজুত। তবে ছবিটি যতটা মজার হতে পারত, ততটা হয়ে ওঠেনি। ছবিটি উপভোগ্য নয়, তা না; কিন্তু ‘স্পাই’ ও ‘ব্রাইডসমেইডস’–এর মতো ছবির পরিচালকের কাছ থেকে আরও বেশি আশা ছিল।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে প্রবেশনে থাকা এক তরুণী মিলি (সিডনি সুইনি)। মুক্তির শর্ত হিসেবে স্থায়ী চাকরিতে যোগ দেওয়া তার জন্য বাধ্যতামূলক। এ সময়ে তিনি পেয়ে যান দারুণ এক মওকা। লং আইল্যান্ডের এক বিশাল বাড়িতে থাকা হাসিখুশি গৃহবধূ নিনা উইনচেস্টার (আমান্ডা সেফ্রিড) তাকে চাকরির জন্য ডাকেন। মেয়ের দেখাশোনা ও বাড়ি গোছগাছ করে রাখার জন্য নিনার দরকার একজন বিশ্বস্ত সহকারী।
খুব দ্রুতই মিলিকে আবাসিক গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেন নিনা। চাকরিটা পেয়ে মিলির মনে হয়, ঈশ্বর তার দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন। কিন্তু পরের সকালেই ছবিটা বদলে যায়। মিটিংয়ের জন্য হাতে লেখা নোট খুঁজে না পেয়ে নিনা এমনভাবে ভেঙে পড়েন যে কেবল তার স্বামী অ্যান্ড্রুই (ব্র্যান্ডন স্ক্লেনার) তাকে শান্ত করতে পারেন। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন মিলির সঙ্গে মানসিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন নিনা। কারণ আর কিছুই না, মিলির প্রতি একটু বেশিই আগ্রহী হয়ে ওঠেন নিনার স্বামী। মিলি ও নিনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন চূড়ায় পৌঁছায়, তখন ধীরে ধীরে মিলি জানতে পারে এই রূপকথার মতো দম্পতির আড়ালের আসল গল্প।
পল ফিগ আগে ‘আ সিম্পল ফেভার’ ও সেটার সিকুয়েল ‘অ্যানাদার সিম্পল ফেভার’–এর মতো থ্রিলারও বানিয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এখানেও দারুণভাবে গল্পের চমকগুলো পরিবেশন করেছেন। কিছু চমক সত্যিই দারুণ, আর কিছু চমক এতটাই অনুমেয়; যে হাসিই পায়। রেবেকা সনেনশাইনের চিত্রনাট্যের অবশ্য প্রশংসা করতে হয়। কারণ, শ্রেণিবৈষম্য কীভাবে প্রধান চরিত্রগুলোর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে—পুরো সিনেমাতেই তিনি সেটা দেখিয়েছেন।
নব্বইয়ের দশকের থ্রিলারগুলো যেখানে ধীরে ধীরে উত্তেজনা তৈরি করত, ‘দ্য হাউসমেইড’ সেখানে শুরু থেকেই গতি বাড়িয়ে দেয়। নিনা থালা ভেঙে, চিৎকার করে, উন্মত্ত রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। দর্শকের মনে হয়—মিলির তো এই চাকরি ছেড়ে দেওয়াই তো ভালো! কিন্তু মিলি ছাড়তে পারে না। তাঁর প্যারোল অফিসার তাঁকে হুমকি দিয়েছে, এই চাকরি ঠিকমতো না চললে তাঁকে আবার জেলে পাঠানো হতে পারে। বাস্তব আইনের হিসেবে এই যুক্তি দুর্বল ও কৃত্রিম মনে হলেও ছবির অতিনাটকীয় জগতে দর্শক হিসেবে সেসব মনে থাকে না। কারণ, এই সিনেমা এমন এক ধাঁচের, যেটার সঙ্গে আপনাকে চলতে হবে যুক্তি–তর্কের ধার না ধেরেই।
নারী চরিত্রগুলোকে সামলাতে ফিগ বরাবরই দক্ষ, এখানে তিনি সিডনি সুইনি ও আমান্ডা সেফ্রিডের জন্য তৈরি করেছেন এমন এক মঞ্চ, যেখানে তাদের দ্বৈত অভিনয় ক্রমাগত রূপ বদলাতে থাকে। শুরুতে এটি যেন নতুন যুগের শ্রেণিসংগ্রাম—ধনী নিনা প্রায় দম্ভের সঙ্গে মিলিকে মনে করিয়ে দেয় তার কিছুই নেই। সুইনি ‘ভালো মেয়ে’ ইমেজে এমন সূক্ষ্ম দ্ব্যর্থতা আনেন, যে দর্শক মিলির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে, আবার একই সঙ্গে ভাবতেও থাকে—সে কি আসলে কৌশলী?
ছবির প্রথমার্ধ অনেকটাই সোজাসাপটা ড্রামার মতো এগোয়। এই অংশে সবচেয়ে উজ্জ্বল আমান্ডা সেফ্রিড। শেষ দিকে এসে ছবির মেজাজ বদলে যায়; এই পরিবর্তন যেমন স্বস্তির, তেমনি আবার আফসোসও জাগায়—যদি শুরু থেকেই ছবিটি আরও একটু বুদ্ধিদীপ্তভাবে এগোতো তবে অভিজ্ঞতাটা হয়তো আরও রোমাঞ্চকর হতে পারত।
অভিনয়ের দিক থেকে আমান্ডা সেফ্রিড নিঃসন্দেহে ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি। নিনার উন্মত্ত আচরণ তিনি এমন মাত্রায় নিয়ে যান, যা প্রায় হরর ছবির মতো। আধা ঠাট্টা, আধা নিষ্ঠুর হাসি, চোখভেজা কান্না আর নির্বিকার রাগ—সবই তিনি অনায়াসে ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর এই প্রবল উপস্থিতির পাশে সহ-অভিনেতারা অনেক সময় ম্লান হয়ে যান। সিডনি সুইনিকে ছবির বড় অংশজুড়ে কিছুটা নিস্তেজ মনে হয়, যেন তিনি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই অভিনয় করছেন (অনুমিতভাবেই ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে ভালো করেছেন)। তবে ক্লাইম্যাক্সে এসে তিনি একেবারে ভিন্ন এক রূপে ধরা দেন; তখনই চরিত্রটিতে কিছুটা প্রাণ ফেরে। ছবিতে সবেচেয়ে দুর্বল অ্যান্ড্রু হিসেবে ব্র্যান্ডন স্ক্লেনার।
পল ফিগের ‘দ্য হাউসমেইড’ বিনোদননির্ভর উপভোগ্য এক থ্রিলার। সিনেমার কিছু বিষয় অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটাই সিনেমার বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, রোমাঞ্চ আর যৌনতার আড়ালে নির্মাতা যে বার্তা দিতে চেয়েছেন, সে জন্য হয়তো পর্দায় এই অতিরঞ্জন জরুরি ছিল। কী বার্তা? সে রোমাঞ্চের স্বাদ না হয় নিজেই দেখে নিন।