আটবার বিয়ে, সাতবার বিচ্ছেদ, কিংবদন্তি এই অভিনেত্রীর জীবন সিনেমার মতোই
হলিউডের ইতিহাসে যে কজন অভিনেত্রীর নাম উচ্চারণ করলেই গ্ল্যামার, প্রতিভা, প্রেম, বিতর্ক আর সংগ্রামের এক অনন্য মিশ্রণ চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তাঁদের অন্যতম এলিজাবেথ টেইলর। রুপালি পর্দায় তাঁর চোখের বেগুনি আভা যেমন কিংবদন্তি, তেমনি কিংবদন্তি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের উত্থানপতনও। শিশু শিল্পী থেকে দুইবারের অস্কারজয়ী, হলিউডের প্রথম ‘মিলিয়ন ডলার অভিনেত্রী’ থেকে এইডস–সচেতনতার মুখ—এলিজাবেথ টেইলরের জীবন যেন একটি মহাকাব্য। আজ এই অভিনেত্রীর জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে
জন্ম লন্ডনে, বেড়ে ওঠা হলিউডে
১৯৩২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, লন্ডনে জন্ম তাঁর। পুরো নাম এলিজাবেথ রোজমন্ড টেইলর। বাবা ছিলেন আর্ট ডিলার, মা মঞ্চ অভিনেত্রী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে পরিবার আমেরিকায় চলে আসে। সেখানেই ছোট্ট এলিজাবেথের রূপ আর আত্মবিশ্বাস নজরে পড়ে স্টুডিও কর্তাদের।
মাত্র ১০ বছর বয়সে তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক। ইউনিভার্সাল স্টুডিওর সঙ্গে চুক্তি হলেও প্রথম দিকের কাজ খুব আলোড়ন তুলতে পারেনি। কিন্তু ভাগ্য বদলে যায় মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ারের (এমজিএম) সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর।
‘ন্যাশনাল ভেলভেট’: শিশু তারকা থেকে জাতীয় পরিচিতি
১৯৪৪ সালে মুক্তি পায় ‘ন্যাশনাল ভেলভেট’। এক কিশোরীর ঘোড়দৌড়ে অংশ নেওয়ার গল্প। টেইলরের বয়স তখন ১২। তাঁর অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ততা আর পর্দা-দখল করা উপস্থিতি তাঁকে রাতারাতি তারকায় পরিণত করে।
এই ছবির পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। কিশোরী চরিত্র থেকে ধীরে ধীরে রোমান্টিক নায়িকা—হলিউডে তিনি হয়ে ওঠেন নতুন প্রজন্মের মুখ।
তারুণ্যের দীপ্তি: পঞ্চাশের দশকে পরিণত নায়িকা
পঞ্চাশের দশকে টেইলর অভিনয় করেন একের পর এক সফল ছবিতে—‘আ প্লেস ইন দ্য সান’, ‘ফাদার অব দ্য ব্রাইড’, ‘জায়ান্ট’। বিশেষ করে ‘আ প্লেস ইন দ্য সান’-এ তাঁর অভিনয় সমালোচকদের দৃষ্টি কাড়ে। ধীরে ধীরে তিনি প্রমাণ করেন—শুধু রূপ নয়, অভিনয়দক্ষতাও তাঁর সমান শক্তিশালী।
অস্কারের মুকুট: দুবার সেরা অভিনেত্রী
পাঁচবার অস্কারে মনোনীত হয়ে জিতেছেন দুবার। ১৯৬০ সালে ‘বাটারফিল্ড ৮’ ছবির জন্য প্রথমবার একাডেমি অ্যাওয়ার্ড জেতেন তিনি। অনেকে বলেন, অসুস্থতার পর হাসপাতালে শুয়ে থাকা অবস্থায় তাঁর সংগ্রামের গল্পও সহানুভূতির আবহ তৈরি করেছিল। তবে পর্দায় তাঁর ভাঙা, জটিল নারীর চরিত্র ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
দ্বিতীয় অস্কার আসে ১৯৬৬ সালে ‘হুজ অ্যাফ্রেড অব ভার্জিনিয়া উলফ?’ ছবিতে অভিনয় করে। মধ্যবয়সী এক তিক্ত, ভাঙাচোরা স্ত্রীর চরিত্রে তাঁর রূপান্তর ছিল বিস্ময়কর। অনেকেই একে তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয় বলেন।
‘ক্লিওপেট্রা’: প্রেম, প্রাচুর্য ও প্রচারণার ঝড়
১৯৬৩ সালে মুক্তি পায় ‘ক্লিওপেট্রা’। এই ছবি শুধু বিশাল বাজেটের জন্য নয়, টেইলরের পারিশ্রমিকের জন্যও ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। তিনি পান ১০ লাখ ডলার—তৎকালীন যা ছিল নজিরবিহীন। এই ছবির শুটিং সেটেই সহ–অভিনেতা রিচার্ড বার্টনের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সূচনা। দুজনেই তখন বিবাহিত। ফলে সম্পর্কটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভ্যাটিকান পর্যন্ত নিন্দা জানায়। কিন্তু তাতে তাঁদের প্রেম থামেনি।
এলিজাবেথ টেইলর সুগন্ধি খুব ভালোবাসতেন। একমুহূর্তও থাকতে পারতেন না পারফিউম ছাড়া। নিজেও বানিয়েছিলেন একটি সুগন্ধি। ভক্তরা সেই পারফিউমের নাম দিয়েছিলেন ‘ভায়োলেট আইজ’। হীরার অলংকারের প্রতি ছিল তাঁর তীব্র আকর্ষণ। ২০০২ সালে নিজের সংগ্রহ করা অলংকার নিয়ে বইও প্রকাশ করেন। নাম ‘মাই লাভ অ্যাফেয়ার উইথ জুয়েলারি’। মেকআপ বাক্সের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ দুর্বলতা। নিজেও সময় নিয়ে মেকআপ করতেন একেবারে নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত।
আটবার বিয়ে, সাতবার বিচ্ছেদ
এলিজাবেথ টেইলরের ব্যক্তিগত জীবন ছিল যেন সিনেমার চেয়েও নাটকীয়। তিনি মোট আটবার বিয়ে করেছেন—প্রথম স্বামী কনরাড হিলটন জুনিয়র। এরপর মাইকেল ওয়াইল্ডিং, মাইক টড (যিনি বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান), এডি ফিশার। সবচেয়ে আলোচিত বিয়ে দুবার রিচার্ড বার্টনের সঙ্গে—১৯৬৪ ও ১৯৭৫ সালে। এ ছাড়া জন ওয়ার্নার ও ল্যারি ফোর্টেনস্কির সঙ্গেও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
বার্টনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল ভালোবাসা, ঝগড়া, বিলাসিতা আর মিডিয়া উত্তেজনার মিশেল। তাঁরা একে অপরকে দামি গয়না উপহার দিতেন—বিশেষ করে ঐতিহাসিক হীরা, যা আজও আলোচনায় আসে।
রূপের আড়ালে সংগ্রাম
টেইলরের জীবন কেবল গ্ল্যামারের ছিল না। অল্প বয়স থেকেই শারীরিক সমস্যায় ভুগেছেন। পিঠের অস্ত্রোপচার, নিউমোনিয়া, হৃদ্রোগ—বহুবার মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। মাদক ও অ্যালকোহল–নির্ভরতার অভিযোগও উঠেছিল। নিজেও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি হয়েছিলেন। তবে প্রতিবারই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
এইডস–সচেতনতায় অগ্রণী কণ্ঠ
আশির দশকে এইডস মহামারি যখন বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, তখন হলিউডের খুব কম তারকাই প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথা বলতেন। টেইলর ছিলেন ব্যতিক্রম। ১৯৯১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এলিজাবেথ টেইলর এইডস ফাউন্ডেশন। এইডস রোগীদের চিকিৎসা ও সচেতনতায় তহবিল সংগ্রহে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তাঁর এই কাজ তাঁকে নতুন মর্যাদা দেয়—একজন মানবিক যোদ্ধা হিসেবে।
এলিজাবেথ টেইলরকে ‘লিজ’ বলা হলেও ব্যক্তিগতভাবে এই ডাক তিনি পছন্দ করতেন না। তাঁর মনে হতো, ‘লিজ’ ডাকটা সাপের ‘হিশশ’-এর মতো শোনায়! ৬৭ বছর বয়সে এলিজাবেথ টেইলর সম্মানিত হন ‘ডেম কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ হিসেবে। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে সম্মানিত করেন।
গয়না, গ্ল্যামার ও বিলাসী জীবন
এলিজাবেথ টেইলর ছিলেন বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত গয়না সংগ্রাহক। রিচার্ড বার্টনের উপহার দেওয়া বিশাল হীরা—‘টেইলর-বার্টন ডায়মন্ড’ বিশ্বমিডিয়ায় আলোচিত হয়েছিল। তাঁর সংগ্রহে থাকা বহু রত্ন পরে নিলামে বিক্রি হয়ে কোটি কোটি ডলার তোলে, যা দাতব্য কাজে ব্যবহৃত হয়। এলিজাবেথ টেলরকে ‘পিপল-কন্যা’ বললেও ভুল হয় না। প্রখ্যাত সাময়িকী পিপল-এ ১৪ বার প্রচ্ছদ হয়েছিলেন তিনি। ধারণা করা হয়, এক হাজারের বেশি সাময়িকীর প্রচ্ছদ হয়েছিলেন তিনি।
যখন আমি একদমই তরুণী ছিলাম, তখন দীর্ঘ সময় যাবৎ সিনেমায় কোনো মেকআপ নিইনি। যখন থেকে মেকআপ নিতে শুরু করি, তখন নিজেই করেছি।
শেষ অধ্যায়
২০১১ সালের ২৩ মার্চ, লস অ্যাঞ্জেলেসে হৃদ্যন্ত্রের জটিলতায় ৭৯ বছর বয়সে মৃত্যু হয় তাঁর। মৃত্যুর সময় পাশে ছিলেন সন্তানেরা। হলিউড হারায় এক যুগের অবসানচিহ্ন। তাঁর শেষকৃত্যও ছিল আলাদা—নিজের ইচ্ছানুযায়ী অনুষ্ঠান কয়েক মিনিট দেরিতে শুরু করা হয়। যেন শেষ মুহূর্তেও নাটকীয়তা বজায় থাকে!
উত্তরাধিকার: কেন আজও প্রাসঙ্গিক
এলিজাবেথ টেইলর শুধু দুই অস্কারজয়ী অভিনেত্রী নন; তিনি হলিউডে নারীদের পারিশ্রমিক নিয়ে নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমালোচিত হলেও নিজের মতো করে বাঁচার সাহস দেখিয়েছেন। গ্ল্যামার, প্রেম, বিতর্ক, সংগ্রাম—সব মিলিয়ে তিনি এক বহুমাত্রিক চরিত্র।
আইএমডিবি, দ্য গার্ডিয়ান, স্ক্রিন র্যান্ট অবলম্বনে