যৌন হয়রানির মামলা নিয়ে তোলপাড়, এখন পর্যন্ত যা যা হলো
২০২৪ সালের আলোচিত রোমান্টিক ড্রামা ‘ইট এন্ডস উইথ আস’। মুক্তির কয়েক মাসের মধ্যেই ছবিটির দুই প্রধান তারকা ব্লেক লাইভলি ও জাস্টিন বালদোনি জড়িয়ে পড়েন হলিউডের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ও তিক্ত আইনি ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে। সেই দ্বন্দ্ব শুধু আদালত পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকেনি, লালগালিচা থেকে শুরু করে বন্ধুত্বের গোপন বার্তা পর্যন্ত সবকিছু টেনে এনেছে জনসমক্ষে। এমনকি এতে জড়িয়ে পড়েছেন বিশ্বসংগীতের সুপারস্টার টেইলর সুইফটও। ছবিটির শুটিং চলাকালে নিজের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে ব্লেক লাইভলি মামলা করেন জাস্টিন বালদোনি ও তাঁর নিয়োজিত এক ব্যবস্থাপনা–বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে। লাইভলির অভিযোগ, তিনি শুটিং সেটে বালদোনির আচরণ নিয়ে আপত্তি জানানোর পর পরিকল্পিতভাবে তাঁর সুনাম ক্ষুণ্ন করার একটি প্রচারণা চালানো হয়। পরে বালদোনিও মানহানির পাল্টা মামলা করেন। গত দেড় বছর এ মামলা নিয়ে বহু খবর হয়েছে। সবশেষ লাইভলির সঙ্গে তাঁর বন্ধু ও সংগীতশিল্পী টেইলর সুইফটের ব্যক্তিগত বার্তা ফাঁস হওয়ার পর নতুন করে তৈরি হয়েছে আলোচনা। জেনে নেওয়া যাক বহুল আলোচিত এই মামলাটি সম্পর্কে—
আগস্ট ২০২৪: শুরু হয় ফাটল
‘ইট এন্ডস উইথ আস’-এর প্রচারণা শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্টে। তখনই দর্শক ও অনুরাগীদের চোখে পড়ে কিছু অস্বাভাবিক বিষয়। ছবির প্রধান দুই তারকা ব্লেক লাইভলি ও জাস্টিন বালদোনিকে একসঙ্গে খুব একটা দেখা যাচ্ছিল না।
লাইভলি হাজির হচ্ছিলেন সহশিল্পী ব্র্যান্ডন স্কলেনার ও লেখিকা কলিন হুভারের সঙ্গে—ফুলেল পোশাক, হাসিখুশি উপস্থিতি আর হালকা মুহূর্তে ভরা প্রচারণায়। অন্যদিকে ছবির পরিচালক ও সহ-অভিনেতা বালদোনি দিচ্ছিলেন একক সাক্ষাৎকার, যেখানে তিনি বারবার ছবির পারিবারিক নির্যাতনের দিকটি তুলে ধরছিলেন।
অনলাইনে আলোচনা দ্রুতই তীব্র হয়ে ওঠে। প্রচারণার মাঝেই লাইভলি নিজের হেয়ারকেয়ার ব্র্যান্ড ও ককটেল ব্যবসার প্রচার করায় অনেকেই অভিযোগ তোলেন—এটি ছবির সংবেদনশীল বিষয়বস্তুর সঙ্গে ‘বেমানান’ ও ‘অসংবেদনশীল’। তখন এসবকে কেবল সৃজনশীল মতপার্থক্য বলেই উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে দুই পক্ষই তখন অনেক বড় লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
ডিসেম্বর ২০২৪: অভিযোগের বিস্ফোরণ
২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পরিস্থিতি হঠাৎ নাটকীয় মোড় নেয়। জাস্টিন বালদোনি ও তাঁর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ওয়েফেয়ারার স্টুডিওসের বিরুদ্ধে ব্লেক লাইভলি মামলা করেন।
মামলায় লাইভলি অভিযোগ করেন, শুটিং চলাকালে বালদোনি তাঁর সঙ্গে যৌন হয়রানি করেছেন এবং কাজের পরিবেশকে শত্রুতাপূর্ণ করে তুলেছেন। অভিযোগের মধ্যে ছিল—তাঁর শরীর নিয়ে অশালীন মন্তব্য, সেটে অশ্লীল ভিডিও বা ছবি দেখানো, তাঁর উপস্থিতিতে পর্নোগ্রাফি আসক্তি নিয়ে আলোচনা।
এ ছাড়া লাইভলির দাবি, ছবির প্রচারণার সময় তিনি যে অনলাইন সমালোচনার শিকার হন, তা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। বরং বালদোনির জনসংযোগ টিমের নেতৃত্বে একটি পরিকল্পিত চরিত্রহনন অভিযান চালানো হয়েছিল।
এ মামলা দাখিলের পরপরই হলিউডে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। জনমত রাতারাতি পাল্টে যেতে শুরু করে।
জানুয়ারি ২০২৫: বালদোনির পাল্টা আঘাত
লাইভলির অভিযোগের জবাব দিতে দেরি করেননি জাস্টিন বালদোনি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি ও তাঁর আইনজীবীরা ৪০০ মিলিয়ন ডলারের পাল্টা মামলা করেন, যেখানে অভিযুক্ত করা হয় ব্লেক লাইভলি ও তাঁর স্বামী অভিনেতা রায়ান রেনল্ডসকেও।
বালদোনির অভিযোগ, লাইভলি ছবির ওপর নিজের প্রভাব খাটিয়ে ‘ক্রিয়েটিভ হাইজ্যাকিং’ করেছেন। তাঁর দাবি, ছবি থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকি দিয়ে লাইভলি ছবির চূড়ান্ত সম্পাদনার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। ফলে বালদোনি কার্যত নিজের ছবিতেই কোণঠাসা হয়ে পড়েন।
বালদোনি যৌন হয়রানির সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটি কোনো আচরণগত অপরাধ নয়, বরং ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত। এ পর্যায়ে দ্বন্দ্বটি পুরোপুরি গসিপের জগৎ ছাড়িয়ে আইনি লড়াইয়ে রূপ নেয়।
জুন ২০২৫: আদালতের হস্তক্ষেপ
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে মামলাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে। জুন মাসে এক ফেডারেল বিচারক বালদোনির মানহানির অভিযোগ খারিজ করে দেন, যা তিনি ব্লেক লাইভলি ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে করেছিলেন।
আদালতের মতে, চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি মানদণ্ড বালদোনি পূরণ করতে পারেননি। যদিও এ রায়ে মামলার পরিসর কিছুটা সীমিত হয়, তবু জনমনে আগ্রহ একটুও কমেনি। বরং সবাই তাকিয়ে ছিল—এরপর কে জড়িয়ে পড়বে এই কাহিনিতে?
২০২৫-এর মাঝামাঝি: টেইলর সুইফটের প্রবেশ
২০২৫ সালের মে মাসে চমকজাগানো খবর আসে—টেইলর সুইফটকে সাক্ষী হিসেবে সমন পাঠানো হয়েছে বালদোনির মানহানি মামলায়। বিষয়টি নিয়ে সুইফটের মুখপাত্র কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, এটি সত্য উদ্ঘাটনের চেয়ে বেশি ট্যাবলয়েড শিরোনাম তৈরির চেষ্টা।
পরবর্তী সময়ে সমন প্রত্যাহার করা হলেও সুইফটের নাম মামলার নথি থেকে আর আলাদা করা যায়নি। আদালতের কাগজে তাঁকে উল্লেখ করা হয় লাইভলির ‘মেগাসেলিব্রিটি বন্ধু’ হিসেবে, যাঁর নাম নাকি চিত্রনাট্য পরিবর্তনের আলোচনায় ব্যবহার করা হয়েছিল।
ফাঁস হওয়া ব্যক্তিগত বার্তায় দেখা যায়, লাইভলি ও সুইফট স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তবে লাইভলি স্পষ্ট করে জানান, সুইফটের সরাসরি জড়িত থাকার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০২৫: ভাঙনের গল্প
আইনি লড়াই যত দীর্ঘ হতে থাকে, ব্যক্তিগত সম্পর্কেও তত গভীর ফাটল দেখা দেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে, ব্লেক লাইভলি ও টেইলর সুইফটের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে শীতলতা নেমেছে।
সূত্র জানায়, লাইভলি এই দূরত্বে ভেঙে পড়েছিলেন এবং বিষয়টিকে বোন হারানোর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। নীরবে বন্ধুত্ব জোড়া লাগানোর চেষ্টা চললেও অনেক পারস্পরিক বন্ধু এতে জড়াতে চাননি।
অন্যদিকে সুইফট ঘনিষ্ঠ মহলে নাকি স্বস্তি প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, ছবির নির্মাণপর্ব ও পরবর্তী আইনি জটিলতায় তিনি আগেই কিছু ‘রেড ফ্ল্যাগ’ লক্ষ করেছিলেন।
জানুয়ারি ২০২৬: ব্যক্তিগত বার্তা, সাক্ষ্য ও বিচারের দিনক্ষণ
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই কাহিনি নতুন মাত্রা পায়। আদালতের কিছু নথি প্রকাশ্যে আসে, যেখানে লাইভলি ও সুইফটের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া বার্তাগুলো জনসমক্ষে আসে।
একটি বার্তায় সুইফট বালদোনিকে তাঁর পিআর কৌশলের প্রতিক্রিয়া কটূ ভাষায় উল্লেখ করেন। অন্য বার্তাগুলোতে দেখা যায়, লাইভলি নিজেকে ‘খারাপ বন্ধু’ বলে দায় স্বীকার করছেন এবং সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করছেন।
এ সময় অভিনেত্রী জেনি স্লেট ও ইসাবেলা ফেরার সাক্ষ্য লাইভলির অভিযোগকে সমর্থন করে। ফলে মামলাটি বিচারের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যায়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, লাইভলির যৌন হয়রানির মামলা ২০২৬ সালের মে মাসে শুনানির জন্য নির্ধারিত।
পেজ সিক্স, পিপলডটকম অবলম্বনে