‘আর ইউ টকিং টু মি?’ যে দৃশ্যটি ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’কে ক্ল্যাসিক করে তুলেছে

‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’–এ রবার্ট ডি নিরো। আইএমডিবি

মার্টিন স্করসেসির কালজয়ী ছবি ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ মুক্তির ৫০ বছর পূর্ণ করছে আজ। ১৯৭৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেয়েছিল সিনেমাটি। পাঁচ দশক পেরিয়েও ছবিটির সবচেয়ে বেশি আলোচিত মুহূর্ত সেই বিখ্যাত সংলাপ—‘আর ইউ টকিং টু মি?’ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ট্রাভিস বিকল (রবার্ট ডি নিরো) নিজেকেই এই প্রশ্ন করে—এই দৃশ্যটি আজও সিনেমার ইতিহাসে আইকনিক।

কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই ছবিকে সত্যিকারের ক্ল্যাসিক করে তোলা দৃশ্যটি আসলে অন্য এক জায়গায়। সেটি অনেক বেশি নীরব, অনেক বেশি বেদনাময়—আর ঠিক সেখানেই লুকিয়ে আছে ছবির হৃদয়।

একাকিত্বের শহরে ট্রাভিস বিকল

ভিয়েতনাম যুদ্ধফেরত ট্রাভিস বিকল নিউইয়র্কে ট্যাক্সি চালাতে শুরু করে। অনিদ্রা, একাকিত্ব আর শহরের অন্ধকার বাস্তবতা ধীরে ধীরে তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। মাদক, পর্নো থিয়েটার, সহিংসতা আর নোংরা রাজনীতিতে ভরা নিউইয়র্ক ট্রাভিসের চোখে হয়ে ওঠে এক নরক।

এই অস্থির জীবনের মাঝেই সে প্রেমে পড়ে বেটসি (সাইবিল শেফার্ড) নামের এক তরুণীর। কিন্তু একটি ভুল সিদ্ধান্ত—প্রথম ডেটে তাকে এক্স-রেটেড সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাওয়া—সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। বেটসি তাকে প্রত্যাখ্যান করে। আর সেই প্রত্যাখ্যানই ট্রাভিসের ভেতরের অন্ধকারকে আরও উসকে দেয়।

‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’–এ রবার্ট ডি নিরো। আইএমডিবি

যে ফোনকলের দৃশ্য বদলে দেয় সবকিছু

ছবির প্রথম ভাগের শেষে আসে সেই গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য। ট্রাভিস একটি ফোন বুথ থেকে বেটসিকে ফোন করে। অনুনয় করে আবার সুযোগ চাইতে। কিন্তু বেটসি রাজি হয় না।

সাধারণ হলিউড সিনেমায় হলে এই মুহূর্তে ক্যামেরা থাকত ট্রাভিসের মুখে—তার ভাঙা হৃদয়, চোখের জল, হতাশা। কিন্তু স্করসেসি এখানে একেবারেই ভিন্ন পথ নেন।

ক্যামেরা ধীরে ধীরে ট্রাভিসের কাছ থেকে সরে যায়। সে কথা বলতে থাকে ফোনে, আর ক্যামেরা চলে যায় পাশের ফাঁকা করিডরের দিকে। দর্শক তখন ট্রাভিসকে আর দেখে না—শুধু তার কণ্ঠ শোনা যায়। শেষে ফোন রেখে সে আবার ফ্রেমে ফিরে আসে, পেছন ফিরে হেঁটে চলে যায়।

এই দৃশ্যেই ধরা পড়ে ট্রাভিসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

ফোনকলের সেই দৃশ্য। আইএমডিবি

কেন এই দৃশ্য এত গুরুত্বপূর্ণ

চিত্রনাট্যকার পল শ্রাডার পরে জানান, এই ক্যামেরা মুভমেন্ট স্ক্রিপ্টে ছিল না। এটি পুরোপুরি স্করসেসির সিদ্ধান্ত। তাঁর মনে হয়েছিল, ট্রাভিসের এই মুহূর্তের যন্ত্রণা এতটাই তীব্র যে ক্যামেরাও যেন তার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে না।

স্করসেসি নিজেও পরে বলেন, এই একটি শট থেকেই আসলে ছবির পুরো ভিজ্যুয়াল স্টাইল তৈরি হয়েছিল। এই দৃশ্য তাকে বুঝিয়ে দেয়, কীভাবে ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এর ভাষা হবে—আবেগকে সরাসরি দেখানোর বদলে দূরে সরে গিয়ে আরও গভীরভাবে অনুভব করানো।

ইউরোপীয় প্রভাব, আমেরিকান গল্প

বিশ্লেষকদের মতে, এই শটের মধ্যে আছে ইউরোপীয় সিনেমার প্রভাব—বিশেষ করে ফরাসি নিউ ওয়েভ ধারার। সেখানে অনেক সময় আবেগের চূড়ান্ত মুহূর্তে ক্যামেরা চরিত্র থেকে সরে যায়, যেন ক্যামেরার নিজস্ব এক মন আছে।

এতে করে দৃশ্য আরও বেশি বেদনাময় হয়ে ওঠে। কারণ, দর্শককে সরাসরি কান্না দেখানো হয় না—বরং শূন্য করিডর, ফাঁকা জায়গা আর নীরবতা দিয়েই অনুভূত হয় চরিত্রের ভেতরের শূন্যতা।

‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবি

‘এটা শুধু ট্রাভিসের একাকিত্ব নয়, আমাদেরও’

চলচ্চিত্র বিশ্লেষক মার্ক কাজিনস এক কথায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন—এই দৃশ্য আসলে শুধু ট্রাভিসের একাকিত্বের গল্প নয়, এটি আমাদের সবার একাকিত্বের প্রতিচ্ছবি।

আয়নার সামনে বন্দুক হাতে ট্রাভিস নিজেকে শক্ত, ভয়ংকর ও প্রতিশোধপরায়ণ হিসেবে কল্পনা করে। কিন্তু ফোন বুথের করিডরে সে একেবারে ভিন্ন—ভাঙা, দুর্বল, একা। এই মুহূর্তে সে কোনো হিংস্র নায়ক নয়, বরং একজন মানুষ, যে প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

আরও পড়ুন

কেন এই দৃশ্য কম আলোচিত

হয়তো কারণ, আয়নার দৃশ্যটি দর্শকদের কাছে বেশি ‘রোমাঞ্চকর’। সেখানে ট্রাভিস নিজেকে শহর পরিষ্কার করা এক নায়ক হিসেবে কল্পনা করে। ৭০-এর দশকের যুক্তরাষ্ট্রে এমন ভিজিল্যান্ট ন্যারেটিভ খুব জনপ্রিয় ছিল।

কিন্তু করিডরের ফোনকল দৃশ্যটি অনেক বেশি সত্য, অনেক বেশি অস্বস্তিকর। সেখানে কোনো বীরত্ব নেই—শুধু নিঃসঙ্গতা, অপমান আর ভেতরের ভাঙন।

এক নীরব, কিন্তু হৃদয়ছোঁয়া মুহূর্ত

‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এ রক্ত, সহিংসতা আর বিখ্যাত সংলাপের ভিড়ে এই ছোট্ট নীরব দৃশ্য অনেক সময় হারিয়ে যায়। কিন্তু অনেকের মতে, এই মুহূর্তটাই ছবির আত্মা।

কারণ, এখানে স্করসেসি শুধু ট্রাভিস বিকলকে দেখান না—তিনি দেখান শহরের ভেতর হারিয়ে যাওয়া মানুষের চিরন্তন একাকিত্ব। আর সেই কারণেই, ৫০ বছর পরও এই ছবি শুধু একটি থ্রিলার নয়, বরং এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবেও সমান প্রাসঙ্গিক।

‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ এখন স্ট্রিম হচ্ছে নেটফ্লিক্সে।

  • বিবিসি অবলম্বনে