৭৯ বছর বয়সে বাবা হওয়া; ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক এই তারকার জীবন সিনেমার মতোই

রবার্ট ডি নিরো। রয়টার্স

রবার্ট ডি নিরো—নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কখনো ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এর ট্রাভিস বিকল, কখনো ‘রেজিং বুল’-এর জেক লামোটা, কখনো ‘দ্য গডফাদার ২’-এর তরুণ ভিটো করলিওনে। আবার কখনো তিনি একেবারেই অন্য মানুষ—‘মিট দ্য প্যারেন্টস’-এর অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ শ্বশুর, ‘অ্যানালাইজ দিস’-এর মজার মাফিয়া কিংবা ‘সিলভার লাইনিংস প্লেবুক’-এর আবেগপ্রবণ বাবা।

আজ ৮৩ বছরে পা দিলেন এই অভিনেতা। জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৭ আগস্ট, নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সিনেমায় কাজ করেও অবসর নেওয়ার কোনো লক্ষণ নেই তাঁর। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়ের পাশাপাশি পরিবার, ব্যবসা ও নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও হয়ে উঠেছে জীবনের বড় অংশ। ২০২৫ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসব তাঁকে আজীবন সম্মাননা হিসেবে অনারারি পাম দ’র দিয়েছে, যা তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের আরেকটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।

শিল্পী পরিবারে জন্ম, কিন্তু অভিনয়ের পথ সহজ ছিল না
রবার্ট অ্যান্টনি ডি নিরোর জন্ম নিউইয়র্কের গ্রিনউইচ ভিলেজে। বাবা রবার্ট ডি নিরো সিনিয়র ছিলেন কবি, ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী; মা ভার্জিনিয়া অ্যাডমিরালও ছিলেন চিত্রশিল্পী। মা–বাবার বিচ্ছেদের পর মূলত মায়ের কাছেই বড় হয়েছেন তিনি। শৈশব কেটেছে গ্রিনউইচ ভিলেজ ও লিটল ইতালির পরিবেশে। তাঁর গায়ের ফরসা রঙের কারণে ছোটবেলায় ডাকনাম ছিল ‘ববি মিল্ক’।

অভিনয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয় খুব ছোট বয়সেই। ১০ বছর বয়সে স্কুলের মঞ্চে চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর কিছুটা সময় অভিনয় থেকে দূরে সরে গেলেও ১৬ বছর বয়সে আবার মঞ্চে ফেরেন। পরে স্টেলা অ্যাডলার ও লি স্ট্রাসবার্গের কাছে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন। সেখান থেকেই তৈরি হয় সেই অভিনয়পদ্ধতি, যা পরবর্তী সময়ে তাঁকে হলিউডের সবচেয়ে প্রভাবশালী অভিনেতাদের একজন করে তোলে।

তবে ডি নিরোর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়া। তিনি শুধু সংলাপ বলতেন না; চরিত্রের হাঁটা, কথা বলার ধরন, চোখের ভাষা, শরীরের ভঙ্গি—সবকিছু বদলে ফেলতেন। ফলে পর্দায় রবার্ট ডি নিরোকে নয়, চরিত্রটিকেই দেখা যেত।

স্করসেজির সঙ্গে যে বন্ধুত্ব বদলে দিল সিনেমা
রবার্ট ডি নিরোর ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলতে গেলে একজন পরিচালকের নাম বারবার ফিরে আসে—মার্টিন স্করসেজি। ১৯৭৩ সালের ‘মিন স্ট্রিটস’ দিয়ে তাঁদের সৃজনশীল জুটি শুরু। এরপর ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘রেজিং বুল’, ‘দ্য কিং অব কমেডি’, ‘গুডফেলাস’, ‘ক্যাসিনো’ থেকে ‘দ্য আইরিশম্যান’—দুজনের সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে আমেরিকান সিনেমার একাধিক মাইলফলক। আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেসও তাঁদের দীর্ঘ সহযোগিতাকে ডি নিরোর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এ ট্রাভিস বিকল চরিত্রটি ডি নিরোর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শহরের একাকিত্ব, মানসিক অস্থিরতা ও সহিংসতার দিকে এগিয়ে যাওয়া এক মানুষের চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও চলচ্চিত্রের শিক্ষার্থীদের কাছে আলোচনার বিষয়।
আর ‘রেজিং বুল’-এ নিরো যেন অভিনয়ের সংজ্ঞাই বদলে দেন। কিংবদন্তি বক্সার জেক লামোটার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নিজের শরীরকে আমূল পরিবর্তন করেছিলেন। সেই অভিনয় তাঁকে এনে দেয় সেরা অভিনেতার অস্কার।

দুই অস্কার, অসংখ্য অবিস্মরণীয় চরিত্র
ডি নিরো প্রথম অস্কার পান ১৯৭৪ সালে ‘দ্য গডফাদার ২’-এ তরুণ ভিটো করলিওনে চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। এই পুরস্কার ছিল সেরা পার্শ্ব অভিনেতার। দ্বিতীয় অস্কার আসে ১৯৮০ সালে ‘রেজিং বুল’-এর জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে। তবে পুরস্কারের হিসাব দিয়ে ডি নিরোর প্রভাব মাপা কঠিন। একই অভিনেতা যে এত বিচিত্র চরিত্রে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেন, ডি নিরো এর অন্যতম বড় উদাহরণ।

মাফিয়া চরিত্রের সঙ্গে এত মিল কেন
ডি নিরোকে নিয়ে দর্শকের একটি ধারণা দীর্ঘদিনের—তিনি মাফিয়া বা অপরাধজগতের চরিত্রে অসাধারণ।

এর পেছনে কেবল অভিনয়প্রতিভা নয়, গবেষণার অভ্যাসও ছিল। ‘দ্য গডফাদার ২’-এর তরুণ ভিটো করলিওনে চরিত্রের জন্য তিনি ইতালীয় বংশোদ্ভূত মানুষের উচ্চারণ ও শরীরী ভাষা নিয়ে কাজ করেছিলেন। ‘রেজিং বুল’-এর জন্য বক্সারের শরীরী প্রস্তুতি, ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এর জন্য নিউইয়র্কের অন্ধকার রাস্তাঘাট পর্যবেক্ষণ—চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করতে তাঁর প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘ ও নিবিড়।
নিরোর এই অভিনয়পদ্ধতি পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য অভিনেতাকে প্রভাবিত করেছে।

রবার্ট ডি নিরো। রয়টার্স

পরিচালক ডি নিরো
অভিনেতা হিসেবে খ্যাতির পাশাপাশি পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন ডি নিরো। ১৯৯৩ সালে ‘আ ব্রঙ্কস টেল’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে অভিষেক। ছবিতে তিনি নিজেও অভিনয় করেন। এরপর ২০০৬ সালে পরিচালনা করেন ‘দ্য গুড শেফার্ড’। তাঁর পরিচালনায় অপরাধ, ক্ষমতা, আনুগত্য ও আমেরিকান ইতিহাসের মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ ক্যামেরার সামনে থাকার পাশাপাশি ক্যামেরার পেছনের ভাষাটিও তিনি বুঝতেন।

সিনেমার বাইরে তাঁর আরেক সাম্রাজ্য
রবার্ট ডি নিরোর সম্পদের গল্পও কম আকর্ষণীয় নয়। ২০২৬ সালে তাঁর আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে এটি কোনো সরকারি বা অডিট করা হিসাব নয়; তারকাদের সম্পদের হিসাব সাধারণত বিভিন্ন প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়। তাঁর অর্থের উৎস শুধু অভিনয় নয়; রেস্তোরাঁ, হোটেল, প্রযোজনাপ্রতিষ্ঠান ও বিনোদন ব্যবসাও গুরুত্বপূর্ণ।

ডি নিরোর সবচেয়ে সফল ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলোর একটি নোবু। জাপানি রন্ধনশিল্পী নোবু মাতসুহিসা ও মেইর টেপারের সঙ্গে তাঁর অংশীদারত্বে গড়ে ওঠে এই রেস্তোরাঁ ও হোটেল সাম্রাজ্য।
১৯৯৪ সালে প্রথম রেস্তোরাঁ চালু হওয়ার পর সেটি ধীরে ধীরে বিশ্বজুড়ে বিলাসবহুল খাবার ও আতিথেয়তার ব্র্যান্ডে পরিণত হয়। নিউইয়র্কের কয়েকটি হোটেলের সঙ্গেও ডি নিরোর ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে।

ট্রাইবেকা: নিজের শহরের জন্য নিজের সিনেমাজগৎ
ডি নিরোর আরেক বড় উদ্যোগ ট্রাইবেকা। ২০০৩ সালে রবার্ট ডি নিরো, জেন রোজেনথাল ও ক্রেগ হ্যাটকফ মিলে ট্রাইবেকা এন্টারপ্রাইজ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, সংগীত, গেমস ও নানা ধরনের গল্প বলার মাধ্যম নিয়ে কাজ করে এবং ট্রাইবেকা উৎসব পরিচালনা করে।

নিউইয়র্কের ৯/১১-এর পরবর্তী সময়ে ট্রাইবেকা এলাকার পুনরুজ্জীবনের সঙ্গে চলচ্চিত্র উৎসবটির সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে ট্রাইবেকা উৎসব স্বাধীন ও বিকল্পধারার সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ডি নিরোর কাছে এটি শুধু ব্যবসা নয়, নিজের শহরের প্রতি একধরনের দায়বদ্ধতাও।

আরও পড়ুন

ব্যক্তিগত জীবন: দুই বিয়ে, একাধিক সম্পর্ক
ক্যামেরার সামনে ডি নিরো যতটা দৃশ্যমান, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এর বিপরীত। নিজের পরিবার ও সম্পর্ক নিয়ে সাধারণত খুব বেশি কথা বলেন না।
১৯৭৬ সালে অভিনেত্রী ডায়ান অ্যাবটকে বিয়ে করেন। তাঁদের ছেলে রাফায়েল। অ্যাবটের আগের সম্পর্কের মেয়ে ড্রেনাকেও ডি নিরো দত্তক নেন। ১৯৮৮ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়।

এরপর মডেল টুকি স্মিথের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল নিরোর। এ সম্পর্ক থেকে যমজ সন্তান জুলিয়ান ও অ্যারন জন্ম নেন ১৯৯৫ সালে সারোগেসির মাধ্যমে। অ্যারন পরবর্তী সময়ে এয়ারিন নাম গ্রহণ করেন এবং ২০২৫ সালে প্রকাশ্যে ট্রান্স নারী হিসেবে নিজের পরিচয় জানান। বাবা ডি নিরো তাঁর পরিচয়কে সমর্থন করেছেন।

১৯৯৭ সালে অভিনেত্রী ও গায়িকা গ্রেস হাইটাওয়ারকে বিয়ে করেন ডি নিরো। তাঁদের ছেলে এলিয়ট জন্ম নেন ১৯৯৮ সালে। ১৯৯৯ সালে দম্পতির বিচ্ছেদের উদ্যোগ হলেও পরে তাঁরা আবার সম্পর্ক জোড়া লাগান এবং ২০০৪ সালে পুনরায় বিয়ের অঙ্গীকার করেন। ২০১১ সালে সারোগেসির মাধ্যমে তাঁদের মেয়ে হেলেন গ্রেস জন্ম নেয়। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে তাঁদের বিচ্ছেদের খবর প্রকাশ্যে আসে।

৭৯ বছর বয়সে আবার বাবা
ডি নিরোর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত সাম্প্রতিক অধ্যায়গুলোর একটি তাঁর সপ্তম সন্তান। ২০২৩ সালে ৭৯ বছর বয়সে নিরো কন্যাসন্তানের বাবা হন। সন্তানের নাম জিয়া ভার্জিনিয়া চেন-ডি নিরো। শিশুটির মা তিফানি চেন। তখন সাক্ষাৎকারে ডি নিরো নিজেই জানান, তাঁর ছয় সন্তান নয়, আসলে সাত সন্তান হয়েছে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সন্তানদের প্রতি নিরোর দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। ২০২৩ সালে ৮০ বছর বয়সে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, জিয়াকে দেখলে তাঁর উদ্বেগ ও চিন্তাগুলো যেন দূরে সরে যায়।

এখন সাত সন্তানের পাশাপাশি নিরো দাদাও। তাঁর বড় মেয়ে ড্রেনার ছেলে লিওন ২০২৩ সালে ১৯ বছর বয়সে দুর্ঘটনাজনিত ওভারডোজে মারা যান, যা পরিবারটির জন্য ছিল গভীর শোকের ঘটনা।

রবার্ট ডি নিরো। রয়টার্স

কান তাঁকে যখন ‘সিনেমার কিংবদন্তি’ বলল
২০২৫ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব ছিল ডি নিরোর ক্যারিয়ারের আরেক স্মরণীয় মুহূর্ত। উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁকে দেওয়া হয় সম্মানসূচক স্বর্ণপাম। এর আগে ২০১১ সালে তিনি কান উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগের জুরি সভাপতি ছিলেন।
কান নিরোকে সম্মান জানাতে গিয়ে তাঁর অভিনয়ের একটি বৈশিষ্ট্য আলাদা করে উল্লেখ করেছিল, তাঁর ‘অন্তর্মুখী’ অভিনয়শৈলী, যা কখনো মৃদু হাসি, কখনো কঠিন দৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।

২০২৫ সালের কান মাস্টারক্লাসে নিজের বাবা ও পরিবার নিয়েও কথা বলেন ডি নিরো। বাবার রেখে যাওয়া স্টুডিও, চিঠি ও ছবির ঐতিহ্য নিয়ে শিল্পী জেআরের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত প্রকল্পে কাজ করছেন বলেও জানান। সেখানে তিনি বলেছিলেন, তাঁর বাবা তাঁকে সত্যিকারের ভালোবাসতেন, আর তিনিও তাঁর সন্তানদের ভালোবাসেন।

ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক

হলিউডে রাজনীতি নিয়ে কথা বলা নতুন কিছু নয়। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে রবার্ট ডি নিরোর অবস্থান অন্য রকম। তিনি শুধু ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করেননি, বহুবার সরাসরি আক্রমণ করেছেন তাঁর চরিত্র, রাজনৈতিক দর্শন ও নেতৃত্বের ধরনকে। কখনো পুরস্কার বিতরণীর মঞ্চে, কখনো নির্বাচনী প্রচারে, কখনো আদালতের বাইরে, আবার কখনো কান চলচ্চিত্র উৎসবের মতো আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আয়োজনে—ডি নিরো বারবার একই বার্তা দিয়েছেন, ট্রাম্পের রাজনীতিকে তিনি আমেরিকার গণতন্ত্র ও সংস্কৃতির জন্য হুমকি মনে করেন। এই বিরোধের বয়সও কম নয়। ট্রাম্পের সঙ্গে ডি নিরোর প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের শুরু ২০১১ সালে। এরপর একের পর এক নির্বাচনী প্রচারণা, ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্সি, ২০২১ সালের ক্যাপিটল হামলা, ২০২৪ সালের নির্বাচন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ—প্রতিটি পর্যায়েই ডি নিরো তাঁর অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন। ২০২৫ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে আজীবন সম্মাননা পাওয়ার মঞ্চেও তিনি ট্রাম্পকে আক্রমণ করেন। আর ২০২৬ সালের জুনে নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের জন্মদিনের সময়ও তাঁকে রেহাই দেননি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে রবার্ট ডি নিরোর রাজনৈতিক বিরোধ যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন ট্রাম্প প্রেসিডেন্টই হননি। ২০১১ সালে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্মস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে ‘বার্থার’ ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে সামনে আনছিলেন।

সেই সময় ডি নিরো ট্রাম্পের নাম সরাসরি না নিয়ে এ ধরনের বক্তব্যের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল—কোনো মানুষের বিরুদ্ধে এমন কথা বলার আগে তথ্যপ্রমাণ দেখা উচিত।

সেখান থেকেই শুরু হয় দুই নিউইয়র্কবাসীর দীর্ঘ প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব। দুজনের পথ আলাদা হলেও দুজনই নিউইয়র্কের মানুষ। আর সেই একই শহরের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জনজীবনকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে বিরোধ ক্রমে ব্যক্তিগত পর্যায়েও পৌঁছায়।

ডি নিরোর ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি আসে ২০১৮ সালের টনি অ্যাওয়ার্ডসে। সেদিন ব্রুস স্প্রিংস্টিনকে মঞ্চে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে ডি নিরো হঠাৎ ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করেন। টেলিভিশন সম্প্রচারে শব্দটি ‘বিপ’ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। কিন্তু হলভর্তি দর্শকের প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্ট—উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে করতালি দেন অনেকে। এরপর ডি নিরো ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান এবং স্প্রিংস্টিনের সত্য, স্বচ্ছতা ও সরকারের সততার পক্ষে অবস্থানের প্রশংসা করেন।

আর ট্রাম্পও চুপ থাকেননি। সময়ের সঙ্গে পাল্টা আক্রমণ করেছেন ডি নিরোকে। কখনো তাঁকে ‘লো আইকিউ’ ধরনের অপমানজনক বিশেষণে আক্রমণ করেছেন, কখনো তাঁর অভিনয়জীবন নিয়েও কটাক্ষ করেছেন। ফলে দুই তারকার দ্বন্দ্ব একসময় মার্কিন রাজনীতির বৃহত্তর সাংস্কৃতিক বিভাজনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ডি নিরোর অবস্থান আরও কঠোর হয়। ট্রাম্পের অভিবাসননীতি, বক্তব্য, প্রশাসনের ধরন, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সরকারি অর্থায়ন নিয়ে তাঁর অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতে থাকে। তিনি ট্রাম্পকে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখেননি; তাঁর কাছে ট্রাম্পের রাজনীতি ছিল আমেরিকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য বিপজ্জনক।

ট্রাম্প প্রশাসনের রাশিয়া তদন্তের সময় ডি নিরো ‘সেটারডে নাইট লাইভ’-এ বিশেষ কৌঁসুলি রবার্ট মুলারের চরিত্রেও অভিনয় করেন। পাশাপাশি ট্রাম্পকে অভিশংসনের দাবির পক্ষেও অবস্থান নেন। ডি নিরোর বক্তব্যের ভাষাও ক্রমে আরও কঠোর হতে থাকে। তিনি ট্রাম্পকে ‘স্টুপিড’, ‘ইভিল’ ও ‘ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিস্ট’-এর মতো শব্দে আক্রমণ করেছেন।

২০২৪ সালের নির্বাচনী লড়াইয়ে এসে ডি নিরোর বক্তব্য আরও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিউইয়র্কের ফৌজদারি মামলার বিচার চলাকালে আদালতের বাইরে জো বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারণার এক অনুষ্ঠানে অংশ নেন ডি নিরো। সেখানে তিনি ট্রাম্পকে ‘ক্লাউন’ বলে আখ্যা দেন এবং সতর্ক করেন, ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফিরলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক স্বাধীনতা ও নির্বাচনব্যবস্থা বিপদের মুখে পড়তে পারে।ডি নিরোর বক্তব্যের অন্যতম কেন্দ্র ছিল ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হামলা। তিনি মনে করতেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্য ও নির্বাচনের ফল নিয়ে তাঁর প্রচারণা আমেরিকান গণতন্ত্রকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তরের মৌলিক ধারণাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আদালতের বাইরে সেদিন তাঁর উপস্থিতিও ছিল প্রতীকী। একদিকে ট্রাম্পের ফৌজদারি মামলা, অন্যদিকে ৬ জানুয়ারির স্মৃতি—এই দুই বিষয় সামনে এনে ডি নিরো বলেছিলেন, ট্রাম্পকে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরানো মানে বড় ঝুঁকি নেওয়া।

২০২৫ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব ছিল ডি নিরোর ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানের সবচেয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলোর একটি। কানে তাঁকে সম্মানসূচক পাম দ’অর দেওয়া হয়। সাধারণত এমন মুহূর্তে একজন অভিনেতা নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ার, সহকর্মী ও সিনেমা নিয়ে কথা বলেন। ডি নিরোও সেগুলো করেছেন। কিন্তু এরপরই তাঁর বক্তব্য ঘুরে যায় রাজনীতির দিকে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রবার্ট ডি নিরো। ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বিদেশি চলচ্চিত্রে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরিকল্পনার সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল—সৃজনশীলতার কোনো মূল্য নির্ধারণ করা যায় না, অথচ চলচ্চিত্রের ওপর শুল্ক বসানোর পরিকল্পনা সেই সৃজনশীলতাকেই বাধাগ্রস্ত করবে। তিনি ট্রাম্পকে ‘ফিলিস্তিন’—অর্থাৎ শিল্প-সংস্কৃতির মূল্য না বোঝা ব্যক্তি—হিসেবে আক্রমণ করেন এবং শিল্প, মানবিক বিদ্যা ও শিক্ষায় কাটছাঁটেরও সমালোচনা করেন।

ট্রাম্প আবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও ডি নিরোর অবস্থান বদলায়নি। বরং ২০২৬ সালে তাঁর বক্তব্য আরও আবেগপ্রবণ হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণের আগে ডি নিরো একটি অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে আশঙ্কা ছিল, ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়তে চাইবেন না এবং তাঁকে থামানোর দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মার্কিন নাগরিকদেরই নিতে হবে।

তার কয়েক মাস পর, জুনে নিউইয়র্কে ‘রাইজ আপ, সিং আউট: আ কনসার্ট ফর দ্য ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট’ অনুষ্ঠানে আবারও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরব হন ডি নিরো।

সেদিন ছিল ট্রাম্পের ৮০তম জন্মদিন। ডি নিরো অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের একটি সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তাঁর বিখ্যাত সিনেমা ‘মিডনাইট রান’-এর সংলাপ ব্যবহার করে ট্রাম্পকে চুপ করতে বলেন। এরপর দর্শকদের সঙ্গে নিয়ে সেই বাক্যটি স্লোগানে পরিণত করেন।

এবার তাঁর বক্তব্য শুধু ট্রাম্পকে ঘিরে ছিল না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, যুদ্ধ, স্বাস্থ্যসেবা, পুলিশের সহিংসতা ও বর্ণবৈষম্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে যখন ডি নিরো বলেন, তিনি আবার তাঁর দেশকে ভালোবাসতে চান। দেশপ্রেমের প্রচলিত ধারণাকেও তিনি উল্টে দেন। তাঁর ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের প্রতি ভালোবাসার কথা বলা অনেকটা এমন—যেন নির্যাতনের শিকার কেউ তাঁর নির্যাতনকারীকে ভালোবাসার কথা বলছেন। একই বক্তৃতায় তিনি ট্রাম্পকে বর্ণবাদী, নারীবিদ্বেষী ও বিদেশিবিদ্বেষী স্বৈরাচারী হিসেবে বর্ণনা করেন।

আইএমডিবি ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে