ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলিউড তারকারা

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলিউড তারকারা। কোলাজ

ইরান যুদ্ধ নিয়ে সরব হলিউড। ইরানে সামরিক হামলার পর অভিনেতা, সংগীতশিল্পী, টক শো সঞ্চালক, প্রযোজকসহ বিনোদনজগতের অনেক পরিচিত মুখই প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। তাঁরা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনকে বলেছেন যে এটি বিপজ্জনক ও অপ্রয়োজনীয়। আবার ট্রাম্পের সমর্থকও আছেন। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও তাঁরা ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে শক্ত অবস্থান হিসেবে দেখেছেন।
কেবল ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই নয়, গাজায় হামলা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, এমনকি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় থেকেই ট্রাম্পকে ঘিরে হলিউড ছিল বিভক্ত। সেই পুরোনো বিভাজনকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে ইরান যুদ্ধ।

ইরান যুদ্ধের পরে সরব তারকারা
জ্যাক হোয়াইট মার্কিন সংগীতশিল্পী। ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প পরিবারের সন্তানদের কেউ যুদ্ধে যাবে না, মরবে অন্য মানুষের সন্তানেরা। বিশ্বাস হয়, ডনি (ট্রাম্প) এখনো সত্যিকারের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি? অন্যায়! হয়তো তৃতীয় মেয়াদে পাবেন।’

টক শো ‘দা রোজি ওডনেল শো’খ্যাত অভিনেত্রী রোজি ও’ডনেল বহুদিন ধরেই ট্রাম্পের সমালোচক। ইনস্টাগ্রামে তিনি ‘হি লাইজ অনলি অ্যান্ড অলওয়েজ #ইমপিচট্রাম্প’ ক্যাপশন দিয়ে ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের দুটি বক্তব্য পোস্ট করেন। যেমন ট্রাম্প নিজেকে ‘শান্তির প্রার্থী’ উল্লেখ করে বলেছিলেন যে তিনি যুদ্ধ শুরু করবেন না, যুদ্ধ থামাবেন।

অস্কারে চারবার মনোনয়ন পাওয়া অভিনেতা মার্ক রাফালো ইনস্টাগ্রামে ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক প্রধান আলোচকদের একজন জ্যারেড কুশনারকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন শেয়ার করে লেখেন, ‘আমরা যেন যুদ্ধে যাই, এটা নিশ্চিত করতেই তাঁকে পাঠানো হয়েছিল।’

জনপ্রিয় অভিনেতা জন কুস্যাক এক্সে লেখেন, এপস্টিন ফাইল থেকে মনোযোগ সরাতে আর নেতানিয়াহুর ইচ্ছা পূরণ করতে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো হয়েছে।
আরেক মার্কিন অভিনেত্রী ক্যারি কুনও এক্সে ট্রাম্পের নতুন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কমিটিকে ব্যঙ্গ করে নাম দিয়েছেন ‘যুদ্ধ মন্ত্রণালয়’।

৭ এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে যুদ্ধবিরতি নিয়ে লিখেছিলেন, ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা মারা যাবে।’ ওই রাতেই যুক্তরাষ্ট্রের এবিসির জনপ্রিয় লেট-নাইট টক শো ‘জিমি কিমেল লাইভ!’-এ এ নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গ করেন উপস্থাপক জিমি কিমেল। ট্রাম্পকে কটাক্ষ করে উপস্থাপক বলেন, কিছুদিন আগেও তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার অভিযোগ করছিলেন, আর এখন একটি সভ্যতাকে ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছেন। ট্রাম্পের স্বভাবই হলো প্রথমে ভয়াবহ হুমকি দেওয়া, পরে সময় বাড়িয়ে দেওয়া।

একই রাতে সিবিএসের ‘দ্য লেট শো’তে উপস্থাপক স্টিফেন কোলবার্ট প্রথমে ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গে না গিয়ে মহাকাশ অভিযান আর্টেমিস-টু নিয়ে কথা শুরু করেন। পৃথিবীতে ফেরার পথে থাকা এই মিশনের কথা টেনে তিনি বলেন, ‘খুব ভালো, শুনে ভালো লাগছে, সব ঠিকঠাক চলছে। কিন্তু কীভাবে বলি…বন্ধুরা, পৃথিবীতে ফেরার জন্য এটা খুব ভালো সময় নয়। বিস্ফোরণ না থামা পর্যন্ত হয়তো মহাকাশেই একটু চক্কর দিয়ে আসা ভালো।’

রবার্ট ডি নিরো। রয়টার্স

গাজা নিয়েও উত্তাল ছিল হলিউড
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে ইরান যুদ্ধের আগে থেকেই হলিউডে তীব্র বিতর্ক চলছিল। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন অনেক শিল্পী, অভিনেতা, পরিচালক ও সংগীতশিল্পী। ২০২৫ সালের ১৩ মে কান চলচ্চিত্র উৎসবের মতো আন্তর্জাতিক আসরে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছিলেন হলিউড কিংবদন্তি রবার্ট ডি নিরো ও ফরাসি অভিনেত্রী জুলিয়েট বিনোশ।

উৎসবের জুরিপ্রধান বিনোশ তাঁর বক্তব্যে ফাতিমা হাসউনাকে শ্রদ্ধা জানান। গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় মারা যান এই ফিলিস্তিনি আলোকচিত্রী।
আর রবার্ট ডি নিরো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘প্যালেস্টাইন’ (সংস্কৃতি, শিল্প ও রুচির মূল্য বোঝে না—এমন মানুষ) বলে আক্রমণ করেছিলেন। দুবার অস্কারজয়ী অভিনেতা তখন বলেছিলেন, স্বাধীনতায় বিশ্বাসী সবারই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা উচিত।

ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ‘নো কিংস’ নামের যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, সেখানেও ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করেছিলেন ডি নিরো। গত ২৮ মার্চ নিউইয়র্কে হাজারো মানুষের সামনে রবার্ট ডি নিরো বলেন, ‘ট্রাম্প আমাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য এক অস্তিত্বগত হুমকি।’

এর আগে গত ১৫ মার্চ অস্কারজয়ী আরেক স্প্যানিশ তারকা হাভিয়ের বারদেম ৯৮তম অস্কার মঞ্চে বলেছিলেন, ‘নো টু ওয়ার, অ্যান্ড ফ্রি প্যালেস্টাইন।’

ট্রাম্পের সমালোচনায় কিংবদন্তিরা
সংগীত কিংবদন্তি ব্রুস স্প্রিংস্টিন অনেক বছর ধরেই ট্রাম্পের সমালোচক। তবে ২০২৫ সালের মে মাসে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারের কনসার্টে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, তিনি যে আমেরিকাকে ভালোবাসেন, যে আমেরিকা ছিল আশা ও স্বাধীনতার প্রতীক, এখন সেটি দুর্নীতিগ্রস্ত, অদক্ষ ও বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ প্রশাসনের হাতে। তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্রে বিশ্বাসীদের এখন স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলতে হবে। যাঁরা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তাঁরা যেন চুপ না থাকেন।

পরে সামাজিক মাধ্যমে এ বক্তব্যের জবাব দেন ট্রাম্প। স্প্রিংস্টিনকে তিনি ‘শুকিয়ে যাওয়া কিশমিশের মতো রকার’ বলেন। আরও লেখেন, স্প্রিংস্টিনের গান তাঁর কখনোই ভালো লাগত না, তাঁর রাজনীতি পছন্দ করেন না এবং তিনি প্রতিভাবানও নন।
কিন্তু স্প্রিংস্টিনও পিছিয়ে যাননি। পরের রাতের কনসার্টেও তিনি একই সুরে আবারও বক্তব্য দেন।

দুবার অস্কার পাওয়া মার্কিন অভিনেতা জর্জ ক্লুনির সঙ্গে ট্রাম্পের সংঘাতের বিষয় ছিল অবশ্য সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। ২০২৫ সালের মার্চে সিবিএসের ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে ক্লুনি বলেছিলেন, যখন রাষ্ট্রের অন্য তিন স্তম্ভ ব্যর্থ হয়, তখন চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সংবাদমাধ্যমকে সফল হতে হয়। সরকার কখনোই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পছন্দ করে না।

জবাবে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ক্লুনিকে ‘দ্বিতীয় সারির সিনেমা তারকা’ এবং ‘ব্যর্থ রাজনৈতিক বিশ্লেষক’ বলে আক্রমণ করেন।

এর আগে অভিনেতা রিচার্ড গিয়ার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একজন ‘ধমকদাতা ও গুন্ডা’ হিসেবে বর্ণনা করে সমালোচনা করেন। স্পেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আজীবন সম্মাননা গ্রহণের সময় তিনি ট্রাম্পের রাজনীতিকে বিভাজনমূলক উল্লেখ করে সহানুভূতি ও মানবিকতার পক্ষে বিশ্বজুড়ে ঐক্যের আহ্বান জানান।

মেরিল স্ট্রিপ
এএফপি

ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত মেরিল স্ট্রিপ। ট্রাম্প-সমর্থিত ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যে সমালোচনার ঝড় বইছে, তাতে তিনবার অস্কার বিজয়ী মেরিল স্ট্রিপও যোগ দেন। ১ এপ্রিল ‘দ্য লেট শো উইথ স্টিফেন কলবার্ট’-এ তিনি বলেন, আইনটি পাস হলে বিবাহিত নারীরা ভোট দিতে ভোগান্তির মুখে পড়বেন। স্ট্রিপের ভাষ্য, যেসব নারী বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন করেছেন, তাঁদের ভোটার তালিকার নাম ও জন্মসনদের নাম আলাদা। ফলে রেজিস্ট্রারের কাছে গিয়ে পরিচয় প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় ভোটকেন্দ্র থেকে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হতে পারে।
উল্লেখ্য, রিপাবলিকানদের সমর্থিত সেভ অ্যাক্টে ভোট দিতে নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে আপত্তি তুলে ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, আইনটি কার্যকর হলে অনেক মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

জেন ফন্ডা। রয়টার্স

জেন ফন্ডা দুবার অস্কারজয়ী মার্কিন অভিনেত্রী, ফিটনেস আইকন এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরোধী কর্মী। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতির সমালোচক। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলার প্রতিবাদে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি লস অ্যাঞ্জেলেসে আয়োজিত এক সমাবেশে জেন ফন্ডা অংশ নেন। সেখানে তিনি ইরান পরিস্থিতিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেন। জেন ফন্ডা বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে এই বিপজ্জনক ও উন্মাদ যুদ্ধ শুধু আন্তর্জাতিক আইন, আমাদের সংবিধান ও ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করছে না, এটি আরও বড় আকারের যুদ্ধে বিস্ফোরিত হতে পারে, যেখানে অনেক মানুষ মারা যাবে, যার মধ্যে মার্কিন সেনারাও থাকবে।’
এরপর গত ২৭ মার্চ ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত সমাবেশে তিনি মার্কিন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান—‘নীরবতা ভাঙুন’ এবং ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়ান’।

আরও পড়ুন

ট্রাম্পের সমর্থকও আছেন
আবার কিছু পরিচিত মুখ আছেন, যাঁরা প্রকাশ্যে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে সমর্থনও করেছেন। যেমন দুবার অস্কারে মনোনয়ন পাওয়া অভিনেতা জেমস উডস ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পকে সমর্থন জানিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখেছেন, এর মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়ে প্রতিশ্রুতি রাখা হয়েছে।

ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে আরও আছেন ১৯৯০-এর দশকের টিভি সিরিজে সুপারম্যান চরিত্রে অভিনয় করা ডিন কেইন ও মার্কিন কৌতুক অভিনেত্রী রোজান বার।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়ই হলিউড তারকাদের বিভাজন স্পষ্ট হয়েছিল। তখন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন গায়িকা বিয়ন্সে, টেইলর সুইফট ও লিজো, কিংবদন্তি গায়ক ব্রুস স্প্রিংস্টিন, মার্কিন টিভি উপস্থাপক ও সমাজসেবী অপরাহ্ উইনফ্রে, গায়িকা ও অভিনেত্রী জেনিফার লোপেজ, মার্কিন র‍্যাপার এমিনেম ও কার্ডি বি, অভিনেতা টাইলার পেরি, হলিউড তারকা স্যামুয়েল এল জ্যাকসন ও আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগার এবং মার্কিন গায়ক উশার।

অন্যদিকে তখন ট্রাম্পের পক্ষে ছিলেন মার্কিন রক গায়ক কিড রক, র‍্যাপার কানিয়ে ওয়েস্ট, অস্কারজয়ী অভিনেতা ও অ্যাঞ্জেলিনা জোলির বাবা জন ভয়েট, অস্কারজয়ী অভিনেতা ও নির্মাতা মেল গিবসন, অভিনেতা ডেনিস কুয়েড প্রমুখ।

তথ্যসূত্র: ফক্স নিউজ, দ্য গার্ডিয়ান, ইউ এস টুডে, ভ্যারাইটি, এপি ও হলিউড রিপোর্টার