জন্মদিনে ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেন মা! সত্য ঘটনা পর্দায়

‘রোজমিড’ এর দৃশ্য। আইএমডিবি

হলিউড সিনেমা ‘রোজমিড’ শুধু একটি মনস্তাত্ত্বিক পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, এর পেছনে আছে এক ভয়ংকর বাস্তব সত্য। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ৯ জানুয়ারি মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা অনুপ্রাণিত হয়েছে ২০১৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার রোজমিডে ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক ঘটনা থেকে। ক্যানসারে আক্রান্ত ৪৯ বছর বয়সী মা লাই হ্যাং নিজের ১৭ বছর বয়সী মানসিকভাবে অসুস্থ ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন এই আশঙ্কায় যে সে কোনো দিন ভয়াবহ গণহত্যা ঘটাতে পারে।

‘রোজমিড’ এর দৃশ্য। আইএমডিবি

২০১৭ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসে প্রকাশিত সাংবাদিক ফ্র্যাঙ্ক শিয়ংয়ের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন লুসি লিউ। তিনি এখানে ‘আইরিন’ চরিত্রে এক এশীয়-আমেরিকান মা, যিনি সমাজের চোখে লুকিয়ে রাখতে চান ছেলের সিজোফ্রেনিয়া রোগের কথা।

বাস্তব পরিবারের গল্প
লাই হ্যাংয়ের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এশিয়ায়। শৈশব কেটেছে লাওসে, কৈশোর হংকংয়ে। জাপানের টোকিওতে গ্রাফিক ডিজাইনে পড়াশোনা শেষে ১৯৯২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে পিটার নামের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করে ক্যালিফোর্নিয়ার আলহামব্রায় একটি প্রিন্টিং ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসার সাফল্যে তাঁরা রোজমিডের একটি সুরক্ষিত আবাসিক এলাকায় বাড়ি কেনেন। ১৯৯৮ সালে জন্ম হয় তাঁদের ছেলে জর্জের।
২০১২ সালে জর্জ যখন হাইস্কুলের প্রথম বর্ষে, তখন ক্যানসারে মারা যান তাঁর বাবা। বাবার মৃত্যুর পর থেকেই জর্জের আচরণ বদলাতে থাকে। সে বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যায়, ধীরে ধীরে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়। একপর্যায়ে তার সিজোফ্রেনিয়া ধরা পড়ে।
কিন্তু এশীয়-আমেরিকান সমাজে মানসিক রোগ নিয়ে কথা বলা তখনো ছিল প্রবল ট্যাবু। লাই হ্যাং মনে করতেন, এসব বিষয় প্রকাশ্যে বললে পরিবারকে লজ্জার মুখে পড়তে হবে। ফলে তিনি কার্যত একাই ছেলের রোগের ভার বইতে থাকেন।

‘রোজমিড’ এর দৃশ্য। আইএমডিবি

মানসিক রোগ, গুজব আর ভয়
সিনেমায় দেখা যায়, আইরিনের আশপাশের নারীরা গুজব ছড়ান যে তার ছেলে ওষুধ খাচ্ছে, মানে সে ‘অশুভ শক্তিতে আক্রান্ত’। বাস্তব জীবনেও এই সামাজিক চাপ লাই হ্যাংয়ের মানসিক অবস্থাকে আরও ভেঙে দেয়।
জর্জ হ্যালুসিনেশনে ভুগত, মৃত বাবাকে দেখত, অদৃশ্য কণ্ঠস্বর শুনত। স্কুলে গুলি চালানোর মহড়ার সময় আতঙ্কে ছুটে বেরিয়ে যেত। একপর্যায়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, সে রাতের বেলায় চুপিচুপি স্কুল ভবনে ঢুকছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় ছিল, জর্জ বিভিন্ন গণহত্যাকারীর বিষয়ে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। ২০১৫ সালে চার্লস্টনে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ডিলান রুফের গির্জায় গুলি চালানোর ঘটনার পর লাই হ্যাং চরম আতঙ্কে ভেঙে পড়েন। ঠিক সেই সময়ই জানতে পারেন যে তাঁর নিজের ক্যানসার আর কয়েক মাসের মধ্যেই জীবন কেড়ে নেবে।

আরও পড়ুন

কেন কিনেছিলেন বন্দুক
ছেলের ল্যাপটপে লাই হ্যাং দেখেন, স্কুল শুটিং নিয়ে অসংখ্য ওয়েবপেজ, অস্ত্রের স্পেসিফিকেশন, স্কুলের মানচিত্র, খুলি আঁকা ছবি, ‘হেল’ লেখা কাগজ। এই সবকিছু মিলিয়ে তিনি নিশ্চিত হয়ে যান যে ছেলেকে থামাতে হবে।
২০১৫ সালের জুলাইয়ে লাই হ্যাং একটি হ্যান্ডগান কেনেন। সিনেমায় দেখানো হয়, বন্দুকের দোকানে গিয়ে তিনি জানতে চান, বিক্রেতা তাঁর ছেলেকে চিনতে পারেন কি না।


শেষ রাত
২৭ জুলাই ২০১৫। লাই হ্যাং ছেলেকে নিয়ে একটি মোটেলে ওঠেন যেখানে ছোটবেলায় পরিবারের সুখের স্মৃতি ছিল। বাস্তব জীবনেও সেই মোটেলেই জর্জ ঘুমিয়ে পড়লে মা তার বুকে দুইবার গুলি করেন।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে লাই হ্যাং ছেলের পাশে শুয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। পরে তিনি পুলিশকে বলেন, তিনি আত্মহত্যা করেননি, কারণ নিজের কাজের শাস্তি নিজেই পেতে চেয়েছিলেন।
সিনেমায় এই দৃশ্য আরও আবেগঘনভাবে দেখানো হয়। ছেলের ১৮তম জন্মদিনের উপহার, শেষ আশ্বাস, গুলির শব্দ, তারপর নিস্তব্ধতা।

‘রোজমিড’ এর দৃশ্য। আইএমডিবি

কারাগার, মুক্তি ও মৃত্যু
গ্রেপ্তারের পর কারাগারে থাকাকালে লাই হ্যাংয়ের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়। তাঁর দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয় এবং তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বিচার শুরুর আগেই মানবিক কারণে তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁর মৃত্যু হয়।


প্রশ্ন রয়ে যায়
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সত্যটি হলো, লাই হ্যাংয়ের সামনে বিকল্প পথ ছিল। আদালতের মাধ্যমে ছেলেকে তত্ত্বাবধানে নেওয়া, মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানো—এসব আইনি সুযোগ তখনো ছিল। কিন্তু সামাজিক ভয়, মানসিক চাপ ও সময়ের অভাব তাঁকে সেই পথে যেতে দেয়নি।
‘রোজমিড’ তাই শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক ট্যাবু ও এক মায়ের অসহায়তার করুণ দলিল।


টাইম অবলম্বনে