হলিউড থেকে বলিউড: প্রকৃতিই এখানে সিনেমার সেট
ক্যালগারি শহর ছেড়ে আমাদের গাড়ি যতই কানাডিয়ান রকিজের দিকে এগোচ্ছিল, ততই বদলে যাচ্ছিল চারপাশের দৃশ্য। শহর পেছনে ফেলে সমতল পেরোনোর পর একসময় দূরে উঁকি দিতে শুরু করল পাহাড়। যত এগোচ্ছি, পাহাড়গুলো তত কাছে আসছে; কোথাও কোথাও চূড়ায় সাদা বরফ। গন্তব্য লেক লুইজ। ক্যালগারি থেকে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার পথ।
ছবিতে অনেকবার দেখেছি জায়গাটি। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, ক্যামেরা যেন এই সৌন্দর্যের পুরোটা ধরতে পারে না। চারদিকে কানাডিয়ান রকি পর্বতমালা, পাহাড়ের গায়ে সাদা বরফ। সামনে স্বচ্ছ পানির লেক লুইজ, ওপারে ভিক্টোরিয়া হিমবাহ। এর মধ্যেই হালকা তুষার পড়ছে। কখনো হ্রদের পানিতে, কখনো পর্যটকদের গায়ে এসে পড়ছে তুষারকণা। লেকের এক প্রান্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক ফেয়ারমন্ট শাতো লেক লুইজ।
কানাডার আলবার্টা প্রদেশের ব্যান্ফ ন্যাশনাল পার্কের এই জায়গা পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। কিন্তু লেক লুইজের আরেকটি পরিচয়ও আছে। প্রায় এক শতাব্দী ধরে সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই হ্রদ, পাহাড় আর ঐতিহাসিক হোটেলের গল্প।
সেই গল্পের শুরুটা অবশ্য আমার জানা ছিল না। সেদিন দুপুরে ঘুরে দেখানোর সময় স্থানীয় বাসিন্দা জেসন মিলার প্রথম সূত্রটি দিলেন। গাড়ি তখন রকিজের পাহাড়ি পথ ধরে এগোচ্ছে। জানালার বাইরে কখনো পাহাড়, কখনো হ্রদ। সেই দৃশ্য দেখাতে দেখাতেই জেসন বললেন, মেরিলিন মনরো থেকে আলফ্রেড হিচকক—হলিউডের বহু কিংবদন্তির স্মৃতি ছড়িয়ে আছে এই অঞ্চলে।
বলিউডও পিছিয়ে নেই। হৃতিক রোশন–প্রীতি জিনতার জনপ্রিয় সিনেমার শুটিংয়ের গল্পও বললেন তিনি।
কৌতূহল হলো। ফেয়ারমন্ট শাতো লেক লুইজে পৌঁছে তাই ঘোরাঘুরির পাশাপাশি খুঁজতে শুরু করলাম সিনেমার সেই ইতিহাস। অভ্যর্থনাকেন্দ্রে রাখা তথ্যভান্ডার ঘাঁটলাম। পুরোনো ছবি ও তথ্য দেখলাম। পরে ফিরে নিজের মতো করে মিলিয়ে দেখলাম গাইডের কাছে শোনা গল্পগুলো।
দেখা গেল, গল্পের শিকড় বেশ গভীরে।
হিস্টোরিক হোটেলস ওয়ার্ল্ডওয়াইডের নথিতে ফেয়ারমন্ট শাতো লেক লুইজকে পশ্চিম কানাডার ‘হলিউড নর্থ’ ইতিহাসের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে জন ব্যারিমোর, বেটি গ্রেবল ও কারমেন মিরান্ডার মতো তারকাদের সিনেমার সঙ্গে লেক লুইজের যোগের কথা আছে। আবার হোটেলের বিখ্যাত অতিথিদের তালিকায় পাওয়া যায় মেরি পিকফোর্ড, ডগলাস ফেয়ারব্যাংকস, আলফ্রেড হিচকক, মেরিলিন মনরো ও ‘সুপারম্যান’ তারকা ক্রিস্টোফার রিভের নাম।
অর্থাৎ, পর্যটকদের ক্যামেরায় জায়গাটি পরিচিত হওয়ার বহু আগেই সিনেমার ক্যামেরা এসে পৌঁছেছিল এখানে।
ছোট্ট শ্যালে থেকে ঐতিহাসিক হোটেল
সিনেমার গল্পে যাওয়ার আগে হোটেলটির ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ। লেক লুইজের তীরে শাতোর যাত্রা শুরু ১৮৯০ সালে। কানাডিয়ান প্যাসিফিক রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক কর্নেলিয়াস ভ্যান হর্ন তখন এখানে একতলা একটি কাঠের শ্যালে তৈরি করেন। খাবারের জায়গা, বার ও দুটি শোবার ঘর—এই ছিল শুরু।
উদ্দেশ্যও ছিল পরিষ্কার। কানাডিয়ান রকিজের প্রকৃতি দেখতে আসা অভিযাত্রী ও পর্যটকদের থাকার একটি জায়গা তৈরি করা। সে সময় রেলপথই এই দুর্গম অঞ্চলের সঙ্গে বাইরের মানুষের যোগাযোগ সহজ করে তুলছিল।
শুরুর বছর ১৮৯০ সালে অতিথির সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০। দুই দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে ছবিটা পাল্টে যায়। ১৯১২ সাল নাগাদ বছরে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ আসতে শুরু করেন। বাড়তে থাকে হোটেলের পরিসরও। আগুন, পুনর্নির্মাণ এবং কয়েক দফা সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে ছোট কাঠের শ্যালেই একসময় রূপ নেয় আজকের বিশাল ফেয়ারমন্ট শাতো লেক লুইজে।
হোটেলটির ইতিহাসের সঙ্গে কানাডিয়ান রকিজে পর্বতারোহণের বিকাশও জড়িয়ে আছে। উনিশ শতকের শেষ দিকে এখানে পেশাদার সুইস পর্বতারোহী গাইড আনা হয়েছিল। পর্যটকদের পাহাড়ে ওঠা ও স্কি শেখাতেন তাঁরা। ধীরে ধীরে লেক লুইজ হয়ে ওঠে পাহাড়প্রেমী ও অভিযাত্রীদের আকর্ষণের কেন্দ্র।
সম্ভবত এই দুর্গম আর অপরূপ প্রকৃতির যুগলবন্দীই পরে সিনেমার মানুষদেরও টেনে এনেছিল।
যে হোটেলের অতিথি মেরিলিন
একেবারে লেকের পাশেই হোটেলটির অবস্থান। বাইরে থেকে দেখলে একদিকে বিশাল ভবন, অন্যদিকে তার সামনে পাহাড় আর হ্রদ। গাড়িতে গাইডের কথা শোনার পর থেকেই জায়গাটি নিয়ে বাড়তি কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। সেখানে পৌঁছে তাই খুঁজতে শুরু করলাম বিনোদনজগতের সঙ্গে এর যোগসূত্র।
ঐতিহাসিক অতিথিদের তালিকার সবচেয়ে চমকজাগানো নামগুলোর একটি মেরিলিন মনরো। হিস্টোরিক হোটেলস ওয়ার্ল্ডওয়াইডের নথিতেও শাতো লেক লুইজের বিখ্যাত অতিথিদের মধ্যে তাঁর নাম রয়েছে।
মনরোর সঙ্গে কানাডিয়ান রকিজের সম্পর্ক অবশ্য শুধু বেড়াতে আসার নয়। ১৯৫৩ সালে ‘রিভার অব নো রিটার্ন’ সিনেমার শুটিং করতে এ অঞ্চলে এসেছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন রবার্ট মিচাম। অটো প্রিমিঞ্জার পরিচালিত সিনেমাটি মুক্তি পায় পরের বছর।
হলিউডের স্টুডিও ছেড়ে ছবিটির দল এসেছিল প্রকৃতির মধ্যে। ব্যান্ফ ও জ্যাসপার ন্যাশনাল পার্ক এবং বো, ম্যালিন, স্নেক ইন্ডিয়ান নদীসহ কানাডিয়ান রকিজের বিভিন্ন জায়গায় এর দৃশ্য ধারণ করা হয়। ছবির গল্পে নদী, পাহাড় আর দুর্গম প্রকৃতির যে ভূমিকা, বাস্তব লোকেশন সেই আবহ তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
মনরোর সেই সফরের অনেক ছবিও এখন ইতিহাসের অংশ। ‘লুক’ সাময়িকীর আলোকচিত্রী জন ভ্যাশন ১৯৫৩ সালের আগস্টে ব্যান্ফে তাঁর ছবি তুলেছিলেন। সিনেমার শুটিংয়ের সময় গোড়ালিতে আঘাত পান অভিনেত্রী। কয়েক দিন কাজও করতে পারেননি।
ক্রাচ হাতে মনরোর সেই সময়ের ছবিগুলো পরে বিশেষভাবে পরিচিতি পায়। শাতো লেক লুইজে ঘুরতে গিয়ে ছবিগুলোর কয়েকটি দেখলাম। সাত দশকের বেশি সময় আগের মেরিলিন মনরোর ছবির পেছনের পাহাড়ের সঙ্গে জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রকিজকে মেলানোর অভিজ্ঞতাটাও অন্য রকম।
মনরো তখন হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত তারকাদের একজন। ‘রিভার অব নো রিটার্ন’ মুক্তির আগের বছরই এসেছে তাঁর ‘জেন্টলমেন প্রেফার ব্লন্ডস’ ও ‘হাউ টু ম্যারি আ মিলিয়নিয়ার’। সেই সময়ে মেরিলিনই দিনের পর দিন শুটিং করেছেন এই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে।
শাতো লেক লুইজের ঐতিহাসিক অতিথি হিসেবে তাঁর নাম নথিবদ্ধ। আর ‘রিভার অব নো রিটার্ন’-এর শুটিংয়ের ইতিহাস ছড়িয়ে আছে বৃহত্তর ব্যান্ফ–জ্যাসপার–কানাডিয়ান রকিজজুড়ে। ফলে এ অঞ্চলের সিনেমা-ইতিহাসে মনরোর উপস্থিতি শুধু অতিথি হিসেবে নয়, কাজের সূত্রেও।
এসেছিলেন হিচককও
পুরোনো নামগুলো দেখতে দেখতে আরেক জায়গায় এসে চোখ আটকে গেল—আলফ্রেড হিচকক। ‘সাইকো’, ‘ভার্টিগো’, ‘রিয়ার উইন্ডো’, ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’—সিনেমার ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে থাকা এসব ছবির নির্মাতার নামও ফেয়ারমন্ট শাতো লেক লুইজের ঐতিহাসিক অতিথিদের তালিকায়। হোটেলে তাঁর ছবিও আছে। হিস্টোরিক হোটেলস ওয়ার্ল্ডওয়াইড তাঁকে এখানকার বিখ্যাত অতিথিদের একজন হিসেবে নথিবদ্ধ করেছে।
মনরোর ক্ষেত্রে যেমন সিনেমার শুটিংয়ের যোগ আছে, হিচককের ক্ষেত্রে তেমন তথ্য পাওয়া গেল না। তিনি শাতো লেক লুইজের অতিথি ছিলেন—এর প্রামাণ্য তথ্য রয়েছে। কিন্তু তাঁর কোনো বিখ্যাত সিনেমা এখানে ধারণ করা হয়েছিল, এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি।
তাই তাঁর ক্ষেত্রে গল্পটা অন্য রকম। সিনেমার লোকেশন হিসেবে নয়, ব্যক্তিগত সফরের সূত্রেই লেক লুইজের ইতিহাসে থেকে গেছে হিচককের নাম।
তারপরও হোটেলের ভেতরে তাঁর ছবি দেখে বাইরে তাকালে একটা ব্যাপার মনে হচ্ছিল—দৃশ্যের আবহ দিয়ে দর্শকের মনে রহস্য, ভয় আর বিস্ময় তৈরিতে যিনি ছিলেন অসাধারণ, তিনিও একসময় নিজের চোখে দেখেছিলেন এই পাহাড় আর হ্রদ।
হলিউড এসেছিল আরও আগে
মেরিলিন মনরো কিংবা হিচককের আগেই অবশ্য লেক লুইজকে আবিষ্কার করেছিল হলিউডের ক্যামেরা।
সেই ইতিহাস খুঁজতে ফিরে যেতে হয় নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে। ১৯২৯ সালে মুক্তি পায় আর্নস্ট লুবিচের ‘ইটারনাল লাভ’। প্রধান চরিত্রে ছিলেন জন ব্যারিমোর ও ক্যামিলা হর্ন।
ছবিটির গল্পের পটভূমি সুইস আল্পস। কিন্তু ইউরোপের সেই পাহাড়ি আবহ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছিল কানাডিয়ান রকিজকে। ঐতিহাসিক নথিতে শাতো লেক লুইজের সঙ্গে সিনেমাটির দৃশ্যধারণের যোগের কথা রয়েছে।
ব্যাপারটি মজার। গল্প সুইজারল্যান্ডের, কিন্তু পর্দায় সেই দেশের পাহাড় হয়ে উঠেছে কানাডার রকিজ। আজকের মতো কম্পিউটার–নির্ভর দৃশ্য তৈরির সুযোগ তখন ছিল না। গল্পের প্রয়োজনেই নির্মাতাদের খুঁজে নিতে হতো বাস্তব ভূদৃশ্য। লেক লুইজ ও তার চারপাশের পাহাড় সেই পরীক্ষায় উতরে গিয়েছিল প্রায় এক শতাব্দী আগে।
‘ইটারনাল লাভ’ ছিল নির্বাক সিনেমা; সঙ্গে ছিল সংগীত ও শব্দপ্রভাব। ১৯২৯ সালের মে মাসে নিউইয়র্কে ছবিটির উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। এত বছর পরও লেক লুইজের ইতিহাসে জন ব্যারিমোরের নাম থেকে গেছে সেই সিনেমার সূত্রে।
শুধু শুটিং নয়, তারকাদের অবকাশযাপনের গন্তব্য হিসেবেও জায়গাটির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। শাতো লেক লুইজের অতিথিদের মধ্যে ছিলেন নির্বাক চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি মেরি পিকফোর্ড ও ডগলাস ফেয়ারব্যাংকস। পরে এসেছেন মনরো, হিচকক, ক্রিস্টোফার রিভ।
তাঁরা সবাই যে সিনেমার কাজে এসেছিলেন, তা নয়। কেউ কাজের সূত্রে, কেউ নিছক অবকাশ কাটাতে। কিন্তু নামগুলো পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, বিশ শতকের প্রথম ভাগ থেকেই রকিজের এই হ্রদ সিনেমাজগতের মানুষের কাছেও পরিচিত গন্তব্য হয়ে উঠেছিল।
কেন ক্যামেরার এত পছন্দ
লেক লুইজে দাঁড়ালে সিনেমা নির্মাতাদের আগ্রহের কারণ বুঝতে খুব বেশি গবেষণার প্রয়োজন হয় না। একই অঞ্চলে হ্রদ, হিমবাহ, বরফঢাকা পাহাড়, ঘন বন আর বিস্তীর্ণ উপত্যকা। কিছুটা পথ এগোলেই দৃশ্য বদলে যায়। কোথাও নীল-সবুজ পানি, কোথাও পাথুরে পাহাড়, কোথাও বরফ। একই অঞ্চলের ভূদৃশ্যকে তাই পর্দায় কখনো কানাডা, কখনো ইউরোপের পাহাড়ি এলাকা হিসেবে দেখানো সম্ভব।
তার সঙ্গে আছে ঋতুর বদল। গ্রীষ্মে যে পাহাড় সবুজ আর নীল পানির পটভূমি, শীতে সেটিই বরফে ঢাকা অন্য এক জগৎ। সিনেমার জন্য যেন তৈরি প্রাকৃতিক মঞ্চ।
হলিউড সেই সুবিধা বুঝেছিল অনেক আগেই। কয়েক দশক পর একই ভূদৃশ্যের দিকে নজর পড়ে ভারতীয় সিনেমা নির্মাতাদেরও।
হৃতিক–প্রীতির সিনেমারও চেনা এই রকিজ
হলিউডের গল্প বলতে বলতেই গাইড জেসন মিলার টেনে আনলেন বলিউডের প্রসঙ্গ। বললেন, হৃতিক রোশন ও প্রীতি জিনতার ‘কোই...মিল গায়া’র বেশ কিছু দৃশ্য ও গান ধারণ করা হয়েছিল কানাডিয়ান রকিজের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে।
ফেয়ারমন্ট শাতো লেক লুইজের অভ্যর্থনাকেন্দ্রে রাখা তথ্যভান্ডারেও এ অঞ্চলের সঙ্গে সিনেমাটির যোগের উল্লেখ চোখে পড়ল।
কৌতূহল থেকে চট করে ইউটিউবে সিনেমাটির কয়েকটি দৃশ্য ও গান আবার দেখে নিলাম। তখনই চেনা দৃশ্যগুলো যেন নতুন করে ধরা দিল। ‘হায়লা হায়লা হুয়া হুয়া’ গানটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হৃতিক–প্রীতির পেছনে কানাডিয়ান রকিজের পাহাড়, হ্রদ আর বিস্তীর্ণ প্রান্তর।
লেক লুইজে দাঁড়িয়ে গানটি আবার দেখতে দেখতে চোখের সামনে দেখা ভূদৃশ্যের সঙ্গে পর্দার দৃশ্যগুলো মেলাতে খুব একটা কষ্ট হলো না। এত দিন গানটি দেখেছি হৃতিক–প্রীতির রোমান্টিক গান হিসেবেই। এবার চোখ আটকে যাচ্ছিল তাঁদের পেছনের দৃশ্যে।
পরে তথ্য খুঁজতে গিয়ে মিলল আরও প্রমাণ। ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া রাকেশ রোশন পরিচালিত ‘কোই...মিল গয়া’র শুটিং হয়েছিল কানাডার বিভিন্ন জায়গায়। ছবির শিশু–অভিনেতা অনুজ পণ্ডিত শর্মা পরে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ছবির দল প্রায় এক মাস কানাডায় ছিল। সেখানে ‘জাদু’ ও ‘ইন পঞ্ছিয়োঁ কো দেখকার’—এই দুটি গানের শুটিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
ছবিটি মুক্তির পর হৃতিকের রোহিত চরিত্র এবং ভিনগ্রহের প্রাণীজাদু ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কিন্তু লেক লুইজে এসে নতুন করে ছবিটির গান দেখতে গিয়ে বোঝা গেল, গল্পের বাইরে এর দৃশ্যপটেও কানাডার বড় উপস্থিতি ছিল।
‘তুম বিন’ থেকে অক্ষয়–ক্যাটরিনা
এই অঞ্চলের সঙ্গে বলিউডের সম্পর্ক অবশ্য ‘কোই...মিল গায়া’তেই সীমাবদ্ধ নয়।
ক্যালগারি থেকে লেক লুইজে আসার পথে আলবার্টার যে বিস্তীর্ণ ভূদৃশ্য চোখে পড়ছিল, দুই দশকের বেশি সময় আগে সেই ক্যালগারিতেই ক্যামেরা নিয়ে এসেছিলেন পরিচালক অনুভব সিনহা। তাঁর প্রথম সিনেমা ‘তুম বিন’-এর বড় অংশের শুটিং হয়েছিল ক্যালগারিতে।
২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া প্রেমের এই সিনেমা পরে আলাদা দর্শকপ্রিয়তা পায়। ছবির গল্পের বড় অংশই কানাডাকেন্দ্রিক। ফলে ক্যালগারি সেখানে শুধু সুন্দর পটভূমি নয়, গল্পের জায়গাও।
এরপর আলবার্টায় এসেছে আরও বলিউড তারকার দল। ২০০৬ সালের ‘হামকো দিওয়ানা কার গায়ে’র শুটিং হয়েছে ক্যালগ্যারি, ড্রামহেলার ও এডমন্টনে। অক্ষয় কুমার ও ক্যাটরিনা কাইফ অভিনীত সিনেমাটির দৃশ্যধারণে কানাডিয়ান রকিজও ব্যবহৃত হয়েছিল।
২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া অক্ষয় অভিনীত ‘এইট বাই টেন তাসভির’-এর শুটিংও হয়েছিল ক্যালগারিতে। নাগেশ কুকুনুর পরিচালিত রহস্যধর্মী সিনেমাটির গল্পেও কানাডার উপস্থিতি রয়েছে।
ক্যালগারি থেকে ব্যান্ফ হয়ে লেক লুইজের দিকে আসতে আসতে যে পাহাড়, হ্রদ আর বিস্তীর্ণ প্রান্তর চোখে পড়ে, সেগুলো তাই শুধু হলিউডেরই চেনা নয়। সময়ের ব্যবধানে ভারতীয় সিনেমার ক্যামেরাও বারবার এসেছে আলবার্টায়।
প্রকৃতিই এখানকার সবচেয়ে বড় সেট
দিনের শুরুতে ক্যালগারি ছাড়ার সময় এই সিনেমা-ইতিহাসের কিছুই মাথায় ছিল না। তখন আকর্ষণ ছিল লেক লুইজ দেখা। গাড়ি রকিজের দিকে ঢোকার পর গাইডের মুখে একের পর এক তারকার নাম শুনে ভ্রমণটা অন্য মাত্রা পেল। তারপর হোটেলে মেরিলিন মনরোর ছবি, হিচককের নাম; পুরোনো হলিউডের শুটিংয়ের ইতিহাস। মোবাইলে আবার ‘কোই...মিল গায়া’র গান দেখা—সব মিলিয়ে পরিচিত জায়গাটিকে অন্যভাবে দেখতে শুরু করলাম।
সেদিন লেক লুইজের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, প্রায় এক শতাব্দীতে সিনেমা কতটা বদলে গেছে—নির্বাক থেকে সবাক, সাদা–কালো থেকে রঙিন, সেলুলয়েড থেকে ডিজিটাল। বদলেছে এই হ্রদের তীরও। ১৮৯০ সালের ছোট্ট কাঠের শ্যালে এখন বিশাল ফেয়ারমন্ট শাতো লেক লুইজ। অথচ চারপাশের প্রকৃতির দিকে তাকালে সময়ের সেই ব্যবধান টের পাওয়া কঠিন।
সামনে লেক লুইজ, পেছনে ভিক্টোরিয়া হিমবাহ আর রকি পর্বতমালা। আলো আর মেঘের সঙ্গে হ্রদের পানিও যেন রং বদলাচ্ছিল—কখনো ফিরোজা, কখনো সবুজাভ। এর মধ্যেই হালকা তুষারপাত। তুষারকণা পড়ছিল হ্রদের পানিতে, এসে লাগছিল পর্যটকের গায়ে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ দাঁড়িয়ে শুধু দেখছেন। চারদিকে তাকালে মনে হচ্ছিল, বিশাল কোনো চলচ্চিত্রের সেটে দাঁড়িয়ে আছি। আসলে এখানে আলাদা করে সেট তৈরির প্রয়োজনই–বা কী?