‘ইনসাইড আউট’ দেখে বদলে গেল ৭ বছরের শিশু

‘ইটি’ ও ‘ইনসাইড আউট’ সিনেমার পোস্টার। কোলাজ

অস্ট্রেলিয়ার সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র মেলবোর্নের ফেডারেশন স্কয়ারে অবস্থিত ‘অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর দ্য মুভিং ইমেজ’ বা এসিএমআই। পর্দা–সংস্কৃতির এই অনন্য জায়গাটি কেবল চলচ্চিত্র বা ভিডিও গেমসের সংগ্রহশালা নয়, বরং এটি বর্তমান প্রজন্মের জন্য একটি আধুনিক শিক্ষালয়। প্রতিবছর ১০ লক্ষাধিক দর্শনার্থীর পদচারণে মুখর এই প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি শিশুদের মানসিক বিকাশে এক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। ‘কিডস ফ্লিকস উইথ ফিলিংস’ নামক এই বিশেষ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে তারা শিশুদের শেখাচ্ছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ; সহানুভূতি ও আবেগময় বুদ্ধিমত্তা।

এসিএমআইয়ের এই আয়োজন মূলত শিশুদের বড় বড় সব আবেগ, যেমন ভয়, আনন্দ, দুঃখ কিংবা বিষাদকে চিনতে ও বুঝতে সাহায্য করে। অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের এক প্রতিবেদনে এমনটি উঠে আসে এসিএমআইয়ের জ্যেষ্ঠ কিউরেটর রিস গুডউইনের কথায়। তাঁর মতে, চলচ্চিত্রের মূল সার্থকতা নিহিত থাকে সহানুভূতির ভেতরে। যখন কোনো শিশু পর্দার চরিত্রের কষ্ট দেখে নিজের চোখে জল আনে, তখনই সে অন্যের দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার প্রথম পাঠটি পায়। স্কুল ছুটির দিনগুলোতে এই বিশেষ প্রদর্শনী শিশুদের কেবল বিনোদন দিচ্ছে না, বরং তাদের আবেগময় বুদ্ধিমত্তা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। প্রতিটি প্রদর্শনী শেষে শিশুদের একটি করে ‘অ্যাকটিভিটি কিট’ বা কাজের সরঞ্জাম দেওয়া হয়, যাতে তারা ঘরে ফিরেও সেই সিনেমার আবেগগুলো নিয়ে ভাবতে পারে।

‘ইটি’ সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবি

স্মৃতির পাতায় এলিয়ট ও ইটি
স্টিভেন স্পিলবার্গের ১৯৮২ সালের সেই অমর সৃষ্টি ‘ইটি দ্য এক্সট্রা টেরেস্ট্রিয়াল’ আজও কেন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত? ক্যালিফোর্নিয়ার কিশোর এলিয়ট যখন পথ হারানো এক ভিনগ্রহবাসীকে ভয় না পেয়ে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সেটি কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনি থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে সহানুভূতির এক জীবন্ত দলিল। এসিএমআইয়ের পর্দায় যখন ‘ইটি’ বা ‘ইনসাইড আউট ২’–এর মতো চলচ্চিত্রগুলো দেখানো হয়, তখন শিশুরা তাদের মনের ভেতরের দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগের মতো জটিল বিষয়গুলোকে চিনতে শেখে। ‘কোকো’ সিনেমাটি তাদের শেখায় পূর্বপুরুষদের সম্মান জানাতে, আর ‘ল্যাবিরিন্থ’ শেখায় ভয়কে জয় করার সাহস।

‘ইনসাইড আউট’ সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবি

প্রবাসী বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা
বিদেশ বিভুঁইয়ে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি শিশুদের জন্য এই মাধ্যমটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। সিডনির প্রবাসী বাংলাদেশি মনোবিজ্ঞানী ও নাট্যকার জন মার্টিন এ প্রসঙ্গে তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি, সিডনিতে আমাদের কমিউনিটির অনেক শিশু যখন ভালো মানের চলচ্চিত্র বা জীবনমুখী নাটক দেখে, তারা কেবল ভাষা শেখে না, বরং চরিত্রের হাসি-কান্নার মধ্য দিয়ে সম্পর্কের গভীরতা বুঝতে শেখে। আমার নাটকে যখন কোনো কিশোর তার শিকড়ের গল্প বলে, তখন দর্শকসারিতে থাকা অন্য শিশুরা সেই আবেগের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। এই একাত্মতা বা অন্যের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে পারাটাই হলো সামাজিক বিকাশের মূল চাবিকাঠি।’

সিডনির আরেক প্রবাসী অভিভাবক তানভীর আহমেদ তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানান, ‘আমার সাত বছরের ছেলে আগে খুব জেদ করত। কিন্তু ‘ইনসাইড আউট’ দেখার পর সে এখন তার রাগ বা মন খারাপের কারণগুলো বলতে পারে। সিনেমা এখন আমাদের বাসায় কেবল বিনোদন নয়, বরং বাবা-ছেলের কথোপকথনের একটা বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

আরও পড়ুন

এ ছাড়া গবেষকদের মতে, বই পড়ার চেয়ে চলচ্চিত্র দেখা শিশুদের জন্য আবেগের পাঠ নিতে অনেক সময় সহজতর হয়। ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লুইস প্যাচ মনে করেন, শ্রবণ ও দর্শনের অপূর্ব সমন্বয়ে সৃষ্ট চলচ্চিত্রের আবহসংগীত বা চরিত্রের গলার স্বর শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তবে কেবল সিনেমা দেখিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সিনেমা দেখার পর সন্তানকে প্রশ্ন করা উচিত—চরিত্রটি কেন কাঁদছে বা সে কেন রেগে গেল? এই প্রশ্নগুলোই শিশুদের নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

আজকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে শিশুকে পর্দা থেকে দূরে রাখা প্রায় অসম্ভব। তাই ‘স্ক্রিন টাইম’ বা পর্দায় কাটানো সময় নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে, তারা কী দেখছে এবং তা থেকে কী শিখছে সেদিকে নজর দেওয়াই শ্রেয় আর এসিএমআই সঠিক চলচ্চিত্রের হাত ধরে শিশুদের কল্পনাশক্তি আর সহানুভূতি জাগাতে সেদিকেই কাজ করছে।