কী হলো এবারের গোল্ডেন গ্লোবে, জানুন আলোচিত ৭ ঘটনা
সমালোচকদের প্রায় সব অনুমান সত্যি হয়েছে, গতকাল ভোরে অনুষ্ঠিত গোল্ডেন গ্লোবে সর্বোচ্চ চার পুরস্কার জিতেছে পল টমাস অ্যান্ডারসনের ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। তবে আফসোস, খালি হাতে ফিরেছেন ছবির অভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও। টেলিভিশন বিভাগে চার পুরস্কার পেয়েছে নেটফ্লিক্সের আলোচিত সিরিজ ‘অ্যাডোলেসেন্স’। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার দ্য বেভারলি হিলটন হোটেলে অনুষ্ঠিত এবারের গোল্ডেন গ্লোব সঞ্চালনা করেন কমেডিয়ান-অভিনেত্রী নিকি গ্লেজার।
‘ওয়ান ব্যাটল’-এর জয়
চরমপন্থা, অভিবাসন অভিযান ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ—এসব রাজনৈতিক ও সামাজিক টানাপোড়েনের গল্প নিয়ে নির্মিত ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’ মুক্তির পর থেকেই ছিল আলোচনায়। কারণটাও সহজেই অনুমেয়, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতায় ছবিটি দর্শক ও সমালোচকদের সঙ্গে গভীরভাবে সংযোগ তৈরি করতে পেরেছে। সিনেমাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন নির্মাতা। গোল্ডেন গ্লোবে নয়টি মনোনয়ন নিয়ে এগিয়ে ছিল সিনেমাটি, গতকাল পুরস্কার জিতেছে চার বিভাগে—সেরা কমেডি চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালক (পল টমাস অ্যান্ডারসন), সেরা চিত্রনাট্য এবং সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী (তিয়ানা টেইলর)। পুরস্কার গ্রহণ করে উচ্ছ্বসিত অ্যান্ডারসন বলেন, ‘এ ছবি আর আমাকে ঘিরে আপনারা যে ভালোবাসা দেখাচ্ছেন, তা সত্যিই অসাধারণ। আমি সবটাই গ্রহণ করছি।’
ডিক্যাপ্রিওকে হারিয়ে দিলেন শ্যালামে
প্রথমবারের মতো গোল্ডেন গ্লোব জিতলেন এই সময়ের আলোচিত তরুণ অভিনেতা টিমোথি শ্যালামে। ‘মার্টি সুপ্রিম’ সিনেমার জন্য এ পুরস্কার পান তিনি। এ বিভাগে শ্যালামের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ‘ওয়ান ব্যাটল’ অভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও। জশ সাফদি পরিচালিত ছবিতে পঞ্চাশের দশকের এক টেবিল টেনিস খেলোয়াড়ের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য এই সম্মান পেলেন শ্যালামে। আগে আরও চারবার গোল্ডেন গ্লোবের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন; কিন্তু প্রতিবারই খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। তাই এই জয় তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
পুরস্কার গ্রহণের সময় আবেগঘন কণ্ঠে শ্যালামে বলেন, ‘আমার বাবা ছোটবেলা থেকেই আমাকে কৃতজ্ঞ থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলতেন, “যা আছে, তার জন্য সব সময় কৃতজ্ঞ থাকবে।” সেই শিক্ষাই আমাকে আগের পুরস্কার অনুষ্ঠানগুলোয় খালি হাতে ফিরেও মাথা উঁচু করে থাকতে শিখিয়েছে। সত্যি বলতে কি, ওই হারগুলোই আজকের এই মুহূর্তকে আরও মধুর করে তুলেছে।’
‘হ্যামনেট’–চমক
অনুষ্ঠানের শেষ ও সবচেয়ে বড় চমক আসে সেরা ড্রামা চলচ্চিত্র বিভাগের পুরস্কার থেকে। প্রত্যাশিত বিজয়ী ‘সিনার্স’–কে পেছনে ফেলে পুরস্কার জিতে নেয় ‘হ্যামনেট’। এই ট্র্যাজিক সাহিত্যনির্ভর ছবিটি উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ছেলে হারানোর শোক ও দাম্পত্য সম্পর্কের ভাঙনকে কেন্দ্র করে নির্মিত।
পুরস্কার তুলে দেওয়ার আগে ছবিটির প্রযোজক স্টিভেন স্পিলবার্গ বলেন, ‘এই গল্প বলার জন্য পৃথিবীতে একজনই নির্মাতা ছিলেন, তিনি ক্লোয়ি ঝাও।’ মঞ্চে উঠে চীনা বংশোদ্ভূত পরিচালক ক্লোয়ি বলেন, ‘এই পুরস্কার তাঁদের জন্য, যাঁরা এই ছবি বানানোর সময় নিজেদের প্রিয় মানুষকে হারিয়েছেন।’ ছবিতে অভিনয় জন্য ড্রামা বিভাগে সেরা অভিনেত্রী হয়েছেন জেসি বাকলি। এই বিভাগের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী জেনিফার লরেন্স, রেনাতে রেইনসভে, জুলিয়া রবার্টসকে হারিয়ে শ্যালামের মতো ক্রিটিকস চয়েজের পর গোল্ডেন গ্লোবেও বাজিমাত করলেন তিনি।
মোরার ইতিহাস
এবার সেরা বিদেশি ভাষার সিনেমা হয়েছে ব্রাজিলের ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’, ছবির অভিনেতা ওয়াগনার মোরা হয়েছেন ড্রামা বিভাগে সেরা অভিনেতা। এই বিভাগে পুরস্কার জেতা প্রথম ব্রাজিলিয়ান অভিনেতা তিনি। পুরস্কার গ্রহণ করে মোরা বলেন, ‘এই সিনেমা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে চলা ট্রমার গল্প বলে। আমি মনে করি, যদি ট্রমা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়ায়, তাহলে মূল্যবোধও ছড়াতে পারে। তাই এই সিনেমা তাঁদের জন্য, যাঁরা কঠিন মুহূর্তেও নিজের মূল্যবোধে অটল থাকেন।’
মোরা এর আগে ‘নার্কোস’-এর জন্য ড্রামা বিভাগে সেরা অভিনেতার মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ক্লেবের মেন্ডোঁসা ফিলহো পরিচালিত ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’ ১৯৭৭ সালের প্রেক্ষাপটে নির্মিত; যেখানে ব্রাজিলের স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প উঠে এসেছে।
আবারও কুপার
গত বছরের মার্চে নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর সারা দুনিয়ায় হইচই ফেলে দেয় ব্রিটিশ মিনি সিরিজ ‘অ্যাডোলেসেন্স’। সিরিজটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে আলোচনায় আসে ব্রিটিশ অভিনেতা ওয়েন কুপার। গত বছর মাত্র ১৫ বছর বয়সে এমিতে পুরস্কার জিতে রেকর্ড গড়েছিল কুপার। গোল্ডেন গ্লোবেও পার্শ্বচরিত্রে সর্বকনিষ্ঠ পুরুষ অভিনেতা হিসেবে পুরস্কার জয়ের রেকর্ড গড়েছে।
এর আগে এই বিভাগে রেকর্ডটি ছিল ক্রিস কলফারের। ২০১০ সালে গ্লির জন্য ২০ বছর বয়সে পুরস্কার জিতেছিলেন তিনি। পুরস্কার গ্রহণ করে কুপার বলে, ‘গোল্ডেন গ্লোবে দাঁড়িয়ে থাকা একেবারেই বাস্তব লাগছে না। আমার এবং আমার পরিবারের জন্য এটি এক অসাধারণ যাত্রা।’
যত চমক
এবার সবচেয়ে বড় চমক ইঙ্গা ইবসডটার লিলেয়াস (‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’) ও অ্যামি ম্যাডিগানকে (‘ওয়েপনস’) পেছনে ফেলে তিয়ানা টেইলরের পুরস্কার জয়। অস্কার আইজ্যাক, ডোয়াইন জনসন আর মাইকেল বি জর্ডানদের হারিয়ে ওয়াগনার মোরার জয়ও কম চমকপ্রদ ছিল না। অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন ‘সিনার্স’-এর জন্য সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার জিতবেন রায়ান কুগলার, সেটাও হয়নি। চমক আছে টেলিভিশন বিভাগেও। ‘অল হার ফল্ট’-এর জন্য সারা স্নুক নন, বরং ‘ডায়িং ফর সেক্স’-এর জন্য লিমিটেড সিরিজ বিভাগে সেরা অভিনেতা হয়েছেন মিশেল উইলিয়ামস।
রাজনৈতিক বার্তা
কিছুদিন আগেই মিনিয়াপোলিসের পোর্টল্যান্ড অ্যাভিনিউয়ে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) কর্মকর্তার গুলিতে নিহত হন রেনে ম্যাকলিন গুড নামের এক সাধারণ নাগরিক। সেই ঘটনার প্রতিবাদে লালগালিচায় অনেক তারকাকেই এবার ‘বি গুড’ ও ‘আইস আউট’ লেখা ব্যাজ পরতে দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে চলমান প্রতিবাদের প্রতি এই ব্যাজে সংহতি জানান মার্ক রাফালো, নাতাশা লিওন, ওয়ান্ডা সাইকসসহ একাধিক তারকা। টানা দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন গ্লোব সঞ্চালনা করেন নিকি গ্লেজার। তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে সমসাময়িক রাজনীতি ও হলিউডের আত্মমগ্নতা নিয়ে রসিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
একনজরে
চলচ্চিত্র
সেরা চলচ্চিত্র (মিউজিক্যাল ও কমেডি)
‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’
সেরা চলচ্চিত্র (ড্রামা)
‘হ্যামনেট’
সেরা অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র
‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’
সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র
‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’, ব্রাজিল
সেরা অভিনেতা (মিউজিক্যাল ও কমেডি)
টিমোথি শ্যালামে, ‘মার্টি সুপ্রিম’
সেরা অভিনেত্রী (মিউজিক্যাল ও কমেডি)
রোজ বার্ন, ‘ইফ আই হ্যাড লেগস আই উড কিক ইউ’
সেরা অভিনেতা (ড্রামা)
ওয়াগনার মোরা, ‘দ্য সিক্রেট এজেন্ট’
সেরা অভিনেত্রী (ড্রামা)
জেসি বাকলি, ‘হ্যামনেট’
সেরা পরিচালক ও সেরা চিত্রনাট্য (চলচ্চিত্র)
পল টমাস অ্যান্ডারসন, ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’
সেরা পার্শ্ব অভিনেতা (চলচ্চিত্র)
স্টেলান স্কারসগার্ড, সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’
সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী (চলচ্চিত্র)
তিয়ানা টেইলর, ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’
সেরা মৌলিক গান (চলচ্চিত্র)
‘গোল্ডেন’, ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’
টেলিভিশন
সেরা সিরিজ (ড্রামা)
‘দ্য পিট’
সেরা সিরিজ (মিউজিক্যাল ও কমেডি)
‘দ্য স্টুডিও’
সেরা অভিনেতা (ড্রামা)
নোয়া ওয়াইলি, ‘দ্য পিট’
সেরা অভিনেত্রী (ড্রামা)
রিয়া সিহর্ন, ‘প্লুরিবাস’
সেরা অভিনেতা (মিউজিক্যাল ও কমেডি)
শেথ রোগান, ‘দ্য স্টুডিও’
সেরা অভিনেত্রী (মিউজিক্যাল ও কমেডি)
জিন স্মার্ট, ‘হ্যাকস’
সেরা লিমিটেড সিরিজ/অ্যানথোলজি সিরিজ/টেলিছবি
‘অ্যাডোলেসেন্স’
এএফপি ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে