শরীর নিয়ে কটাক্ষ, সেটিই হয়ে উঠল সাফল্যের শক্তি, এখন ১ হাজার কোটি টাকার মালিক
আজ ৫৬ বছরে পা দিচ্ছেন হলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেত্রী, কৌতুকশিল্পী, লেখক ও প্রযোজক মেলিসা ম্যাকার্থি। তবে মেলিসা ম্যাকার্থির গল্প শুধু হাসির নয়। এর ভেতরে আছে প্রত্যাখ্যান, শরীর নিয়ে কটাক্ষ, সৌন্দর্যের হলিউডি মাপকাঠির সঙ্গে লড়াই, অর্থকষ্ট ও দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া সাফল্য। যে শরীরকে একসময় তাঁর ক্যারিয়ারে ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখা হতো, শেষ পর্যন্ত সেই শরীর নিয়েই তিনি হয়ে উঠেছেন হলিউডের অন্যতম সফল নারী কমেডিয়ান।
অল্প টাকায় শুরু
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ের একটি কর্ন ও সয়াবিনের খামারে বড় হয়েছেন মেলিসা অ্যান ম্যাকার্থি। পরিবারের আর্থিক অবস্থা এমন ছিল না যে ছোটবেলা থেকেই হলিউডের স্বপ্ন নিয়ে নিশ্চিন্তে এগোতে পারবেন। তাঁর বাবা-মা তাঁকে ১২ বছর ক্যাথলিক স্কুলে পড়িয়েছেন। মেলিসার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারে প্রয়োজন ও চাহিদার পার্থক্যটা খুব ভালোভাবেই শেখানো হয়েছিল।
২০ বছর বয়সে নিউইয়র্কে পাড়ি জমান মেলিসা অ্যান ম্যাকার্থি। অভিনয়ের পাশাপাশি স্ট্যান্ডআপ কমেডি শুরু করেন। তখন তাঁর হাতে অর্থ বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, নিউইয়র্কে যাওয়ার সময় তাঁর ব্যাংক হিসাবে ছিল পাঁচ ডলারের কম। অন্য এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বন্ধুর ডাকে নিউইয়র্কে গিয়ে মাত্র ৪৫ ডলার নিয়ে স্ট্যান্ডআপে উঠে পড়েছিলেন।
অভিনয়ের সুযোগ তখনো দূরের কথা। জীবন চালাতে তাঁকে নানা কাজ করতে হয়েছে। নিউইয়র্কে বেবিসিটার ও ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করেছেন। পরে লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে বিখ্যাত ইম্প্রোভাইজেশন ও স্কেচ কমেডি দল ‘দ্য গ্রাউন্ডলিংস’-এ যোগ দেন। প্রায় ৯ বছর সেখানে নিয়মিত অভিনয় করেন।
হলিউডে তাঁর প্রথম দিকের দিনগুলো ছিল ছোট ছোট চরিত্র আর অডিশনে ভরা। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে টেলিভিশনে কাজ শুরু করেন। কিন্তু বড় তারকা হতে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও এক দশকের বেশি।
‘গিলমোর গার্লস’ থেকে পরিচিতি
২০০০ সালে শুরু হওয়া ‘গিলমোর গার্লস’ সিরিজে সুকি সেন্ট জেমস চরিত্রে অভিনয় করে প্রথম পরিচিতি পান মেলিসা। ২০০০ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সিরিজটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পরে সামান্থা হু-তেও অভিনয় করেন।
কিন্তু তখনো তাঁকে হলিউডের ‘হিরোইন’ হিসেবে ভাবা হতো না। তাঁর চেহারা ও ওজন নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য ছিল নিয়মিত। বিশেষ করে কমেডি চরিত্রে তাঁকে প্রায়ই এমনভাবে ব্যবহার করা হতো, যেখানে তাঁর শরীরকেই হাসির উপাদান বানানো হতো।
মেলিসা অবশ্য শুরু থেকেই এই ধরনের চরিত্র নিয়ে সতর্ক ছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, কোনো চরিত্র শুধু ‘প্লাস-সাইজ নারী’ হিসেবে লেখা হলে তিনি তাতে আগ্রহী নন। তাঁর কাছে চরিত্রের ব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ, শরীর নয়।
৪০ পেরিয়ে বদলে গেল সব
২০১০ সালে ‘মাইক অ্যান্ড মিকি’ সিরিজে মলি ফ্লিনের চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন মেলিসা। চরিত্রটি তাঁকে এনে দেয় প্রাইমটাইম এমি পুরস্কার। কিন্তু তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০১১ সালে। পল ফিগ পরিচালিত ‘ব্রাইডসমেইডস’-এ মেগান চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের তাক লাগিয়ে দেন তিনি। ক্রিস্টেন উইগ, মায়া রুডলফ, রোজ বার্নদের মতো অভিনেত্রীদের পাশে থেকেও অনেক দৃশ্যে মেলিসাই হয়ে ওঠেন সিনেমার মূল আকর্ষণ। ছবিটির জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পান।
তখন মেলিসার বয়স ৪০। অর্থাৎ হলিউডের প্রচলিত নিয়মে যে বয়সে অনেক নারী অভিনেত্রীর ক্যারিয়ার সংকুচিত হতে শুরু করে, সেই বয়সেই তাঁর ক্যারিয়ার বিস্ফোরণের মতো বড় হয়ে যায়। একে একে আসে আইডেনটিটি থিফ, দ্য হিট, স্পাই, দ্য বস, লাইফ অব দ্য পার্টিসহ বেশ কিছু ছবি। স্পাই-তে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের প্রশংসা পায়, এনে দেয় গোল্ডেন গ্লোব মনোনয়ন।
শরীর নিয়ে যে বিতর্ক থামেনি
মেলিসার সাফল্য যত বেড়েছে, তাঁর শরীর নিয়ে বিতর্কও ততই প্রকাশ্যে এসেছে।
২০১৩ সালে আইডেনটিটি থিফ ছবির রিভিউ লিখতে গিয়ে চলচ্চিত্র সমালোচক রেক্স রিড মেলিসার শরীর নিয়ে অত্যন্ত অপমানজনক ভাষা ব্যবহার করেন। বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। ঘটনাটি এতটাই আলোচিত হয়েছিল যে হলিউডের অনেকেই মেলিসার পক্ষে দাঁড়ান। মজার ব্যাপার হলো, ছবিটি সেই সপ্তাহান্তে বক্স অফিসে প্রায় ৩৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষে উঠে আসে। অর্থাৎ সমালোচকের আক্রমণ তাঁর দর্শকপ্রিয়তায় কোনো ধাক্কা দিতে পারেনি।
মেলিসার প্রতিক্রিয়াও ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি পাল্টা গালাগালি করেননি। বরং বলেছিলেন, এমন ঘৃণা নিয়ে যে মানুষ বেঁচে আছেন, তাঁর জন্যই তাঁর খারাপ লাগছে। পরে তিনি জানান, বয়স ২০-এর দিকে হলে এমন লেখা হয়তো তাঁকে ভেঙে দিতে পারত।
শুধু পর্দায় নয়, বাস্তবেও ‘বুলিং’
মেলিসার কাছে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অপমান নয়। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এসব মন্তব্য সমাজে বিশেষ করে শিশু ও কিশোরীদের শরীর নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি করে।
২০১৫ সালে নিজের পোশাকের ব্র্যান্ড নিয়ে কথা বলার সময় মেলিসা বলেন, বুলিং শিশুদের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। তাঁর দুই মেয়ের কথা উল্লেখ করে মেলিসা বলেন, দেখতে হাস্যকর এমন কোনো মন্তব্যও বারবার শুনতে শুনতে মানুষের আত্মবিশ্বাস ক্ষয়ে যেতে পারে।
এ জায়গাতেই মেলিসার লড়াইটি ব্যক্তিগত সাফল্যের বাইরে চলে যায়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, একজন পুরুষ অভিনেতা মোটা হলে তাঁর অভিনয়ের বদলে শরীর নিয়ে এত আলোচনা কেন হয় না?
অস্কারের পোশাকও হয়ে উঠেছিল বিতর্কের বিষয়
অস্কারের জন্য পোশাক বানাতে কয়েকজন নামী ডিজাইনারের কাছে গিয়েও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন মেলিসা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ-ছয়জন উচ্চপর্যায়ের ডিজাইনার তাঁকে পোশাক দিতে রাজি হননি।
তবে এই দাবি নিয়েও পরে বিতর্ক হয়। দ্য র্যাপ জানায়, অন্তত একজন ডিজাইনার মেলিসাকে পোশাক দিতে আগ্রহী ছিলেন। ফলে ঘটনাটি নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও তৈরি হয়।
তারপর নিজের পথ নিজেই তৈরি করেন মেলিসা। ২০১৫ সালে চালু করেন ‘মেলিসা ম্যাকার্থি সেভেন’ নামের পোশাকের ব্র্যান্ড। চার থেকে ২৮ সাইজ পর্যন্ত পোশাক রাখার উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি বড় শরীরের নারীদের জন্য ফ্যাশনকে আরও সহজলভ্য করার চেষ্টা করেন। যদিও ব্র্যান্ডটি পরে বন্ধ হয়ে যায়।
নিজের শরীর নিয়ে তাঁর দর্শন
মেলিসা কখনোই নিজেকে ‘ওজন কমানোর গল্প’ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করতে চাননি। বরং বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, শরীর নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করার মতো সময় তাঁর নেই।
২০-এর দশকে অবশ্য বিষয়টি তাঁকে কষ্ট দিত। এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্মরণ করেছেন, তখন আরও পাতলা ও সুন্দর না হওয়ার জন্য কাঁদতেন। পরে সেই সময়কে জীবনের ‘এক দশকের কান্না’ হিসেবে দেখেছেন।
পরবর্তী সময়ে মেলিসার ওজন কমা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নানা আলোচনা হয়েছে। তবে মেলিসা বারবার জোর দিয়েছেন স্বাস্থ্য, স্বস্তি ও নিজের প্রতি গ্রহণযোগ্যতার ওপর; কোনো নির্দিষ্ট ‘আদর্শ’ শরীরের ওপর নয়।
শুধু কমেডিয়ান নন, সিরিয়াস অভিনেত্রীও
মেলিসাকে শুধু হাসির অভিনেত্রী হিসেবে দেখলে তাঁর ক্যারিয়ারের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়।
২০১৮ সালের ‘ক্যান ইউ এভার ফরগিভ মি’ ছবিতে লেখিকা লি ইসরায়েলের চরিত্রে অভিনয় করে দ্বিতীয়বার অস্কার মনোনয়ন পান—এবার সেরা অভিনেত্রী বিভাগে। ‘ব্রাইডসমেইডস’-এর পর যে অভিনেত্রীকে অনেকে শুধু শারীরিক কমেডির জন্য দেখতে চেয়েছিলেন, সেই মেলিসাই পরে প্রমাণ করেন, নাটকীয় চরিত্রেও তিনি সমান শক্তিশালী।
২০২০ সালে নিউইয়র্ক টাইমস তাঁকে একবিংশ শতাব্দীর ২৫ জন সেরা অভিনেতার তালিকায় ২২ নম্বরে রাখে।
এদিকে ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’-এ একাধিক উপস্থিতিও মেলিসাকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে আরও জনপ্রিয় করে। বিশেষ করে সাবেক হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারি শন স্পাইসারের ব্যঙ্গাত্মক চরিত্রায়ণ ব্যাপক আলোচিত হয়। ২০১৭ সালে এই কাজের জন্য তিনি এমি জেতেন।
২০১৬ সালে তিনি হলিউড ওয়াক অব ফেমে জায়গা পান। একই বছর এমটিভি মুভি অ্যাওয়ার্ডসে কমেডিক জিনিয়াস পুরস্কার পাওয়া প্রথম নারী হন তিনি।
কত টাকার মালিক মেলিসা
একসময় ব্যাংক হিসাবে কয়েক ডলার নিয়ে নিউইয়র্কে যাত্রা শুরু করা মেলিসা ম্যাকার্থির বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ৯ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। এটি আনুমানিক হিসাব; সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ ব্যক্তিগত বিনিয়োগ, সম্পত্তি, কর ও অন্যান্য আর্থিক বিষয়ের কারণে কমবেশি হতে পারে।
শুধু অভিনয় নয়; প্রযোজনা, টেলিভিশন, সিনেমা ও ফ্যাশন ব্যবসা—বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে এসেছে মেলিসার আয়। ২০১৫ সালে ফোর্বস তাঁকে হলিউডের তৃতীয় সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল; ওই বছর তাঁর আয় ছিল প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অন্য হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে তাঁর মোট আয় আরও বেশি ছিল।
স্বামীও সহযোদ্ধা
মেলিসার ব্যক্তিগত জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তাঁর স্বামী বেন ফ্যালকোন। দুজনের পরিচয় ‘দ্য গ্রাউন্ডলিংস’-এর সঙ্গে কাজ করার সময়। ২০০৫ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের দুই মেয়ে—ভিভিয়ান ও জর্জেট।
ফ্যালকোন শুধু জীবনসঙ্গী নন, মেলিসার পেশাগত সহযোগীও। একাধিক প্রকল্পে একসঙ্গে কাজ করেছেন তাঁরা। তাঁদের সম্পর্কের এই সহযোগিতাও মেলিসার ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আইএমডিবি, ভোগ ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে