৩৬ বছর বয়সে চলে গেলেন জনপ্রিয় তারকা
‘হিরোজ’, ‘ন্যাশভিল’ এবং ‘স্ক্রিম ৪’ ও ‘স্ক্রিম ৬’ সিনেমায় অভিনয় করে পরিচিতি পাওয়া মার্কিন অভিনেত্রী হেইডেন প্যানেতিয়ের মারা গেছেন। রোববার তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর প্রতিনিধি এবিসি নিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
হেইডেনের প্রতিনিধির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অত্যন্ত গভীর দুঃখের সঙ্গে আমরা আমাদের প্রিয় হেইডেনের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর জানাচ্ছি। তিনি ছিলেন অসাধারণ এক আলোকবর্তিকা, ছিলেন প্রবল প্রাণশক্তির অধিকারী। যাঁরা তাঁকে চিনতেন, তাঁদের এবং পর্দায় যাঁরা তাঁকে দেখেছেন, সেই কোটি মানুষের জীবনে তিনি অপরিসীম ভালোবাসা ও আনন্দ ছড়িয়ে দিয়েছেন।’
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে অভিনয়ে অভিষেক হয়েছিল হেইডেনের। ১৯৯৪ সালে ‘ওয়ান লাইফ টু লাইভ’ ধারাবাহিকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর পথচলা। ধারাবাহিকটির ২৭টি পর্বে দেখা গেছে তাঁকে। পরে ‘গাইডিং লাইট’-এ অভিনয় করেন ৪৫টি পর্বে।
২০০০ সালে ‘রিমেম্বার দ্য টাইটানস’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় পরিচিতি বাড়ে হেইডেনের। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০০৬ সালে। সে বছর এনবিসির জনপ্রিয় সিরিজ ‘হিরোজ’-এ ক্লেয়ার বেনেট চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন তিনি। চিয়ারলিডার ক্লেয়ার চরিত্রটি তাঁকে রাতারাতি পরিচিত করে তোলে। সিরিজটির ৭৩টি পর্বে অভিনয় করেছেন হেইডেন।
এরপর ২০১২ সালে ‘ন্যাশভিল’ সিরিজে জুলিয়েট বার্নস চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন হেইডেন। এ চরিত্রের জন্য তিনি গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কারের জন্য দুবার মনোনয়ন পান। ২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সিরিজটির ১২৮টি পর্বে অভিনয় করেছেন তিনি।
চলচ্চিত্রে হেইডেন সবচেয়ে বেশি আলোচিত হন ‘স্ক্রিম ৪’-এ কিরবি চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। ২০১১ সালের এ সিনেমায় তাঁর অভিনীত কিরবি দর্শকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রায় এক যুগ পর ২০২৩ সালের ‘স্ক্রিম ৬’-এ একই চরিত্রে আবার পর্দায় ফেরেন তিনি। এ ছাড়া ‘আইস প্রিন্সেস’ সিনেমায় মিশেল ট্র্যাখটেনবার্গের সঙ্গে অভিনয় করেন। ‘ব্রিং ইট অন: অল অর নাথিং’ সিনেমাতেও দেখা গেছে তাঁকে।
নিউইয়র্কের পালিসেডেসে বেড়ে উঠেছেন হেইডেন। তাঁর মা ছিলেন সোপ অপেরার অভিনেত্রী এবং বাবা ছিলেন ফায়ার ক্যাপ্টেন। ছোটবেলায় ‘অ্যালি ম্যাকবিল’ ও ‘ম্যালকম ইন দ্য মিডল’-এর মতো জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানেও অভিনয় করেছেন তিনি।
চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত হয়েছে হেইডেনের প্রথম বই ‘দিস ইজ মি: আ রেকনিং’। আত্মজীবনীমূলক বইটিতে আলোয় থাকা জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি। মায়ের সঙ্গে তাঁর জটিল সম্পর্ক এবং হলিউডে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথাও লিখেছেন বইটিতে।
ব্যক্তিজীবনের নানা সংকট নিয়েও প্রকাশ্যে কথা বলেছেন হেইডেন। দীর্ঘদিন অ্যালকোহল ও মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই করেছেন তিনি। ২০২০ সালে পুনর্বাসনকেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়ার পর মাদক ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকার জীবন শুরু করেন।
২০২৩ সালে হঠাৎ মারা যান হেইডেনের ছোট ভাই জ্যানসেন প্যানেতিয়ের। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় মাত্র ২৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। ভাইয়ের মৃত্যুর পর ২০২৪ সালে ‘পিপল’ ম্যাগাজিনকে হেইডেন বলেছিলেন, জীবনে এত বড় একটি ঘটনা ঘটে গেলে মানুষ বুঝতে শেখে, কোন বিষয়গুলো নিয়ে লড়াই করা দরকার আর কোন বিষয়গুলো নিয়ে মন খারাপ না করলেও চলে।
তবে ওই সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর হেইডেনের কথার ধরন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অনেকে। তাঁর কথাবার্তা কিছুটা জড়িয়ে যাচ্ছিল বলে মন্তব্য করেছিলেন ভক্তদের কেউ কেউ। পরে ইনস্টাগ্রাম পোস্টে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন অভিনেত্রী।
হেইডেন জানান, সাক্ষাৎকারের শুটিংয়ের আগে টানা দুই দিন ঘুমাতে পারেননি। তাঁর একটি কুকুর জরুরি অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে উঠছিল। এ কারণে তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত ছিলেন। সাক্ষাৎকারের বিষয়বস্তু যখন আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে, তখন তাঁর প্রতিনিধি বুঝতে পারেন যে তিনি আর স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছেন না এবং সাক্ষাৎকারটি দ্রুত শেষ করে দেন।
ওই সময় ওষুধ সেবন নিয়ে ওঠা নানা মন্তব্যেরও জবাব দিয়েছিলেন হেইডেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি কোনো ওষুধ সেবন করছেন কি না, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত বিষয় এবং তাঁর চিকিৎসকের সঙ্গে তাঁর ব্যাপার। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব নিয়েও কথা বলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য ছিল, কম্পিউটারের পর্দার আড়াল থেকে বলা কথারও একজন মানুষের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এ বিষয়টি সবার বোঝা উচিত।
হেইডেনের একটি মেয়ে আছে, নাম কায়া। সাবেক বক্সার ভ্লাদিমির ক্লিৎসকোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল হেইডেনের। তখন ভ্লাদিমিরের ঔরসে কায়ার জন্ম হয়। হেইডেনের মাদকাসক্তি ও প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতার সময় কায়ার দেখভালের দায়িত্ব বাবার কাছে ছিল।
শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে থেমে গেল হেইডেন প্যানতিয়েরের জীবন। ‘হিরোজ’-এর ক্লেয়ার বেনেট কিংবা ‘স্ক্রিম’-এর কিরবি—দুটি চরিত্রের জন্যই টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের দর্শকদের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তিনি।
ভ্যারাইটি অবলম্বনে