ক্লিন্ট ইস্টউডের অবসর, থামল সাত দশকের অবিশ্বাস্য যাত্রা

বিভিন্ন সিনেমার দৃশ্যে ক্লিন্ট ইস্টউড। কোলাজ

সাত দশকের বেশি সময় ধরে অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক ও গল্পকার হিসেবে দর্শকদের মুগ্ধ করে অবশেষে থামলেন তিনি। ৯৬ বছর বয়সে এসে অবসর নিলেন ক্লিন্ট ইস্টউড। থামল এক অবিশ্বাস্য যাত্রা, যা শুধু হলিউড নয়, বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসেই বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। সম্প্রতি তাঁর ছেলে কাইল ইস্টউড নিশ্চিত করেছেন, ক্লিন্ট ইস্টউড আর নতুন কোনো সিনেমা পরিচালনা বা অভিনয় করবেন না। খবরটি প্রকাশের পর চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে একধরনের আবেগঘন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কারণ, অনেকের কাছেই মনে হতো, ইস্টউড যেন কখনোই থামবেন না।

মহামন্দার সময় জন্ম, সংগ্রামের মধ্যেই বেড়ে ওঠা
১৯৩০ সালের ৩১ মে, যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো শহরে জন্ম ক্লিন্টন ইস্টউড জুনিয়রের। তাঁর জন্ম হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র মহামন্দার ধাক্কা সামলাতে ব্যস্ত। বাবার চাকরির কারণে পরিবারকে বারবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই জীবনের অনিশ্চয়তা দেখেছেন তিনি। কৈশোরে কখনো কাঠ কাটার কাজ করেছেন, কখনো গ্যাস স্টেশনে চাকরি, কখনো আবার লাইফগার্ড হিসেবে কাজ করেছেন।
পরবর্তীকালে সেনাবাহিনীতেও দায়িত্ব পালন করেন। তখনো কেউ জানত না, এই লম্বা, চুপচাপ তরুণ একদিন সিনেমার ইতিহাস বদলে দেবেন।

দ্য গুড, দ্য ব্যাড অ্যান্ড দ্য আগলি’ সিনেমায় ক্লিন্ট ইস্টউড। আইএমডিবি

ভাগ্য বদলে দেয় একটি টিভি সিরিজ
হলিউডে তাঁর শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ১৯৫০-এর দশকে বেশ কিছু ছোট চরিত্রে অভিনয় করলেও সেভাবে নজরে আসেননি। পরিস্থিতি বদলায় ১৯৫৯ সালে। টেলিভিশন সিরিজ ‘রহাইড’-এ কাউবয় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। সেই সিরিজ তাঁকে পরিচিতি দিলেও বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেন ইতালীয় পরিচালক সার্জিও লিওনি।

‘ম্যান উইথ নো নেম’: সিনেমার নতুন নায়ক
ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে লিওনির বিখ্যাত ‘ডলারস ট্রিলজি’-তে অভিনয় করেন ইস্টউড—‘আ ফিস্টফুল অব ডলারস’, ‘ফর আ ফিউ ডলারস মোর’ও ‘দ্য গুড, দ্য ব্যাড অ্যান্ড দ্য আগলি’। এই তিনটি সিনেমা শুধু তাঁর ক্যারিয়ারই বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রের ভাষাও। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, মুখে অল্প সংলাপ, হাতে রিভলবার—এই চরিত্রকে দর্শক নাম দিয়েছিল ‘ম্যান উইথ নো নেম’।

তখনকার চকচকে নায়কদের ভিড়ে ইস্টউড ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, নায়ক হতে গেলে সব সময় বেশি কথা বলার প্রয়োজন নেই।

‘ডার্টি হ্যারি’: এক সাংস্কৃতিক আইকনের জন্ম
সত্তরের দশকে ইস্টউড আরেকটি চরিত্রের মাধ্যমে জনপ্রিয়তার নতুন উচ্চতায় পৌঁছান—‘ডার্টি হ্যারি’। সান ফ্রান্সিসকোর কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা হ্যারি ক্যালাহান চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। ‘গো অ্যাহেড, মেক মাই ডে’—এই সংলাপ আজও সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত উক্তি। ডার্টি হ্যারির মাধ্যমে ইস্টউড শুধু অভিনেতা নন, মার্কিন জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠেন।

ক্যামেরার পেছনে আরেক কিংবদন্তি
অনেক অভিনেতা পরিচালনায় আসেন, কিন্তু খুব কম মানুষই দুই ভূমিকাতেই সমান সফল হন। ১৯৭১ সালে ‘প্লে মিস্টি ফর মি’ দিয়ে পরিচালনায় অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর ধীরে ধীরে তিনি প্রমাণ করেন, অভিনেতা হিসেবে যতটা শক্তিশালী, পরিচালক হিসেবেও ততটাই অসাধারণ। ওয়েস্টার্ন, যুদ্ধ, থ্রিলার, জীবনী, প্রেম, সংগীত—সব ধরনের গল্প নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের তালিকায় রয়েছে—‘আনফরগিভেন’, ‘মিস্ট্রিক রিভার’, ‘মিলিয়ন ডলার বেবি’, ‘চ্যালেঞ্জিং’, ‘আমেরিকান স্নাইপার’, ‘সলি’, ‘দ্য মোল’ ইত্যাদি।

সিনেমার দৃশ্যে ক্লিন্ট ইস্টউড। আইএমডিবি

অস্কারের মঞ্চে অনন্য সাফল্য
ইস্টউডের অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। ‘আনফরগিভেন’ ও ‘মিলিয়ন ডলার বেবি’—দুটি ছবির জন্য তিনি সেরা পরিচালক ও সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জেতেন। চারটি অস্কার ছাড়াও তিনি বহুবার মনোনয়ন পেয়েছেন। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তাঁর পরিচালনায় পাঁচজন অভিনেতা অভিনয়ের জন্য অস্কার জিতেছেন—জিন হ্যাকম্যান, শন পেন, টিম রবিনস, হিলারি সোয়াঙ্ক ও মর্গান ফ্রিম্যান।

সেটে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা
হলিউডে ক্লিন্ট ইস্টউডের খ্যাতি ছিল তাঁর অনন্য কাজের ধরন নিয়ে। যেখানে অনেক পরিচালক একটি দৃশ্যের জন্য বারবার শুটিং করতেন, সেখানে ইস্টউড সাধারণত এক বা দুই টেকেই সন্তুষ্ট থাকতেন। তিনি উচ্চ স্বরে ‘অ্যাকশন’ বা ‘কাট’ বলতেন না। শুটিং সেটে চিৎকার-চেঁচামেচি তাঁর একেবারেই পছন্দ ছিল না। অভিনেতারা বলতেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করলে ভয় নয়; বরং স্বস্তি পাওয়া যেত।
মর্গান ফ্রিম্যান একবার ইস্টউডকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় পরিচালক বলে উল্লেখ করেছিলেন। আর মেরিল স্ট্রিপ বলেছিলেন, ইস্টউড সব সময় অভিনেতাদের সম্মান দিতেন।

আরও পড়ুন

ব্যক্তিগত জীবনের জটিল অধ্যায়
পর্দার বাইরে ইস্টউডের জীবনও কম ঘটনাবহুল ছিল না। তাঁর একাধিক সম্পর্ক নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা হয়েছে। দুবার বিয়ে করেছেন তিনি। বিভিন্ন সম্পর্ক থেকে তাঁর কয়েকজন সন্তান রয়েছে, যাঁদের মধ্যে অনেকেই বিনোদনজগতে কাজ করছেন। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও ইস্টউড খুব কমই প্রকাশ্যে এসব বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বরাবরই বিশ্বাস করতেন, একজন শিল্পীর পরিচয় তাঁর কাজেই নিহিত।

সিনেমার দৃশ্যে ক্লিন্ট ইস্টউড। আইএমডিবি

নব্বই পেরিয়েও অবিশ্বাস্য কর্মস্পৃহা
৯০ বছর বয়সের পরও নিয়মিত সিনেমা নির্মাণ করেছেন ইস্টউড। ২০২১ সালে ‘ক্রাই মাচো’-তে শেষবার অভিনয় করেন তিনি। আর ২০২৪ সালে ‘জুনিয়র নাম্বার ২’ পরিচালনার মাধ্যমে কার্যত নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় লেখেন। অনেকে ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো ১০০ বছর বয়স পর্যন্তও সিনেমা বানাবেন। কিন্তু ৯৬ বছরে এসে থামার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

ইনডিপেনডেন্ট অবলম্বনে