১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। প্রচারে ব্যস্ত সময় ব্যয় করছেন প্রার্থীরা। নির্বাচনের এই চূড়ান্ত মুহূর্তের উত্তেজনার মধ্যে চলুন দেখে নেওয়া যাক বিবিসির চোখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও নির্বাচনী রাজনীতি নিয়ে নির্মিত সেরা ১০ সিনেমা।
ক্রিস রকের এই কমেডি সিনেমাটি একটু হালকা মেজাজের হলেও এর বার্তা গভীর। সিনেমায় দেখা যায়, একজন সাধারণ রাজনৈতিক নেতা অপ্রত্যাশিতভাবে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন। তিনি যখন মুখের ওপর সপাটে সত্য কথা বলে জনমত নিজের পক্ষে নিয়ে আসেন, তখন রাজনীতির রথী/মহারথীরাও ভয় পেয়ে যান। সিনেমার মূল প্রশ্ন হলো—একজন সত্যনিষ্ঠ, সাধারণ মানুষ কি সত্যিকারের ক্ষমতার খেলায় জিততে পারে? ‘হেড অব স্টেট’ হাস্যরসের মাধ্যমে দেখায়, কখনো কখনো সরলতা এবং সততা বড় পরিসরের রাজনীতিকে বদলে দিতে পারে। ছবিতে অভিনয় করেছেন ক্রিস রক, বার্নি ম্যাক।
২০০৮ সালের মার্কিন নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী জন ম্যাককেইন হঠাৎ এক চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আলাস্কার গভর্নর সারাহ পেলিনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বেছে নেন। দলের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি ‘গেম চেঞ্জিং’ পদক্ষেপ দেখানো, কিন্তু পেলিন ছিলেন পুরোপুরি অপ্রস্তুত। পররাষ্ট্রনীতি, মিডিয়ার চাপ বা জনমতের জটিলতা—সবকিছুতে তিনি ছিলেন অনভিজ্ঞ।
জে রোচ পরিচালিত এ সিনেমার গল্পটি দেখায়, নির্বাচনী কৌশল সব সময় কাজ করে না। কখনো কখনো দলের হঠাৎ সিদ্ধান্ত, অপ্রস্তুত প্রার্থী ও মিডিয়ার চাপ একসঙ্গে মিশে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। তবে সিনেমাটি শুধু হাস্যরস নয়, রাজনীতির জটিলতা, ভুল সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতার খেলার বাস্তব ছবিও তুলে ধরে।
এটি তিনটি গোল্ডেন গ্লোব এবং পাঁচটি এমি অ্যাওয়ার্ড জিতেছিল। বিশেষ করে সারা প্যালিনের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য জুলিয়ান মুর সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান।
স্বপ্নবাজ তরুণেরা যখন রাজনীতিতে আসেন, তখন তাঁরা কীভাবে সিস্টেমের ঘুণপোকাদের কবলে পড়ে, সেটিই এই সিনেমার উপজীব্য। রায়ান গোসলিংয়ের অভিনয় আপনাকে মনে করিয়ে দেবে, ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত কেউই ধোয়া তুলসী পাতা নয়। ক্ষমতার নেশা কীভাবে আদর্শকে গিলে খায়, জর্জ ক্লুনি পরিচালিত এ সিনেমায় তা উঠে এসেছে।
সিনেমার গল্প আবর্তিত হয় স্টিফেন মেয়ার্স (রায়ান গোসলিং) নামের এক তরুণ ও প্রতিভাবান ‘ক্যাম্পেইন ম্যানেজার’কে ঘিরে। সে গভর্নর মাইক মরিস (জর্জ ক্লুনি) নামের একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান সহকারী হিসেবে কাজ করেন। স্টিফেন বিশ্বাস করেন, মরিস একজন সৎ মানুষ এবং তিনি ক্ষমতায় গেলে দেশ বদলে যাবে। কিন্তু ভোটের লড়াই যত ঘনিয়ে আসে, স্টিফেন বুঝতে পারে রাজনীতির জগৎটা আসলে বাইরে থেকে যতটা উজ্জ্বল দেখায়, ভেতরে ততটাই অন্ধকার।
রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত জীবন কি জনমতের ওপর প্রভাব ফেলা উচিত? অ্যারন সোরকিনের চিত্রনাট্যে এই সিনেমায় রোমান্স আর আদর্শিক রাজনীতির এক দারুণ মিশেল পাওয়া যায়। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু শেফার্ড (মাইকেল ডগলাস)। তিনি একজন বিপত্নীক এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট। তিনি যখন দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ঠিক তখনই প্রেমে পড়েন পরিবেশবাদী লবিস্ট সিডনি এলেন ওয়েড-এর (অ্যানেট বেনিং)। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত প্রেম কীভাবে জাতীয় রাজনীতিতে ঝড় তুলতে পারে এবং প্রতিপক্ষ কীভাবে একে পুঁজি করে ফায়দা লুটতে চায়—সেটাই এই সিনেমার মূল উপজীব্য। সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন রব রাইনার।
সিনেমার গল্পে দেখা যায় গ্রান্ট ম্যাথিউস একজন বড় ব্যবসায়ী এবং বেশ স্পষ্টভাষী মানুষ। তার এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে এক প্রভাবশালী নারী পত্রিকার মালিক তাকে প্রেসিডেন্ট বানানোর প্রস্তাব দেন। তবে সমস্যা বাধে একটি জায়গায়। বৈবাহিক সম্পর্ক থাকলেও গ্রান্ট আর তার স্ত্রী মেরি আলাদা থাকেন। নির্বাচনে তাই শর্ত একটাই—জনমত নিজের পক্ষে রাখতে গ্রান্টকে স্ত্রী মেরির (ক্যাথরিন হেপবার্ন) সঙ্গে লোকদেখানো ‘সুখী দাম্পত্য’ অভিনয় করতে হবে। নির্বাচনী উপদেষ্টারা গ্রান্টকে বললেন, ‘জনগণ এমন প্রার্থী পছন্দ করেন না, যার সংসার টেকেনি। তাই নির্বাচনে জিততে হলে তোমার স্ত্রীর সঙ্গে মিল হওয়ার নাটক করতে হবে। মানুষকে দেখাতে হবে, তোমরা খুব সুখী দম্পতি।’
নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার লোভে গ্রান্ট রাজি হয়ে যান। মেরিও তার স্বামীর ভালোর কথা চিন্তা করে এই ‘সুখী দম্পতি’র অভিনয়ে যোগ দেন। কিন্তু প্রচারণা যত এগোতে থাকে, গ্রান্ট তত বেশি মিথ্যা বলতে শুরু করেন এবং বড় বড় দুর্নীতিবাজের সঙ্গে হাত মেলান। মেরি এটা দেখে খুব কষ্ট পান। তিনি বুঝতে পারেন, প্রেসিডেন্ট হওয়ার নেশায় তার স্বামী নিজের সততা হারিয়ে ফেলছেন। সবশেষে, একটি বড় টিভি অনুষ্ঠানের লাইভ ভাষণে গ্রান্টের বিবেক জেগে ওঠে। তিনি সবার সামনে স্বীকার করেন যে এই পুরো প্রচারণাই ছিল একটা সাজানো নাটক। তিনি ক্ষমতা নয়; বরং নিজের হারিয়ে যাওয়া সততা ফিরে পেতে চান। ছবিটি নির্মাণ করেছেন ফ্রাঙ্ক ক্যাপ্রা
রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে প্রার্থী বাছাইয়ের সময় যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর রেষারেষি চলে, এই মুভি তার একটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। ষাটের দশকের পটভূমি হলেও নির্বাচনের আগে একে অপরের চরিত্র হনন করার যে সংস্কৃতি আমরা দেখি, তার চিরন্তন রূপ ফুটে উঠেছে এই ক্ল্যাসিক ড্রামায়। গল্পটি শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাজনৈতিক দলের কনভেনশন বা সম্মেলনকে ঘিরে, যেখানে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাই করা হবে। মূল লড়াইটা হচ্ছে দুজন প্রার্থীর মধ্যে, যাঁদের ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ আকাশ-পাতাল ভিন্ন। নির্বাচন যখন ঘনিয়ে আসে, তখন একজন প্রার্থীর কাছে আরেকজন প্রার্থীর ব্যক্তিগত কিছু তথ্য চলে আসে। জেতার জন্য তারা কি একে অপরের ব্যক্তিগত জীবনের গোপন তথ্য ফাঁস করে দেবেন? জানতে হলে দেখতে হবে ফ্রাঙ্কলিন জে শ্যাফনার পরিচালিত ‘দ্য বেস্ট ম্যান’।
যদিও এটি একটি তথ্যচিত্র, কিন্তু এর দৃশ্যগুলো এতই টান টান উত্তেজনার যে আপনার কাছে মনে হবে আপনি একটি দুর্দান্ত থ্রিলার সিনেমা দেখছেন। যৌথভাবে এটি নির্মাণ করেছেন ডি এ পেনবেকার ও ক্রিস হেজেডাস। ১৯৯২ সালে বিল ক্লিনটন যখন প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য নির্বাচন করছিলেন, তখন পরিচালকেরা সরাসরি তাদের নির্বাচনী অফিসে (যাকে বলা হয় ‘ওয়াররুম’) ক্যামেরা নিয়ে ঢুকে পড়েছিলেন।
প্রতিটি প্রার্থীর পেছনে এমন কিছু ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা কৌশলী মানুষ থাকেন। তারা জনমত কোন দিকে ঘুরবে, তা ঠিক করেন। সাধারণত আমরা দেখি, প্রার্থীরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন, কিন্তু সেই ভাষণের প্রতিটি শব্দ কে ঠিক করে দেয়? প্রার্থীর হুট করে কোনো কেলেঙ্কারি ফাঁস হলে, তা সামাল দেয় কারা? এই সিনেমার ক্যামেরা ঠিক সেই জায়গাটিতে ঢুকে পড়েছে।
ব্যারি লেভিনসন পরিচালিত ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে। ভোটের ঠিক দুই সপ্তাহ আগে যদি প্রার্থীর কোনো কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়, তবে কী হবে? এই সিনেমার উত্তর হলো: গুজব ছড়িয়ে দাও! মানুষের নজর ঘোরাতে মিডিয়াকে ব্যবহার করে কীভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়, তা এই স্যাটায়ারে চমৎকার ফুটে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে ‘ফেক নিউজ’ বা প্রোপাগান্ডা যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা বুঝতে এটি মাস্ট ওয়াচ। ছবিতে অভিনয় করেছেন রবার্ট ডি নিরো, ডাস্টিন হফম্যান।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, এটিকে কেবল একটি সিনেমা নয়; বরং এটি বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকতা ও ক্ষমতার লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় পাঠ্যবই। সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগের পেছনের সত্যিকারের রোমহর্ষক ঘটনা নিয়ে ছবিটি নির্মাণ করেছেন অ্যালান জে পাকুলা।
গল্পের শুরু হয় ওয়াশিংটনের একটি সাধারণ চুরির ঘটনা দিয়ে। ওয়াটারগেট নামে এক ভবনে একটি রাজনৈতিক দলের অফিসে পাঁচজন চোর ঢুকে তথ্য চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। শুরুতে একে ছোটখাটো ঘটনা মনে হলেও ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার দুই অকুতোভয় সাংবাদিক—বব উডওয়ার্ড (রবার্ট রেডফোর্ড) এবং কার্ল বার্নস্টাইন (ডাস্টিন হফম্যান), এতে গভীর রহস্যের গন্ধ পান। তারা তদন্ত করতে গিয়ে দেখেন, এই চুরির পেছনে কোনো ছিঁচকে চোর নয়; বরং স্বয়ং প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নির্বাচনী প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জড়িত! ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি ফাঁস করা দুই সাংবাদিকের এই সত্য গল্প দেখায়, কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে দমানোর চেষ্টা করা হয়। নির্বাচনে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা আর সত্যানুসন্ধান কেন এত জরুরি, এই সিনেমা তার জীবন্ত দলিল।
ছবিটি মোট চারটি অস্কার জিতেছিল (সেরা পার্শ্ব-অভিনেতা, সেরা চিত্রনাট্য, সেরা আর্ট ডিরেকশন এবং সেরা সাউন্ড)। এটি সেরা সিনেমা হিসেবেও মনোনীত হয়েছিল।
সিনেমাটিকে হলিউডের অন্যতম সেরা পলিটিক্যাল স্যাটায়ার ধরা হয়, যা মূলত ১৯৯২ সালে বিল ক্লিনটনের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে। সিনেমার গল্পটি আবর্তিত হয় হেনরি বার্টন (আড্রিয়ান লেস্টার) নামে এক তরুণ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজনৈতিক কর্মীকে ঘিরে। সে স্বপ্ন দেখে এমন একজন নেতার সাথে কাজ করবে, যিনি সত্যিই দেশের মানুষের ভাগ্য বদলে দেবেন। সে খুঁজে পায় গভর্নর জ্যাক স্ট্যান্টনকে। গল্পে দেখা যায়, গভর্নর হিসেবে স্ট্যান্টন বেশ জনপ্রিয়, যিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝেন, চোখে চোখ রেখে বলতে পারেন, ‘আমি তোমাদের কষ্ট অনুভব করি।’ কিন্তু পর্দার আড়ালে তাঁর জীবন নানা বিতর্ক আর কেলেঙ্কারিতে ভরা। এক দেশপ্রেমিক তরুণ রাজনৈতিক কর্মীর ‘মোহভঙ্গ’র গল্পই এই সিনেমায় উঠে এসেছে। আর ভোটের লড়াইয়ে ‘ইমেজ’ কতটা জরুরি, তা এ সিনেমায় তুলে ধরেছেন নির্মাতা মাইক নিকোলস।