১০০ বছর পরও মনরো–রহস্য
বয়স হয়েছিল মোটে ৩৬। কেটেছেঁটে ১৭ বছরের ক্যারিয়ার। কিন্তু মৃত্যুর ছয় দশকের বেশি সময় পরও তাঁকে নিয়ে মানুষের আগ্রহ কমেনি; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবন যেন আরও বেশি রহস্যময় হয়ে উঠেছে। তিনি মেরিলিন মনরো। আজ ১ জুন, তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নানা অনুষ্ঠান, প্রদর্শনী ও স্মারক আয়োজন হচ্ছে। কিন্তু এসবের মধ্যেও একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে—মেরিলিন মনরো আসলে কে ছিলেন? তিনি কি কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নাকি তাঁর হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক জটিল, সংগ্রামী এবং অসাধারণ বুদ্ধিমতী নারীর গল্প? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই লস অ্যাঞ্জেলেসের একাডেমি মিউজিয়ামে আয়োজন করা হয়েছে ‘মেরিলিন মনরো: হলিউড আইকন’ শীর্ষক বিশেষ প্রদর্শনী। সেখানে রাখা হয়েছে তাঁর বিখ্যাত পোশাক, ব্যক্তিগত সামগ্রী, চিঠিপত্র, চলচ্চিত্রের স্মারক এবং জীবনের নানা অধ্যায়ের নিদর্শন।
একটি গোলাপি পোশাকের গল্প
প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি হলো ‘জেন্টলম্যান প্রেফার ব্লন্ডস’ সিনেমায় ব্যবহৃত সেই বিখ্যাত গোলাপি গাউন। সিনেমায় ‘ডায়মন্ডস আর আ গার্লস বেস্ট ফ্রেন্ড’ গানের দৃশ্যে মনরোকে এই পোশাকে দেখা গিয়েছিল। দর্শকের কাছে এটি শুধু একটি পোশাক নয়; এটি হলিউড ইতিহাসের অংশ। কারণ, এই গাউন আজও মেরিলিন মনরোর ব্যক্তিত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়—গ্ল্যামার, আত্মবিশ্বাস এবং নারীত্বের এক অনন্যমিশ্রণ।
তবে এই প্রদর্শনী শুধু মনরোর রূপ বা তারকাখ্যাতিকে উদ্যাপন করছে না; বরং দেখাতে চাইছে, মনরো ছিলেন নিজের সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা নারী।
সৌন্দর্যের আড়ালের সংগ্রামী নারী
আজও অনেকেই মেরিলিন মনরোকে শুধু ‘সেক্স সিম্বল’ হিসেবে মনে রাখেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁর জীবন ছিল অনেক বেশি জটিল। শৈশবে তিনি অনাথ আশ্রম ও পালক পরিবারের মধ্যে বড় হয়েছেন। নিরাপদ পরিবার বা আর্থিক নিশ্চয়তা—কোনোটিই তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। জীবনের শুরুটা ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। তবু সেই অনিশ্চয়তা পেরিয়ে তিনি হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত অভিনেত্রীদের একজন হয়ে ওঠেন। পঞ্চাশের দশকের রক্ষণশীল আমেরিকায় তিনি খোলাখুলিভাবে মানসিক স্বাস্থ্য, থেরাপি এবং নারীর স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতেন। এমন সময়ে, যখন স্টুডিও–প্রধানেরা অভিনেত্রীদের ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণ করতেন, তখন মনরো নিজের মতামত প্রকাশ করতে দ্বিধা করতেন না। তিনি নিজস্ব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছিলেন। সে সময় একজন নারী তারকার জন্য এটি ছিল অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ।
নিজের ইমেজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে
মনরোর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ক্যামেরাকে বোঝার ক্ষমতা। তিনি জানতেন, কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করলে দর্শক মুগ্ধ হবেন। কোন পোশাক তাঁকে মানায়, কোন অ্যাঙ্গেলে ছবি তুলতে হবে, কীভাবে আলো ব্যবহার করতে হবে—সব বিষয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। হলিউড স্টুডিওগুলো তাঁকে পণ্যের মতো ব্যবহার করতে চাইলেও তিনি সব সময় নিজের ইমেজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চেষ্টা করেছেন। এ কারণেই আজকের অনেক গবেষক তাঁকে আধুনিক তারকা–সংস্কৃতির অগ্রদূত মনে করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তারকারা যেভাবে নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি করেন, মনরো অনেকটা সেই কাজই করেছিলেন কয়েক দশক আগে।
বিতর্ককে শক্তিতে রূপান্তর
১৯৫২ সালে একটি বড় বিতর্ক তাঁর ক্যারিয়ারকে নাড়িয়ে দেয়। সাংবাদিকেরা আবিষ্কার করেন, কয়েক বছর আগে অর্থকষ্টে থাকা অবস্থায় তিনি নগ্ন মডেল হিসেবে ছবি তুলেছিলেন। সে সময় এমন তথ্য প্রকাশ পাওয়া একজন অভিনেত্রীর ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দিতে পারত। স্টুডিও কর্তৃপক্ষ তাঁকে ছবিগুলো অস্বীকার করতে বলেছিল। কিন্তু মনরো তা করেননি; বরং তিনি স্বীকার করেছিলেন যে অর্থের প্রয়োজনেই তিনি সেই কাজ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এতে লজ্জার কিছু নেই। এই সৎ ও নির্ভীক অবস্থান মানুষকে বিস্মিত করেছিল। বিতর্কে হারিয়ে যাওয়ার বদলে তিনি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
ভালোবাসা, একাকিত্ব এবং অস্থিরতা
মনরোর জীবনের আরেকটি বড় অংশ ছিল তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক। বেসবল কিংবদন্তি জো ডিম্যাজিও এবং নাট্যকার আর্থার মিলারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে আজও আলোচনার বিষয়। কিন্তু সম্পর্কগুলো তাঁকে স্থায়ী সুখ দিতে পারেনি। খ্যাতি যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে একাকিত্ব। মাদক ও অ্যালকোহলের সঙ্গে তাঁর সংগ্রামও ছিল দীর্ঘদিনের। শুটিং সেটে দেরি করে পৌঁছানো বা কাজের সময় অনিশ্চিত আচরণের জন্য তাঁকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ে অনেক গবেষক মনে করেন, সেই সমালোচনার পেছনে তখনকার সমাজের নারীবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গিও কাজ করেছিল।
সাদা পোশাকের চিরন্তন মুহূর্ত
‘দ্য সেভেন ইয়ার ইচ’ সিনেমায় সাবওয়ে ভেন্টের বাতাসে উড়ে যাওয়া সাদা পোশাক পরা মনরোর দৃশ্যটি সিনেমার ইতিহাসে সবচেয়ে পরিচিত মুহূর্তগুলোর একটি। প্রদর্শনীতে সেই বিখ্যাত পোশাকও রাখা হয়েছে। আজও সেই দৃশ্য দেখলে মনে হয়, যেন সময় থমকে গেছে। কারণ, সেখানে শুধু একজন অভিনেত্রী নেই; আছে একটি যুগের প্রতীক।
কেন এখনো মানুষ মুগ্ধ?
মনরোকে নিয়ে অসংখ্য বই লেখা হয়েছে, চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, গবেষণা হয়েছে। এর কারণ শুধু তাঁর সৌন্দর্য নয়। তিনি একই সঙ্গে শক্তিশালী এবং ভঙ্গুর ছিলেন। আত্মবিশ্বাসী হলেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। সবার ভালোবাসা পেয়েও একাকিত্বের সঙ্গে লড়েছেন। এই বৈপরীত্যই তাঁকে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। মানুষ তাঁর মধ্যে নিজের স্বপ্ন, ব্যর্থতা, আকাঙ্ক্ষা এবং বেদনার প্রতিফলন খুঁজে পায়।
যে রহস্যের সমাধান হয়নি
১৯৬২ সালে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান মনরো। সরকারি হিসাবে এটি ছিল ওষুধের অতিরিক্ত মাত্রাজনিত মৃত্যু। কিন্তু সেই মৃত্যু ঘিরে অসংখ্য ষড়যন্ত্রতত্ত্ব জন্ম নিয়েছে। কেনেডি পরিবার থেকে শুরু করে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের নামও নানা সময় আলোচনায় এসেছে। যদিও এসব তত্ত্বের অনেকগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই, তবু এগুলো মনরোর রহস্যময় ভাবমূর্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
শত বছর পর
মেরিলিন মনরোর জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হলেও তাঁকে নিয়ে কৌতূহল ফুরায়নি। কারণ, তিনি কেবল একজন অভিনেত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন সেই সময়ের জনসংস্কৃতির সবচেয়ে বড় মুখ, একটি প্রতীক, একটি প্রশ্ন। কীভাবে একজন নারী একই সঙ্গে এতটা শক্তিশালী এবং এতটা অসহায় হতে পারেন? কীভাবে একজন মানুষ কোটি মানুষের ভালোবাসা পেয়েও নিজের ভেতরের শূন্যতা পূরণ করতে পারেন না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও পুরোপুরি মেলেনি। আর সম্ভবত সেখানেই মেরিলিন মনরোর প্রকৃত জাদু। তিনি শুধু ইতিহাসের অংশ নন; তিনি এমন এক রহস্য, যার সমাধান খুঁজতে মানুষ এখনো ফিরে যায় তাঁর ছবির দিকে, তাঁর সিনেমার দিকে, তাঁর জীবনের দিকে। ১০০ বছর পরও তাই মেরিলিন মনরো শুধু একজন তারকা নন—তিনি এক অনন্ত বিস্ময়।
লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস অবলম্বনে