স্বামীর রহস্যময় মৃত্যু, সন্দেহের মুখে পড়েছিলেন জিন হার্লোও

জিন হার্লো ও চলচ্চিত্র প্রযোজক পল বার্ন
ছবি: আইএমডিবি

হলিউডের সোনালি যুগে রুপালি আভাযুক্ত স্বর্ণালি চুলের জন্য ‘প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন জিন হার্লো। পর্দায় আবেদনময়ী উপস্থিতি ও কৌতুকাভিনয়ের দক্ষতায় অল্প বয়সেই হয়ে উঠেছিলেন তারকা। সেই উত্থানের মধ্যেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে বিপর্যয়। বিয়ের মাত্র দুই মাস পর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় স্বামী পল বার্নের গুলিবিদ্ধ মরদেহ। পাওয়া যায় একটি রহস্যময় চিঠিও। তদন্তে মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলেও পরে সামনে আসে হত্যাকাণ্ডের তথ্য। প্রায় এক শতাব্দী পরও ঘটনাটি নিয়ে কৌতূহল রয়ে গেছে। কী ঘটেছিল সেদিন?

তারকাখ্যাতির পথে
জিন হার্লোর জন্মনাম হারলিন কারপেন্টার। ১৯১১ সালের ৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের কানসাস সিটিতে জন্ম তাঁর। অভিনয়ে এসে মায়ের বিয়ের আগের নাম ‘জিন হার্লো’ গ্রহণ করেন তিনি।
১৯৩০ সালে হাওয়ার্ড হিউজের ‘হেলস অ্যাঞ্জেলস’ ছবিতে অভিনয় করে পরিচিতি পান হার্লো। এরপর ‘প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড’ ও ‘রেড-হেডেড ওম্যান’ তাঁকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে। সৌন্দর্য ও পর্দার আবেদনের পাশাপাশি তাঁর কৌতুকাভিনয়ের সামর্থ্যও নজর কাড়তে থাকে।

জিন হার্লো ও চলচ্চিত্র প্রযোজক পল বার্ন
ছবি: আইএমডিবি

আলোচিত বিয়ে
পল বার্ন ছিলেন মেট্রো-গোল্ডউইন-মেয়ার বা এমজিএমের সহযোগী প্রযোজক এবং স্টুডিওর প্রযোজনা বিভাগের প্রধান আরভিং থালবার্গের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। হার্লোকে অভিনেত্রী হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও বার্নের ভূমিকা ছিল।
পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা, এরপর বিয়ে। ১৯৩২ সালের ২ জুলাই বিয়ে করেন তাঁরা। তখন হার্লোর বয়স ২১ বছর, বার্নের ৪২। তাঁদের এই বিয়ে হলিউডে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

দুই মাস পরই বিপর্যয়
১৯৩২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বেভারলি হিলসের বাড়িতে বার্নের গুলিবিদ্ধ মরদেহ পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে পাওয়া চিঠিটিকে কর্তৃপক্ষ তাঁর আত্মহত্যার চিরকুট হিসেবে বিবেচনা করে।
সে বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত টাইম সাময়িকীর প্রতিবেদনে চিঠিটির বিবরণ রয়েছে। তাতে বার্ন নিজের কোনো ভয়াবহ অন্যায় এবং গভীর অপমানবোধের কথা লিখেছিলেন। শেষের একটি বাক্যে আগের রাতকে ‘কমেডি’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু কোন ঘটনা বোঝাতে কথাটি লেখা হয়েছিল, তা স্পষ্ট ছিল না। চিঠির এই অস্পষ্ট ভাষা ঘটনাটিকে ঘিরে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

সিনেমার পোস্টারে জিন হার্লো
ছবি: আইএমডিবি

সামনে আসে আরেক নারীর নাম
বার্নের মৃত্যুর পর হার্লোও সাময়িকভাবে সন্দেহের মুখে পড়েছিলেন। তবে তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বার্নের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।
তদন্তে উঠে আসে ডরোথি মিলেটের নাম। বার্নের সঙ্গে আগে তাঁর দাম্পত্যসদৃশ সম্পর্ক ছিল। একই সময়ে মিলেটের মৃত্যুও ঘটনাটিকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত চলচ্চিত্র গবেষক ড্যানিয়েল ইগানের ‘রেড ডাস্ট’–বিষয়ক নিবন্ধ অনুযায়ী, একটি স্টিমার থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মিলেটের মৃত্যু হয়। তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয় ১৪ সেপ্টেম্বর। তবে এ ঘটনাগুলো বার্নকে হত্যা করা হয়েছিল—এমন প্রমাণ দেয়নি।

পুনঃ তদন্তেও বদলায়নি সিদ্ধান্ত
পরবর্তী সময়ে বার্নের মৃত্যু নিয়ে নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন লেখক ও জীবনীকারেরা। চিত্রনাট্যকার বেন হেক্ট হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনা উত্থাপন করেন। ১৯৬০ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির দপ্তর তদন্ত পুনরায় খোলে। হার্লোর বাড়ির কর্মীদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু নতুন প্রমাণ না পাওয়ায় আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
পরে বার্নের সহকর্মী স্যামুয়েল মার্ক্সও হত্যাকাণ্ডের তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর দাবি ছিল, বার্নকে হত্যা করেছিলেন মিলেট এবং কেলেঙ্কারি এড়াতে ঘটনাটি আড়াল করেছিল এমজিএম। তবে এই দাবি প্রমাণিত হয়নি এবং তদন্তের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তও বদলায়নি।

আরও পড়ুন
জিন হার্লো
ছবি: আইএমডিবি

অভিনয়ে ফিরেছিলেন হার্লো
স্বামীর মৃত্যুর সময় ‘রেড ডাস্ট’ ছবিতে কাজ করছিলেন হার্লো। ব্যক্তিগত বিপর্যয় ও সংবাদমাধ্যমের তীব্র কৌতূহলের মধ্যেও আবার শুটিংয়ে ফেরেন তিনি। এরপর ‘ডিনার অ্যাট এইট’ ও ‘বম্বশেল’–এর মতো ছবিতে অভিনয় করে হলিউডে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেন।

১৯৩৩ সালে চিত্রগ্রাহক হ্যারল্ড রসনকে বিয়ে করেন হার্লো। তবে পরের বছরই তাঁরা আলাদা হয়ে যান। হার্লোর জীবনও দীর্ঘ হয়নি। ১৯৩৭ সালের ৭ জুন কিডনি বিকল হয়ে মাত্র ২৬ বছর বয়সে মারা যান এই অভিনেত্রী।

হার্লোর মৃত্যুর পরও বার্নকে ঘিরে আলোচনা থামেনি। চিঠির দুর্বোধ্য ভাষা, অতীতের সম্পর্ক এবং পরবর্তী লেখকদের ভিন্ন ব্যাখ্যা ঘটনাটিকে বারবার সামনে এনেছে। তবে নানা জল্পনা সত্ত্বেও হত্যাকাণ্ডের তথ্য প্রমাণিত হয়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে পল বার্নের মৃত্যু আত্মহত্যা হিসেবেই নথিভুক্ত রয়েছে।