বেলা তারের সঙ্গে দুই বেলা

বেলা তারের সঙ্গে প্রসূন রহমানছবি: প্রসূন রহমানের সৌজন্যে

কিছু সাক্ষাৎ পরিকল্পনা করে হয় না। ২০২২ সালে ২৭তম কেরালা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (আইএফএফকে) বেলা তারের সঙ্গে সাক্ষাৎ তেমনই এক ঘটনা।
আমাদের চলচ্চিত্র ‘প্রিয় সত্যজিৎ’ কেরালায় আমন্ত্রিত হয়েছিল। ছবিটি প্রতিযোগিতা বিভাগে ছিল না, তবু আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলাম; কারণটা বেলা তার। আজীবন সম্মাননা নিতে কেরালা আসছিলেন এই কিংবদন্তি হাঙ্গেরীয় চলচ্চিত্রকার।
উৎসবে ‘প্রিয় সত্যজিৎ’ দেখানো হয় ১২ ও ১৪ ডিসেম্বর। বেলা তার আসেন ১৫ ডিসেম্বর। সেদিন তাঁর সম্মানে আয়োজিত বিশেষ নৈশভোজে আমিও আমন্ত্রিত ছিলাম।

বেলা তার। এএফপি ফাইল ছবি

মঞ্চের কাছাকাছি মাঝখানের একটা টেবিলে বসেছিলেন বেলা। সময়ের ভারে বোধ হয় একটু অবনত ও ক্লান্ত, বয়সের তুলনায় একটু বেশি বয়স্ক। পাশে তাঁর সঙ্গিনী—তুলনায় তরুণ, শান্ত, সংযত। আর সদাহাস্য। তাঁর সিনেমার মতোই বেলা তারের চারপাশে একধরনের নীরব বলয়। চারপাশে আড়চোখে তাকানো সবার চোখে সম্মান এবং একই সঙ্গে কাছাকাছি যেতে কিছুটা দ্বিধা। সবাই কেন জানি একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলছিলেন।

পরিচয় দিতেই হাত মেলালেন, পাশে বসতে বললেন, হাসলেন, কথা বললেন। কোনো দূরত্ব ছিল না। কোনো কিংবদন্তিসুলভ ভঙ্গিও নয়। তিনি জানতে চাইলেন বাংলাদেশি সিনেমা সম্পর্কে, ‘প্রিয় সত্যজিৎ’ সম্পর্কে। সেই কৌতূহল ছিল আন্তরিক, প্রায় শিশুসুলভ। আমরা কথা বললাম সিনেমা নিয়ে, জীবন নিয়ে, প্রিয় পানীয় নিয়ে আর কোন ধরনের চলচ্চিত্র এখনো তাঁকে টানে, তা নিয়ে।
কথার ফাঁকে ছিল ম্লান হাসি আর নীরবতা। তিনি কথা বলছিলেন এমন একজন মানুষের মতো, যিনি আর কিছু প্রমাণ করতে চান না। শুনছিলেন গভীর মনোযোগে, যেন প্রতিটি মানুষই তাঁর কাছে একেকটি আলাদা গল্প।

পরদিন তিরুবনন্তপুরমের সবচেয়ে অভিজাত এক মিলনায়তনে উপচে পড়া ভিড়ে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে কথা বললেন তিনি। তাঁর সিনেমার মতোই তারের কণ্ঠ ছিল সরল ও মেদহীন, একরৈখিক। তিনি বললেন শৈশবের কথা, কর্মজীবনের কথা, সিনেমায় প্রবেশের গল্প, যা ছিল অনিবার্য এক গন্তব্য। বললেন গদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ, দীর্ঘ শটের দর্শন, সময়কে কেন কেবল কৌশল নয়, নৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখেন, সেসব নিয়ে।
দর্শকদের প্রশ্নে তাঁর উত্তর ছিল ধারালো, তীক্ষ্ণ রসবোধে ভরপুর আর আত্মবিশ্বাসে ঠাসা। নিজের বিশ্বাসকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেননি। তার আর প্রয়োজনও ছিল না।
নিজ ইচ্ছায় একসময় সিনেমা বানানো বন্ধ করেন বেলা তার। প্রযোজকের অভাবে নয়; বরং বুঝেছিলেন, যা বলার বলা হয়ে গেছে। চলচ্চিত্রকার কখনো বলেকয়ে অবসর নেন না। কেউ কেউ শুধু নীরবতাকে বেছে নেন। বেলা তার অবসরই বেছে নিয়েছিলেন। আজকের দ্রুতগতির সিনেমার যুগে মন্থরতা, ধৈর্য, পর্যবেক্ষণ আর নৈতিক অপেক্ষার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন বেলা তার।

আরও পড়ুন

সেই নৈশভোজের টেবিলে আর পরদিন মিলনায়তনে বসে মনে হয়েছিল, আমি কেবল একজন চলচ্চিত্রকারকে সম্মানিত হতে দেখছি না; বরং একটি বিশ্বাসকে, একটি দর্শনকে, একটি দৃষ্টিভঙ্গিকে নিজের জায়গায় দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি। এই সাক্ষাৎ অক্ষয় স্মৃতি হয়ে থাকবে।
বেলা তার চলে গেছেন। কিন্তু যে নীরবতার ওপর তিনি বিশ্বাস রেখেছিলেন, এখনো তা আমাদের মধ্যে বর্তমান। এই নীরবতা আমাদেরও সঙ্গী হয়ে থাকবে।
বেলা তার, আপনার অনন্তযাত্রা শান্তিময় হোক!