সাবেক প্রেমিকাকে ধর্ষণের ষড়যন্ত্র, পর্দায় উঠে এল ভয়ংকর সত্যি
প্রেম, প্রতিশোধ, মিথ্যা অভিযোগ আর ক্ষমতার অপব্যবহারের এক অবিশ্বাস্য গল্প তুলে ধরেছে নেটফ্লিক্সের নতুন তথ্যচিত্র ‘আ টক্সিক লাভ স্টোরি’। ২২ জুলাই মুক্তি পাওয়া এ তথ্যচিত্র এমন এক মামলার অনুসরণ করেছে, যেখানে একজন সাবেক মার্কিন ডেপুটি ইউএস মার্শাল নিজের সাবেক প্রেমিকাকে ধর্ষণের ষড়যন্ত্র ও স্টকিংয়ের মতো গুরুতর অপরাধে ফাঁসাতে পরিকল্পিতভাবে সাজিয়েছিলেন পুরো নাটক। অথচ শেষ পর্যন্ত তদন্তেই বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সত্য।
রহস্যময় ই-মেইল থেকে তদন্তের শুরু
২০১৬ সালের ১ জুন। ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যানাহাইমে পুলিশকে এক অদ্ভুত অভিযোগ করেন ইয়ান ডিয়াজ ও তাঁর নতুন স্ত্রী অ্যাঞ্জেলা ডিয়াজ।
অ্যাঞ্জেলার দাবি, কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি ‘লিলিথ ইজ ট্রুথ’ নামে একটি ই-মেইল ঠিকানা থেকে হুমকি ও অপমানজনক বার্তা পাচ্ছেন। ই-মেইলগুলোতে তাঁকে ‘পাপি’ বলা হচ্ছিল। লেখা ছিল, ‘ইয়ান তোমাকে ভালোবাসে না’, ‘তুমি আমার জীবন চুরি করে নিয়েছ’।
তদন্তকারীরা ‘লিলিথ ইজ ট্রুথ’ ই-মেইলের আইপি ঠিকানা অনুসরণ করে দেখেন, সবকিছুই পাঠানো হয়েছে সেই কন্ডোমিনিয়াম থেকেই, যেখানে তখন ইয়ান ও অ্যাঞ্জেলা থাকতেন। অর্থাৎ অভিযুক্ত মিশেল সেখানে থাকতেনই না।
শুধু ই-মেইল নয়, ধর্ষণের ফাঁদ পেতে দেওয়া অনলাইন বিজ্ঞাপনগুলোরও উৎস ছিল একই বাড়ি।
‘লিলিথ’ ইহুদি লোককাহিনির একটি চরিত্র, যিনি আদমকে ছেড়ে স্বাধীন জীবন বেছে নিয়েছিলেন। পুলিশকে ইয়ান ও অ্যাঞ্জেলা জানান, এই ভাষা ও ধর্মীয় ইঙ্গিত দেখে তাঁদের সন্দেহ, ই-মেইলগুলো পাঠাচ্ছেন ইয়ানের সাবেক প্রেমিকা মিশেল হ্যাডলি। কারণ, সম্পর্ক ভাঙার পর অতীতে মিশেলও লিলিথের উল্লেখ করে ইয়ানকে কিছু ধর্মীয় ভাষার ই-মেইল পাঠিয়েছিলেন।
কিন্তু অভিযোগ এখানেই থামেনি। অ্যাঞ্জেলার দাবি ছিল, মিশেল তাঁর ছবি ব্যবহার করে অনলাইনে এমন বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, যেখানে পুরুষদের তাঁদের বাসায় এসে ধর্ষণের অভিনয় করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি পুলিশকে বলেন, বিজ্ঞাপন দেখে একাধিক পুরুষ তাঁদের বাসায় চলে আসেন। এমনকি এক ব্যক্তি তাঁর গ্যারেজে তাঁকে আক্রমণেরও চেষ্টা করেন।
নির্দোষ হয়েও জেলে ৮৮ দিন
এ অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে পুলিশ মিশেল হ্যাডলিকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে স্টকিং, ধর্ষণের চেষ্টা, অপহরণসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়। প্রায় তিন মাস—মোট ৮৮ দিন—তিনি কারাগারে কাটান।
এরপর তদন্তে নাটকীয় মোড় আসে।
তদন্তকারীরা ‘লিলিথ ইজ ট্রুথ’ ই-মেইলের আইপি ঠিকানা অনুসরণ করে দেখেন, সবকিছুই পাঠানো হয়েছে সেই কন্ডোমিনিয়াম থেকেই, যেখানে তখন ইয়ান ও অ্যাঞ্জেলা থাকতেন। অর্থাৎ অভিযুক্ত মিশেল সেখানে থাকতেনই না।
শুধু ই-মেইল নয়, ধর্ষণের ফাঁদ পেতে দেওয়া অনলাইন বিজ্ঞাপনগুলোরও উৎস ছিল একই বাড়ি।
মামলাটি শুধু স্থানীয় পুলিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কারণ, ইয়ান ছিলেন একজন ডেপুটি ইউএস মার্শাল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আলাদা তদন্ত শুরু করে।
বিশেষ এজেন্ট জেসন হিগলি পুলিশের বডিক্যাম ফুটেজ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লক্ষ করেন, পুলিশের সঙ্গে কথা বলার সময় ইয়ান অস্বাভাবিকভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং বারবার অ্যাঞ্জেলাকে কী বলতে হবে, তা ইশারায় বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।
এরপর তদন্তকারীরা ইয়ানের সরকারি ল্যাপটপের ব্যাকআপ পরীক্ষা করেন।
সেখানেই মিলতে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
সাবেক প্রেমিকার বিরুদ্ধে সাজানো হয়েছিল পুরো ষড়যন্ত্র
তথ্যচিত্রে মিশেল জানান, তিনি ২০১৩ সালে ইয়ানের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। কিন্তু দুই বছর পর সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে আসেন।
মিশেলের অভিযোগ, ইয়ান অত্যন্ত নিয়ন্ত্রণপ্রবণ ছিলেন। তিনি মিশেলকে নানা ধরনের যৌন কল্পনা পূরণে বাধ্য করতে চাইতেন। এমনকি অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করে তা ভিডিও ধারণ করার চাপও দিয়েছিলেন।
সম্পর্ক ভাঙার পরই ইয়ান একটি ডেটিং সাইটে অ্যাঞ্জেলার সঙ্গে পরিচিত হন। পরে তাঁরা বিয়ে করেন।
অতীতে মিশেল যে কয়েকটি ধর্মীয় ভাষার ই-মেইল পাঠিয়েছিলেন, সেগুলোকেই ভিত্তি করে পরে ‘লিলিথ ইজ ট্রুথ’ নামে শত শত নতুন ই-মেইল তৈরি করা হয়। এতটাই নিখুঁতভাবে সেই ভাষা নকল করা হয়েছিল যে পুলিশ প্রথমে সেটিকেই সত্য বলে বিশ্বাস করে।
প্রথমে ধরা পড়েন অ্যাঞ্জেলা
আইপি ঠিকানা বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা দেখেন, ই-মেইলগুলো কখনো ইয়ানের কন্ডোমিনিয়াম থেকে, কখনো অ্যাঞ্জেলার মুঠোফোন থেকে, আবার কখনো অ্যাঞ্জেলার বাবার অ্যারিজোনার বাড়ি থেকে পাঠানো হয়েছে।
২০১৭ সালে অ্যাঞ্জেলা আদালতে দোষ স্বীকার করেন।
অ্যাঞ্জেলার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের, অপরাধের ভুয়া প্রতিবেদন তৈরি, অবৈধভাবে স্বাধীনতা হরণ এবং মিশেলকে কারাগারে পাঠানোর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
অন্যদিকে মিশেলের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয় এবং তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয়।
তদন্ত তখনো শেষ হয়নি
মামলাটি শুধু স্থানীয় পুলিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কারণ, ইয়ান ছিলেন একজন ডেপুটি ইউএস মার্শাল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আলাদা তদন্ত শুরু করে।
বিশেষ এজেন্ট জেসন হিগলি পুলিশের বডিক্যাম ফুটেজ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লক্ষ করেন, পুলিশের সঙ্গে কথা বলার সময় ইয়ান অস্বাভাবিকভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং বারবার অ্যাঞ্জেলাকে কী বলতে হবে, তা ইশারায় বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।
এরপর তদন্তকারীরা ইয়ানের সরকারি ল্যাপটপের ব্যাকআপ পরীক্ষা করেন।
সেখানেই মিলতে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
২০২১ সালে ইয়ান ডিয়াজকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৩ সালে আদালত তাঁকে সাইবার স্টকিং, আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য এবং ফেডারেল তদন্তে বাধা দেওয়ার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেন। ইয়ানের সাজা হয় ১০ বছরের কারাদণ্ড।
ল্যাপটপে ইয়ানের ব্যক্তিগত ই-মেইল অ্যাকাউন্টের সঙ্গে ‘লিলিথ ইজ ট্রুথ’-এর যোগাযোগের তথ্য পাওয়া যায়। এমনকি ধর্ষণের বিজ্ঞাপনে সাড়া দেওয়া এক ব্যক্তির সঙ্গে ‘লিলিথ’-এর কথোপকথনেরও প্রমাণ মেলে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ল্যাপটপে ‘লিলিথ ইজ ট্রুথ’ নামে পাঠানো বহু ই-মেইলের খসড়া ও অংশবিশেষ উদ্ধার করা হয়।
এসবই প্রমাণ করে, পুরো পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিলেন ইয়ান নিজেই।
তথ্যচিত্রটির পরিচালক আলেক্সান্দ্রা লেসির ভাষায়, মিশেল একসময় সত্যিই লিলিথের উল্লেখ করে কয়েকটি ই-মেইল পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পুরোনো ঘটনাকেই ব্যবহার করে ইয়ান বা অ্যাঞ্জেলা—অথবা দুজন মিলে—শত শত ভুয়া বার্তা তৈরি করেছিলেন। ঠিক কে কোন অংশটি করেছিলেন, তা হয়তো আর কখনো জানা যাবে না।
১০ বছরের কারাদণ্ড
২০২১ সালে ইয়ান ডিয়াজকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৩ সালে আদালত তাঁকে সাইবার স্টকিং, আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য এবং ফেডারেল তদন্তে বাধা দেওয়ার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেন। ইয়ানের সাজা হয় ১০ বছরের কারাদণ্ড।
কেন করেছিলেন এমন কাজ
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ইয়ান কেন নিজের সাবেক প্রেমিকাকে এভাবে ফাঁসাতে চেয়েছিলেন? এর নির্দিষ্ট উত্তর আজও মেলেনি।
তথ্যচিত্রে বিশেষ এজেন্ট জেসন হিগলির ধারণা, ইয়ানের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা। মিশেল তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। আর সেটিই তিনি মেনে নিতে পারেননি।
মিশেল জানান, একসঙ্গে বাড়ি কেনার পর ইয়ান রান্নাঘরে নজরদারির জন্য ক্যামেরা বসিয়েছিলেন। বাড়ির বাইরে গেলেই বারবার ফোন করে জানতে চাইতেন, তিনি কোথায়, কী করছেন।
শুধু তা–ই নয়, মিশেলের পোশাক পর্যন্ত ঠিক করে দিতেন। নকল নখ পরতে বাধ্য করতেন, এমনকি নাভিতে ছিদ্র করানোর চাপও দিয়েছিলেন।
ডকুমেন্টারির প্রযোজক এমা সাপলের মতে, এ মামলার অনেক প্রশ্নের উত্তর হয়তো কখনোই জানা যাবে না। কে কোন ই-মেইল লিখেছেন, কখন লিখেছেন, তার পুরো সত্য সম্ভবত কেবল ইয়ান ও অ্যাঞ্জেলাই জানেন।
নতুন জীবনে মিশেল
বছরের পর বছর ধরে চলা এই দুঃস্বপ্নের পর মিশেল হ্যাডলি ২০২১ সালে অ্যানাহাইম পুলিশ বিভাগের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, যথাযথ তদন্ত না করেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
ডকুমেন্টারির শেষ দৃশ্যে দেখা যায় এক ভিন্ন মিশেলকে। মিশেল এখন এক কন্যাসন্তানের মা। কাকতালীয়ভাবে, তাঁর মেয়ের জন্মদিন আর ইয়ান ডিয়াজের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার দিন একই।
নিজের জীবনের নতুন অধ্যায় নিয়ে মিশেল বলেন, ‘এই ছোট্ট মেয়েটিকে বড় করে তোলাই আমার রূপকথার সমাপ্তি। এটাই আমার “হ্যাপিলি এভার আফটার”। আমি কোনো রাজকুমারী নই। কিন্তু নিজের গল্পের নায়ক হতে পেরেছি।’
এই একটি বাক্যেই যেন শেষ হয়ে যায় বছরের পর বছর ধরে চলা প্রতারণা, মানসিক নির্যাতন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে মিশেলের দীর্ঘ লড়াই।
টাইম অবলম্বনে