নায়ক যেন ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’, মেয়েকে বাঁচাতে মরিয়া লড়াই
কোরিয়ান ড্রামায় প্রতিশোধের গল্প নতুন কিছু নয়। বারবার দেখা একই ধরনের গল্পও যে ঠিকঠাক চরিত্র নির্মাণ আর আবেগের গভীরতায় নতুন হয়ে উঠতে পারে, তা বহুবার প্রমাণ করেছে কে-ড্রামা। ‘এজেন্ট কিম রিঅ্যাকটিভেটেড’ও সেই পরিচিত কাঠামো অনুসরণ করেছে। তবে দর্শককে কীভাবে আটকে রাখতে হয়, সেটি সিরিজটি ভালোভাবেই জানে।
১০ পর্বের অ্যাকশন-থ্রিলার সিরিজটি স্রেফ অ্যাকশন আর প্রতিশোধের গল্প নয়; এর কেন্দ্রে রয়েছে মেয়েকে বাঁচাতে সবকিছু করতে প্রস্তুত এক বাবার আবেগ। প্রথম দুই পর্ব বেশ ছন্দময় গতিতে এগিয়েছে। চরিত্রগুলোকে বোঝার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়ার পর গল্প ঢুকে পড়ে পুরোদস্তুর অ্যাকশনে। এই হয়তো বিশ্বজুড়ে হাজারো দর্শককে মুগ্ধ করেছে। ‘এজেন্ট কিম রিঅ্যাকটিভেটেড’কে পরিণত করেছে চলতি বছরের অন্যতম জনপ্রিয় কোরীয় সিরিজে।
একনজরে
সিরিজ: ‘এজেন্ট কিম রিঅ্যাকটিভেটেড’
ধরন: রিভেঞ্জ ড্রামা, অ্যাকশন
পরিচালনা: ই সুং-ইয়ং ও লি সো–ইয়ুন
অভিনয়: সো জি–সুপ, সো সু-মিন, জু সাং-উক, কিম সিয়ং-গিউ, চোই দে-হুন, পার্ক জিন-চল, উন কিয়ং-হো
পর্ব সংখ্যা: ১০
রানটাইম: ১ ঘণ্টা ২ মিনিট–১ ঘণ্টা ১৪ মিনিট
স্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্স
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র কিম দো-হিয়ন (সো জি–সুপ)। তিনি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক এবং একক বাবা। স্ত্রীকে হারানোর পর কিশোরী মেয়ে মিন-জিকে (সো সু-মিন) একাই বড় করছেন। আশপাশের মানুষের চোখে তিনি খুবই সাধারণ একজন অফিসকর্মী—শান্ত, ভদ্র এবং যতটা সম্ভব ঝামেলা এড়িয়ে চলেন।
কিন্তু কিম দো-হিয়নের অতীত সম্পর্কে কেউ জানেন না। একসময় তিনি ছিলেন দেশের অন্যতম দক্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা। প্রয়াত স্ত্রীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কারণে সেই জীবন ছেড়ে দিয়েছিলেন। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, আর কখনো সেই জগতে ফিরবেন না। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বেশি দিন টেকে না।
স্কুলে হয়রানির শিকার হওয়ার পর মিন-জিকে অপহরণ করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা একটি অপরাধী চক্র। মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে দো-হিয়নকে ফিরে যেতে হয় সেই অন্ধকার জগতে, যেটিকে তিনি বছরের পর বছর ভুলে থাকার চেষ্টা করেছেন।
মেয়েকে উদ্ধারের অভিযানে কিমকে কর্মকাণ্ডের নজরে পড়ে ন্যাশনাল স্পেশাল মিশনস ব্যুরোর। একই সময়ে সামনে আসে ক্ষমতাবান ব্যবসায়ী জু কাং-চান (জু সাং-উক) এবং উত্তর কোরিয়ার এজেন্ট কাং সিয়ং (কিম সিয়ং-গিউ)। দুজনই দো-হিয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তবে মেয়েকে উদ্ধারের লড়াইয়ে দো-হিয়ন একা নন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন দুই সাবেক সহকর্মী ও সহযোদ্ধা—সিয়ং হান-সু (চোই দে-হুন) এবং পার্ক জিন-চল (ইউন কিয়ং-হো)। তিনজনের দক্ষতা আলাদা। একজন দ্রুত ও কৌশলী, অন্যজন শক্তির ওপর বেশি নির্ভরশীল। আর দো-হিয়ন ঠান্ডা মাথায় হিসাব করে এগোন। তিনজন মিলে তাই গড়েন বৈচিত্র্যময় এক টিম।
তিনজনের লক্ষ্য একটাই—মিন-জিকে উদ্ধার করা। পথে দাঁড়ানো অপরাধী, দুর্নীতিগ্রস্ত করপোরেট কর্মকর্তা কিংবা অন্য যে কেউ তাঁদের বাধা দিলে তাকে সরিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
কয়েক বছর সিনেমায় বেশি ব্যস্ত থাকার পর টেলিভিশনে ফিরেছেন সো জি সুপ। তবে তাঁকে দেখে মনে হয় না, এত দিন তিনি ছোট পর্দা থেকে দূরে ছিলেন। কিম দো-হিয়ন চরিত্রে খুব স্বচ্ছন্দে ঢুকে গেছেন তিনি। একদিকে একক বাবার সাধারণ জীবন, অন্যদিকে অতীতে ভয়ংকর এক গোয়েন্দা হিসেবে অর্জন করা দক্ষতা—দুটি ভিন্ন সত্তার মধ্যে দারুণ ভারসাম্য তৈরি করেছেন অভিনেতা। অ্যাকশনেও দুর্দান্ত, মেয়েকে উদ্ধারের অভিযানে তিনি যেন ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’।
চোই দে-হুনও সিয়ং হান-সু চরিত্রে শুরু থেকেই সাবলীল। চরিত্রটিতে আছে সহজাত রসবোধ ও প্রাণবন্ততা। অন্যদিকে ইউন কিয়ং-হো পার্ক জিন-চল চরিত্রে যোগ করেছেন দৃঢ়তা ও শক্তির ছাপ।
সো জি–সুপের দুই সাবেক সহকর্মী শুধু অ্যাকশন দৃশ্যেই সঙ্গী নন; তাঁদের কথাবার্তা ও পারস্পরিক সম্পর্ক গল্পে হাস্যরসেরও জন্ম দেয়। তবে সেই হাস্যরস কখনো গল্পের গাম্ভীর্য নষ্ট করে না। বরং টানা অ্যাকশনের মধ্যে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেয়।
খলনায়কদের মধ্যে জু সাং-উক বিশ্বাসযোগ্য। জু কাং-চান চরিত্রে তাঁকে যথেষ্ট শক্তিশালী প্রতিপক্ষ মনে হয়। প্রথম দুই পর্বে কিম সিয়ং-গিউও কার্যকর অভিনয় করেছেন।
সিরিজটির বড় শক্তি হলো, শুরুতেই অ্যাকশনে ঝাঁপিয়ে পড়েনি। প্রথমে দর্শককে সময় দেওয়া হয়েছে দো-হিয়ন ও মিন-জির সম্পর্ক বোঝার জন্য। ফলে বাবা-মেয়ের বন্ধনটা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। আর তাই যখন মিন-জিকে অপহরণ করা হয়, তখন দর্শকও আবেগের দিক থেকে দো-হিয়নের পাশে দাঁড়িয়ে যান। মেয়েকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার জন্য একজন বাবা যখন একের পর এক মানুষকে ঘুষি মারছেন, প্রতিটি আঘাতের পেছনে তখন শুধু অ্যাকশন নয়, একজন বাবার উৎকণ্ঠাও কাজ করছে। এই আবেগই অ্যাকশন দৃশ্যগুলোকে আরও শক্তিশালী করেছে।
লড়াইয়ের দৃশ্যগুলোও উপভোগ্য। তিন নায়ক একই কায়দায় লড়েন না। দো-হিয়ন শান্ত ও হিসাবি। হান-সু গতি ও কৌশলের ওপর নির্ভর করেন। আর জিন-চল যেন শক্তির জোরে প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেন। ফলে প্রতিটি অ্যাকশন দৃশ্যের আলাদা স্বাদ তৈরি হয়। একই ধরনের মারামারি বারবার দেখার একঘেয়েমি আসে না।
মিন-জি নিখোঁজ হওয়ার পর গল্পও খুব একটা ধীর হয় না। প্রথম দুই পর্বের গতি মোটামুটি ঠিক জায়গায় রয়েছে। দর্শককে একদিকে চরিত্রগুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সময় দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে উত্তেজনাও ধরে রাখা হয়েছে।
প্রথম দুই পর্বের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, সিরিজটি শুরুতেই একটু বেশি কিছু বলতে চেয়েছে।
মাত্র প্রথম দুই ঘণ্টার মধ্যেই সামনে আসে স্কুলের বুলিং, করপোরেট–দুনিয়ার ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা, গোয়েন্দা সংস্থা এবং উত্তর কোরিয়ার এজেন্ট। শেষ পর্যন্ত এসব গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয় ঠিকই, কিন্তু একসঙ্গে এতগুলো হুমকি ও চরিত্রের আবির্ভাব শুরুতে গল্পটিকে কিছুটা বিশৃঙ্খল মনে হতে পারে।
আরও একটু ধীরে এগোলে হয়তো গল্পের প্রতিটি স্তর দর্শকের কাছে আরও পরিষ্কারভাবে পৌঁছাত।
এ ছাড়া কয়েকটি পর্ব ধরে যে উত্তেজনা ও রহস্য ধীরে ধীরে তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্বে কিছুটা তাড়াহুড়া করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বগুলো এত দ্রুত গুটিয়ে ফেলা হয় যে কিছু আবেগঘন মুহূর্ত যথেষ্ট সময় পায় না। সিরিজের আগের অংশে যে ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাস দেখা গেছে, শেষ দিকে তা কিছুটা অনুপস্থিত। বিশেষ করে দো-হিয়ন ও তাঁর মেয়ের সম্পর্ক এবং তিন বন্ধুর আরও কয়েকটি শান্ত মুহূর্ত দেখানো গেলে সমাপ্তিটা আরও তৃপ্তিদায়ক হতে পারত।
‘টেকেন’ থেকে ‘নোবডি’ ধাঁচের কাজ দেখে যাঁদের ভালো লেগেছে; চেনা গল্প হলেও ‘এজেন্ট কিম রিঅ্যাকটিভেটেড’ তাঁদের ভালো লাগতে পারে। দুর্দান্ত অ্যাকশন দৃশ্যের সঙ্গে বাড়তি পাওনা বাবা–মেয়ের আবেগ। যা এটিকে অন্য অনেক অ্যাকশন সিরিজের চেয়ে আলাদা করেছে।