হোটেলের কক্ষ থেকে লাশ উদ্ধার, খুনি কে

‘সামার ’৩৬’–এর পোস্টার থেকে। আইএমডিবি

একটি নিখুঁত ‘মার্ডার মিস্ট্রি’ বা খুনের রহস্যের গল্প কখন দর্শকের মনে স্থায়ী দাগ কাটে? যখন সেটি কেবল ‘খুনি কে’, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে না। বরং ‘কেন খুনটি ঘটল’, সে প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজে বের করে। হত্যাকাণ্ডের পেছনের মানুষ, সম্পর্ক, ক্ষমতার সমীকরণ আর সমাজের বাস্তবতাও যখন রহস্যের অংশ হয়ে ওঠে, তখন একটি গোয়েন্দা গল্প শুধুই একটি ধাঁধা থাকে না। আগাথা ক্রিস্টির ক্ল্যাসিক রহস্য উপন্যাস থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ‘নাইভস আউট’ ফ্র্যাঞ্চাইজি—সফল রহস্যগল্পগুলোর অনেকটাই এ সূত্র অনুসরণ করেছে।

একনজরে
সিরিজ:  ‘সামার ’৩৬’
ধরন: ঐতিহাসিক মার্ডার মিস্ট্রি, ড্রামা
ক্রিয়েটর : মারি দেশাইরে ও ক্যাথরিন তুজে
অভিনয়ে: সোফিয়া এসাইদি, কনস্ট্যান্স গে, জুলি দ্য বোনা, নলওয়েন লেরয়
ভাষা: ফরাসি
স্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্স
পর্ব সংখ্যা:
রানটাইম: ৪৮–৫৭ মিনিট

নেটফ্লিক্সের ফরাসি মিনি সিরিজ ‘সামার ৩৬’ও সেই চেনা সূত্রকে নতুন এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে হাজির করেছে। নির্মাতা মারি দেশাইরে ও ক্যাথরিন তুজে  জানিয়েছেন, তাঁরা আগাথা ক্রিস্টির ধাঁচের ক্ল্যাসিক ‘হু ডান ইট’ রহস্য থেকেই অনুপ্রাণিত। তবে সেই রহস্যকে তাঁরা বসিয়েছেন বাস্তব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। ১৯৩৬ সালের ফ্রান্সের সামাজিক পরিবর্তনের পটভূমিতে নির্মিত ছয় পর্বের এই সিরিজে একদিকে রয়েছে ক্ল্যাসিক ‘হু ডান ইট’ রহস্য, অন্যদিকে শ্রেণিবৈষম্য, ক্ষমতা ও চাপা ক্ষোভকে গল্পের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সে টেলিভিশনে সম্প্রচারের পর দর্শকের নজর কেড়ে সিরিজটি পরে নেটফ্লিক্সের মাধ্যমে ১ জুলাই বিশ্বব্যাপী  মুক্তি পায়। সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত একটি রহস্যগল্প।

‘সামার ’৩৬’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

এ রহস্যের পটভূমি ১৯৩৬ সালের ফ্রান্স। সে সময় সবে ক্ষমতায় এসেছে পপুলার ফ্রন্ট সরকার। ফরাসি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লাখো শ্রমজীবী মানুষ বেতনসহ ছুটি কাটানোর অধিকার পান। এত দিন ফ্রান্সের ভূমধ্যসাগরঘেঁষা ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার সমুদ্রসৈকত ও বিলাসবহুল রিসোর্ট মূলত অভিজাত মানুষের অবকাশযাপনের কেন্দ্র ছিল। ছুটিতে সেখানে এসে পৌঁছায় সাধারণ শ্রমিক পরিবারও।

এ পরিবর্তনের মধ্যেই বিলাসবহুল রিভিয়েরা হোটেলের একটি কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় প্রভাবশালী সরকারি কৌঁসুলি আদ্রিয়াঁ জাকারের (আরনাড বিনার্ড) মরদেহ। কিন্তু তাকে হত্যা করল কে? গল্পের জট খুলতে শুরু করলে সামনে আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন; কেন খুন হলেন তিনি? হোটেলে উপস্থিত চার নারীর প্রত্যেকেরই তার বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যক্তিগত ক্ষোভ, অসমাপ্ত হিসাব কিংবা বহু বছর আগের কোনো গোপন সম্পর্ক। তদন্ত যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয় যে এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কেবল একজন মানুষের মৃত্যু নয়, লুকিয়ে আছে বহু মানুষের অতীত।

গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কাল্পনিক রিভিয়েরা হোটেলের এক ছাদের নিচে এসে মিলেছে সমাজের নানা স্তরের মানুষ—ধনী শিল্পপতি, সরকারি কর্মকর্তা, শ্রমিক পরিবার আর হোটেলকর্মীরা। সব মিলিয়ে বাইরে উৎসবের আমেজ থাকলেও ভেতরে ভেতরে জমতে থাকে বহু বছরের শ্রেণিদ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত ক্ষোভ আর ক্ষমতার টানাপোড়েন। আর সেই অদৃশ্য সংঘাতই ধীরে ধীরে রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে।

আরও পড়ুন

‘সামার ’৩৬’–এর গল্প এগিয়েছে চারজন নারীকে ঘিরে। ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক অবস্থান থেকে আসা ইউজেনি বার্থিয়ে (সোফিয়া এসাইদি), লেউনি মোরেল (কনস্ট্যান্স গে), ব্লঁশ আকেরমান (জুলি দ্য বোনা) ও জুলিয়া ভিনসেন্ট (নলওয়েন লেরয়)। এই চারজনের জীবন একসময় এসে জড়িয়ে পড়ে সরকারি কৌঁসুলি আদ্রিয়াঁ জাকারকে ঘিরে। কারও সঙ্গে তার পুরোনো প্রেমের সম্পর্ক, কারও জীবনে তিনি অন্যায়ের প্রতীক, আবার কারও সঙ্গে রয়েছে আর্থিক লেনদেন। তাই হত্যাকাণ্ডের পর এই চারজনই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

এই চারটি চরিত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ইউজেনি ও লেউনি। ইউজেনির ব্যক্তিগত জীবন আর অতীতের টানাপোড়েন গল্পে আবেগের জায়গা তৈরি করে। অন্যদিকে বাবাকে বাঁচানোর লড়াইয়ে থাকা লিওনি রহস্যের পাশাপাশি ন্যায়বিচারের প্রশ্নটিও সামনে নিয়ে আসে। ব্লঁশ ও জুলিয়ার গল্পও রহস্যকে এগিয়ে নিয়ে যায়, যদিও তাদের কিছু অংশ আরও বিস্তৃত হলে ভালো লাগত।

জেনে রাখা ভালো
• ‘সামার ’৩৬’–এর গল্প কাল্পনিক হলেও এর পটভূমি বাস্তব। ১৯৩৬ সালে ফ্রান্সে প্রথমবার শ্রমজীবী মানুষের জন্য বেতনসহ ছুটি চালুর পর যে সামাজিক পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, সেই ইতিহাস থেকেই সিরিজটির মূল প্রেক্ষাপট নেওয়া হয়েছে।
• নির্মাতা মারি দেশেয়ার ও ক্যাথরিন তুজে জানিয়েছেন, সিরিজটি নির্মাণে তাঁরা আগাথা ক্রিস্টির ধাঁচের ক্ল্যাসিক ‘হু ডান ইট’ রহস্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
• সিরিজটি প্রথমে ফ্রান্সের টেলিভিশন চ্যানেল টিএফ১-এ প্রচারিত হয়। দর্শকপ্রিয়তা পাওয়ার পর এটি নেটফ্লিক্সের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুক্তি পায়।
• ফ্রান্সে প্রচারের সময় প্রথম পর্বটি প্রায় ৫৭ লাখ দর্শক দেখেছিলেন। মৌসুমজুড়েই এটি দেশটির অন্যতম আলোচিত টিভি সিরিজ ছিল।
• সিরিজটির বড় অংশের শুটিং হয়েছে ফ্রান্সের নিস, গ্রাস ও সসপেল শহরে। ফলে পর্দায় দেখা ফরাসি রিভিয়েরার বেশির ভাগ দৃশ্যই বাস্তব লোকেশনে ধারণ করা।

চার নারীর পাশাপাশি সিরিজের কয়েকটি পার্শ্বচরিত্রও গল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিল্পপতি অঁরি (স্যাম কারম্যঅন), পুলিশ কর্মকর্তা আলফঁস রাভেন (ফ্রান্সোয়া-কাজাভিয়ে দেমেসো) ও নিহত সরকারি কৌঁসুলি আদ্রিয়াঁ জাকার—প্রত্যেকেই রহস্যের নতুন স্তর খুলে দেয়। তবে চিত্রনাট্যের দুর্বলতাও এখানেই। চার নারীকে ঘিরে একাধিক পারিবারিক সম্পর্ক, পুরোনো গোপন তথ্য এবং নতুন নতুন চরিত্র একসঙ্গে হাজির হওয়ায় মাঝেমধ্যে গল্পের খেই ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রথম দুই পর্বে কে কার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, সেটি বুঝতে দর্শককে বেশ মনোযোগ দিতে হয়।

‘সামার ’৩৬’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

অভিনয়ের দিক থেকে সিরিজটি নিরাশ করে না। সোফিয়া এসাইদি ‘ইউজেনি’ চরিত্রে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন। কনস্ট্যান্স গে ‘লিওনি’র দৃঢ়তা ও অসহায়ত্ব দুটোই বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। জুলি দ্য বোনা তাঁর ‘ব্লঁশ আকেরমান’ চরিত্রে আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অস্থিরতা দেখিয়েছেন সংযত অভিনয়ে। আর নলওয়েন লেরয়ও ‘জুলিয়া’র চরিত্রে ভয়, লোভ ও দুর্বলতাকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরেছেন।

‘সামার ’৩৬’ নির্মাণে যত্নের ছাপ স্পষ্ট। ফ্রান্সের ভূমধ্যসাগরঘেঁষা ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরার সমুদ্রতীর, ১৯৩০-এর দশকের পোশাক, ক্ল্যাসিক গাড়ি ও বিলাসবহুল হোটেলের অন্দরসজ্জা সময়টিকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। লোকেশন, কস্টিউম, আর্ট ডিরেকশন আর পাসকাল লাফা আবহসংগীত রহস্যের পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে চিত্রনাট্য সব সময় সেই মান ধরে রাখতে পারেনি। রহস্যকে আরও জটিল করতে গিয়ে অনেক চরিত্র, পারিবারিক সম্পর্ক ও অতীতের গোপন তথ্য একসঙ্গে সামনে আনা হয়েছে। সমস্যা চরিত্রের সংখ্যায় নয়, বরং মাত্র ছয় পর্বের মধ্যে এতগুলো সম্পর্ককে গুছিয়ে বলার চেষ্টায়। ফলে মাঝেমধ্যে মূল রহস্যের চেয়ে কে কার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, সেটি বোঝাতেই বেশি মনোযোগ দিতে হয়। তারপরও রহস্যের মূল প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত আগ্রহ ধরে রাখতে পারে। নির্মাতারা একাধিক সন্দেহভাজন ও ভুয়া সূত্র ব্যবহার করেছেন, যা দর্শককে শেষ পর্যন্ত অনুমান করতে বাধ্য করে। যদিও কয়েকটি মোড় আগে থেকেই আন্দাজ করা যায়, তবে রহস্যের প্রতি আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।

‘সামার ’৩৬’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

১৯৩৬ সালের সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটও সিরিজটির একটি বড় শক্তি। শ্রমজীবী ও অভিজাত শ্রেণির দ্বন্দ্ব এখানে শুধু পটভূমি নয়, চরিত্রগুলোর সম্পর্ক ও সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করেছে। তবে এদিকটিকে আরও গভীরভাবে দেখানোর সুযোগ ছিল। শুরুর কয়েকটি পর্বে একই ধরনের পোশাক ও উপস্থাপনার কারণে কয়েকজন নারী চরিত্রকে আলাদা করে চিনতে কিছুটা সময় লাগে। পাশাপাশি মধ্যভাগে গল্পের গতি কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে, যা রহস্যের টান কিছুটা কমিয়ে দেয়। ছয় পর্বের একটি মিনি সিরিজ হিসেবে চিত্রনাট্য আরেকটু সংক্ষিপ্ত ও আঁটসাঁট হলে সিরিজটি আরও ভালো হতে পারত।

সব মিলিয়ে ‘সামার ’৩৬’ একদম নিখুঁত কোনো মার্ডার মিস্ট্রি নয়। ১৯৩৬ সালের ফ্রান্সের সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট, চারটি ভিন্ন জীবনের গল্প এবং যত্ন নিয়ে তৈরি পিরিয়ড আবহ সিরিজটিকে আলাদা করে। এটি শুধু খুনিকে খুঁজে বের করার গল্প নয়; বরং বদলে যেতে থাকা এক সমাজেরও গল্প। চিত্রনাট্যের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও ইউরোপীয় পিরিয়ড মিস্ট্রি ঘরানার দর্শকদের জন্য ‘সামার ’৩৬’ দেখার মতো একটি সিরিজ।

‘সামার ’৩৬’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি