কুখ্যাত সেই মাদকসম্রাটকে নিয়ে সিনেমা, মুক্তির পরই ৭১টি দেশে শীর্ষে
মেক্সিকোর কুখ্যাত মাদকসম্রাট হোয়াকিন ‘এল চ্যাপো’ গুজমানকে কেন্দ্র করে নতুন ক্রাইম থ্রিলার ‘ফেসিং এল চ্যাপো’। ২১ আগস্ট নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটি দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে। মুক্তির কয়েক দিনের মধ্যেই ৭১টি দেশে নেটফ্লিক্সের শীর্ষে উঠে এসেছে ছবিটি। বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে তৈরি এ সিনেমায় এমন এক রাতের গল্প তুলে ধরা হয়েছে, যখন দায়িত্বের শেষ মুহূর্তে থাকা দুই পুলিশ কর্মকর্তা বিশ্বখ্যাত মাদকসম্রাটের মুখোমুখি হন।
নেটফ্লিক্সে এখন অপরাধ, মাদক কারবার এবং কার্টেলকেন্দ্রিক গল্পের কোনো অভাব নেই। ‘নারকোস’, ‘এল চ্যাপো’ থেকে শুরু করে একের পর এক ডকুমেন্টারি ও ফিকশন—লাতিন আমেরিকার মাদকজগৎ বরাবরই দর্শকদের কৌতূহলের বিষয়। সে তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে মেক্সিকোর নতুন সিনেমা ‘ফেসিং এল চ্যাপো’।
তবে এ ছবির গল্পে শুধু মাদক কারবার নেই; এতে রয়েছে ভয়, ক্ষমতা, ঘুষের প্রলোভন, পুলিশের দায়িত্ববোধ এবং কয়েক মিনিটের একটি সিদ্ধান্ত কীভাবে মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন।
নেটফ্লিক্সের ভাষায়, এটি সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত একটি ক্রাইম ড্রামা। গল্পের কেন্দ্রে দুই মেক্সিকান পুলিশ কর্মকর্তা, যাঁরা এক দুর্ধর্ষ কার্টেল নেতার মুখোমুখি হওয়ার পর নিজেদের শিফটের শেষ কয়েক ঘণ্টাকে জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সময়ে পরিণত হতে দেখেন।
গল্পের শুরু একটি সাধারণ ট্রাফিক স্টপে
ভাবুন, দায়িত্ব শেষ হতে আর বেশি সময় নেই। নিয়মিত টহল দিচ্ছেন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। হঠাৎ একটি চুরি যাওয়া গাড়ি চোখে পড়ে। তাঁরা গাড়িটি থামান। এ পর্যন্ত ঘটনাটি একেবারেই স্বাভাবিক।
কিন্তু গাড়ির ভেতরে যে মানুষ আছেন, তাঁর পরিচয় জানার পর পুরো পরিস্থিতি বদলে যায়। তিনি হোয়াকিন ‘এল চ্যাপো’ গুজমান, মেক্সিকোর ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর মাদকসম্রাট এবং সিনালোয়া কার্টেলের কুখ্যাত নেতা। এরপর দুই পুলিশ কর্মকর্তার সামনে তৈরি হয় অসম্ভব এক সিদ্ধান্ত। তাঁরা কি এল চ্যাপোকে গ্রেপ্তার করবেন, নাকি বিপুল অর্থের বিনিময়ে তাঁকে ছেড়ে দেবেন?
নেটফ্লিক্সের বর্ণনায়, দুই কর্মকর্তাকে এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়, যেখানে এল চ্যাপোকে আটক করা মানে শুধু একজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা নয়; নিজেদের জীবনকেও বিপদের মুখে ফেলা। অন্যদিকে কার্টেল নেতার দেওয়া কোটি টাকার প্রস্তাব তাঁদের সামনে খুলে দেয় সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পথ। এ দ্বিধাই ছবির উত্তেজনার অন্যতম মূল জায়গা।
বাস্তব ঘটনা থেকে গল্প
‘ফেসিং এল চ্যাপো’ বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত একটি ফিকশনাল থ্রিলার। সিনেমাটি মেক্সিকোর সাংবাদিক হেক্টর দে মাওলেওঁর একটি ক্রনিকল অবলম্বনে নির্মিত। চিত্রনাট্য লিখেছেন বের্নার্দো এসকিনকা। পরিচালক চাভা কার্তাস। গল্পের পটভূমি ২০১৬ সালে এল চ্যাপোর পুনরায় গ্রেপ্তারের ঘটনা।
এর আগে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন গুজমান। ১৯৯৩ সালে গুয়েতেমালায় গ্রেপ্তার হয়ে মেক্সিকোয় প্রত্যর্পিত হন। ২০০১ সালে কারাগার থেকে পালিয়ে যান। ২০১৪ সালে আবার গ্রেপ্তার হন। এরপর ২০১৫ সালে মেক্সিকোর সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগার থেকে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা তাঁকে আরও কিংবদন্তিতুল্য করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে আবার গ্রেপ্তার হন তিনি। ২০১৭ সালে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয়।
‘ফেসিং এল চ্যাপো’ সেই শেষ গ্রেপ্তারের ঘটনাকেই নাটকীয়ভাবে পর্দায় তুলে ধরে।
কে ছিলেন এল চ্যাপো
হোয়াকিন আর্চিবালদো গুজমান লোয়েরা, বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘এল চ্যাপো’ নামে। মেক্সিকোর সিনালোয়া কার্টেলের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন তিনি। মাদক পাচারের বিশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কোকেন, হেরোইন, মেথামফেটামিনসহ বিভিন্ন মাদক বিশ্বের নানা দেশে পাচারের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছে। তাঁর জীবন যেন হলিউডের কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য। গ্রেপ্তার হয়েছেন, কারাগারে গেছেন, আবার পালিয়েছেন।
২০০১ সালে কারাগার থেকে পালানোর পর গুজমানের নাম আরও ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৫ সালের পালানোর ঘটনাটি তো প্রায় অবিশ্বাস্য। কারাগারের কক্ষ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ খুঁড়ে পালিয়ে যান তিনি। এ কারণেই ২০১৬ সালে তাঁর পুনরায় গ্রেপ্তার ছিল মেক্সিকোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
সিনেমায় দুই পুলিশ
ছবির গল্পের কেন্দ্র এল চ্যাপো হলেও নায়ক আসলে দুই পুলিশ কর্মকর্তা—কারমোনা ও রোসালেস।
কারমোনা চরিত্রে অভিনয় করেছেন আলফোনসো হেরেরা এবং রোসালেসের চরিত্রে নোয়ে হার্নান্দেজ। এল চ্যাপোর ভূমিকায় রয়েছেন হেক্টর কোতসিফাকিস। আলফোনসো হেরেরাকে নেটফ্লিক্স দর্শকেরা ‘ওজার্ক’-এর জাভি এলিজোনদ্রো চরিত্রে দেখেছেন। ‘সেন্স৮’ ও ‘রেবেল মুন’-এর মতো কাজেও অভিনয় করেছেন তিনি।
অন্যদিকে নোয়ে হার্নান্দেজের ঝুলিতেও রয়েছে মাদক কার্টেল ও অপরাধজগতের গল্প। ‘নারকোস: মেক্সিকো’, ‘বার্দো’ ও ‘প্রিজন সেল ২১১’-এর মতো কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
ফলে মেক্সিকোর অপরাধজগতের আবহে দুজনের অভিনয় ছবিটির বাস্তবতাকে আরও জোরালো করেছে।
‘এল চ্যাপো’ চরিত্রে হেক্টর কোতসিফাকিস
এল চ্যাপোর চরিত্রে হেক্টর কোতসিফাকিসের উপস্থিতি ছবির অন্যতম আকর্ষণ। তাঁকে খুব বেশি সময় পর্দায় দেখা না গেলেও চরিত্রটির ভয়াবহতা তৈরি হয়েছে তাঁর উপস্থিতি ও আচরণের মধ্য দিয়ে। কারণ, ছবিতে এল চ্যাপোকে শুধু একজন অপরাধী হিসেবে দেখানোর বদলে এমন একজন মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার উপস্থিতিই আশপাশের মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলে।
আর এটাই ছবির বড় শক্তি—এখানে কার্টেল যুদ্ধ বা মাদক পাচারের বিশাল সাম্রাজ্য দেখানোর চেয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির চাপকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আসল লড়াই বন্দুকের নয়, সিদ্ধান্তের
‘ফেসিং এল চ্যাপো’কে শুধু অ্যাকশন সিনেমা ভাবলে ভুল হবে। এর বড় লড়াইটি আসলে দুই পুলিশ কর্মকর্তার ভেতরে। একদিকে দায়িত্ব, অন্যদিকে জীবন। একদিকে আইন, অন্যদিকে বিপুল অর্থের প্রলোভন।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানেন, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কতটা ক্ষমতাবান। তাঁকে গ্রেপ্তার করলে পরিণতি কী হতে পারে, সেটি তিনি জানেন। আবার ছেড়ে দিলে নিজের বিবেকের কাছে কীভাবে দাঁড়াবেন, সেই প্রশ্নও রয়েছে। এ জায়গাতেই ছবিটি সাধারণ কার্টেল থ্রিলারের বাইরে চলে যায়।
কেন দর্শকের এত আগ্রহ
এল চ্যাপোর নামটি নিজেই দর্শকের আগ্রহ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। তাঁর পালানো, গ্রেপ্তার, কার্টেল সাম্রাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিচার—সব মিলিয়ে বহু বছর ধরে তিনি জনপ্রিয় সংস্কৃতির আলোচিত চরিত্র। এর আগে তাঁকে নিয়ে অসংখ্য তথ্যচিত্র, সিরিজ ও সংবাদ প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে। কিন্তু ‘ফেসিং এল চ্যাপো’ বড় কোনো সাম্রাজ্যের গল্প না বলে একটি নির্দিষ্ট রাতের গল্প বলেছে। মাত্র দুই পুলিশ কর্মকর্তার চোখ দিয়ে এল চ্যাপোর পুনরায় গ্রেপ্তারের ঘটনাকে দেখানো হয়েছে। সম্ভবত এই ‘সীমাবদ্ধতা’ই ছবিটির শক্তি।
নেটফ্লিক্সও ছবিটিকে দ্রুত দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। মুক্তির পর এটি বিশ্বের ৭১টি দেশে প্ল্যাটফর্মটির ১ নম্বর অবস্থানে উঠেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিচালকের চোখে থ্রিলার
ছবিটি পরিচালনা করেছেন মেক্সিকোর নির্মাতা চাভা কার্তাস। এর আগে ‘কাউন্টারঅ্যাটাক’-এর মতো অ্যাকশনধর্মী কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। 'ফেসিং এল চ্যাপো’তেও সে অভিজ্ঞতার ছাপ রয়েছে। তবে এখানে অ্যাকশনকে শুধু বিস্ফোরণ, গুলির লড়াই বা ধাওয়া হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি।
একটি গাড়ি থামানো, কয়েকজন মানুষের কথোপকথন, হঠাৎ তৈরি হওয়া নীরবতা—এসব ছোট মুহূর্তকেও উত্তেজনার অংশ করে তুলেছেন নির্মাতা।
ফলে দর্শক জানেন, বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক কখন ঘটবে, সেটিই হয়ে ওঠে প্রশ্ন।
এল চ্যাপোর গল্পের আরেক অধ্যায়
এল চ্যাপোর জীবন নিয়ে দর্শকের আগ্রহ এখানেই শেষ নয়। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের পর তাঁর বিচার শুরু হয়। ২০১৯ সালে তিনি মাদক পাচার, অর্থ পাচার ও সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। পরে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সঙ্গে আরও ৩০ বছরের সাজা দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর অত্যন্ত সুরক্ষিত এডিএক্স ফ্লোরেন্স কারাগারে সাজা খাটছেন।
নেটফ্লিক্স ডটকম, আইএমডিবি ও স্ক্রিন র্যান্ট অবলম্বনে