বিয়ের আগে প্রেমিকার ‘গোপন অতীত’ সামনে এলে কী হয়

‘দ্য ড্রামা’ সিনেমায় জেনডায়া ও রবার্ট প্যাটিনসন। আইএমডিবি

(লেখাটিতে স্পয়লার আছে)

বিয়ের আগে বাগ্‌দত্তাকে নিজের অতীত কতটা জানানো উচিত? অনেকেই ভাবেন, এমন বিষয়গুলো সাধারণত বিয়ের আগমুহূর্তে এড়িয়ে যাওয়াই ভালো, পরে হয়তো সময় বুঝে বলা যাবে। কিন্তু যাঁরা ভাবেন ‘অতীত’ হয়তো খুব বড় কিছু নয়, সহজেই ঢেকে ফেলা যাবে; বাস্তবে সেটা না–ও হতে পারে। এমন গল্প নিয়েই ক্রিস্টোফার বোরগলির রোমান্টিক ড্রামা সিনেমা ‘দ্য ড্রামা’। আপাতদৃষ্টিতে রোমান্টিক সিনেমা মনে হলেও ভেতরে রয়েছে এমন এক মোচড়, যা নিয়ে মুক্তির আগেই শুরু হয়েছিল তুমুল বিতর্ক। ৫ মে ওটিটিতে মুক্তির পর সেই বিতর্ক আরও ডালপালা মেলেছে। কিন্তু কী এমন আছে এই সিনেমায়, যা নিয়ে এত বিতর্ক?

একনজরে সিনেমা: ‘দ্য ড্রামা’ ধরন: রোমান্টিক–কমেডি পরিচালনা: ক্রিস্টোফার বোরগলি অভিনয়: রবার্ট প্যাটিনসন, জেনডায়া স্ট্রিমিং: প্রাইম ভিডিও (রেন্ট) দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট

গল্পটা চার্লি (রবার্ট প্যাটিনসন) আর এমার (জেনডায়া)। এলোমেলো চুলের, চশমাধারী ব্রিটিশ তরুণ চার্লি আর্ট ইতিহাসবিদ। থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। একদিন কফিশপে দেখা হয় দারুণ সুন্দরী এমার সঙ্গে। শুরুর দৃশ্যটা আর দশটা প্রেমের সিনেমার মতোই—চার্লি এমাকে পটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এমা পাত্তা নেয় না। চার্লি একটু লজ্জাই পায়। পরে বুঝতে পারে এমার আসলে এক কানে বধির, তাঁর কথাবার্তা কিছুই শুনতে পায়নি। এরপর পরিচয়, দ্রুতই সেটা ঘনিষ্ঠতায় রূপ নেয়। তবে ঘটনা যে শেষ পর্যন্ত অন্য কিছুতে গড়াবে, সেটা শুরুর দৃশ্যেই বুঝিয়ে দেন নির্মাতা; রোমান্টিক কমেডির মধ্যে এক অশুভ ইঙ্গিত ঢুকিয়ে। দৃশ্যটির সাউন্ড ডিজাইন অদ্ভুত ও অস্বস্তিকর, পরিবেশ যেন থমথমে, ক্যামেরা ক্লোজআপে অস্বস্তিকরভাবে ভেসে ওঠে, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকে অস্বাভাবিক কাঠের বাঁশির সুর।

‘দ্য ড্রামা’ সিনেমায় রবার্ট প্যাটিনসন ও জেনডায়া। আইএমডিবি

বিয়ের আগে চার্লি ও এমা তাদের বন্ধু র‍্যাচেল (আলানা হাইম) আর মাইকের (মামুদু আথি) সঙ্গে ডিনারে যায়। এখানেই ছবিটি ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে যায়। কারণ, একপর্যায়ে শুরু হয় নতুন এক চ্যালেঞ্জ—যেখানে সবাইকে নিজের জীবনের সবচেয়ে খারাপ কাজটি স্বীকার করতে হবে!

একপর্যায়ে এমা জানায়, ১৪ বছর বয়সে সে একটি স্কুলে গুলি চালানোর পরিকল্পনা করেছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত তা করতে পারেনি। আর তার কানের আংশিক বধিরতা শিশুকালে সংক্রমণের কারণে নয়, বরং বাবার রাইফেল খুব কাছে এনে অনুশীলন করার সময় হওয়া আঘাতের ফল!

আরও পড়ুন

ক্রিস্টোফার বোরগলি এখানে এক ভয়াবহ ও নির্মম ব্যাখ্যা দেন—এমা কেন থেমে গিয়েছিল। সে যখন তার ব্যাগে লুকানো বন্দুকের দিকে হাত বাড়াচ্ছিল, তখন খবর আসে স্থানীয় শপিং মলে আরেকটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে তার এক সহপাঠী নিহত হয়। ফলে তার পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। পরে আর এমা এগোয়নি।

এমার আশা ছিল, সবাই এই ভয়ংকর স্বীকারোক্তি ভুলে যাবে বা মেনে নেবে যে সে এখন পুরোপুরি স্বাভাবিক। কিন্তু সবাই গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়ে। তারা যা শুনেছে, তা আর ভুলতে পারে না। চার্লির অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। সে বুঝতে পারে তাদের আদর্শ সম্পর্ক ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। চার্লির ধীরে ধীরে সন্দেহ করতে শুরু করে এমার ভেতরের সহিংস প্রবণতা আবার ফিরে আসতে পারে কি না।

ছবিটি যেন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সাংস্কৃতিক বাস্তবতার এক অস্বস্তিকর মিশ্রণ—হলিউডের বিয়েকেন্দ্রিক রোমান্টিক কমেডি এবং স্কুল শুটিংয়ের ভয়াবহ বাস্তবতা। ছবির বড় শক্তি হলো এর ঘরানার অস্পষ্টতা—এটি কি ব্যঙ্গ, নাকি থ্রিলার? ছবির মেজাজ সব সময় পরিষ্কার নয়। এমার স্বীকারোক্তি যদি সত্যি ধরে নেওয়া হয়, তবে এটি এক ভয়াবহ ব্ল্যাক কমেডি। নির্মাতা স্পষ্টই ইঙ্গিত দেন—সমাজে এমন অনেক মানুষ থাকতে পারে, যারা একসময় ভয়াবহ অপরাধ করতে চেয়েছিল, কিন্তু পরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছে।
‘দ্য ড্রামা’কে অস্বস্তিকর কমেডি বলা যায়। যার কেন্দ্রে আছে বিয়েসংক্রান্ত আতঙ্ক।

‘দ্য ড্রামা’র দৃশ্য। আইএমডিবি

এখানে রবার্ট প্যাটিনসন দারুণ। ডেনিস হপার যেমন ‘অ্যাপোক্যালিপস নাউ’-এ কাঁপতেন, কিংবা নিকোলাস কেজ ‘ভ্যাম্পায়ার কিস’-এ যেভাবে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তেন, প্যাটিনসন তারও চেয়েও কাঁপছেন। কিন্তু সমস্যা হলো তিনি এখানে একজন স্বাভাবিক মানুষের চরিত্রে অভিনয় করছেন। এমা চরিত্রে জেনডায়াও মন্দ নন, তবে তাঁর চরিত্রটি একমাত্রিক। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি এর চেয়ে অনেক জটিল চরিত্রে অভিনয় করেছেন।

ক্রিস্টোফার বোরগলির আগের কাজ ‘সিক অব মাইসেলফ’ ছিল বডি-হরর ও মিডিয়া নার্সিসিজম ব্যঙ্গ, ‘ড্রিম সিনারিও’তে ছিল নিকোলাস কেজের অদ্ভুত কমেডি। বোরগলির কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হাইপার-রিয়েলিস্টিক লাইটিং আর ফার্স্ট কাট; যেন কিছু বিশাল কিছু ঘটছে। উদ্দেশ্য একটাই, একধরনের অস্বস্তি তৈরি করা। ফলে তাঁর সিনেমা দেখতে গিয়ে বারবার নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়—হাসব, নাকি আতঙ্কিত হব?

‘দ্য ড্রামা’র দৃশ্য। আইএমডিবি

‘দ্য ড্রামা’ মোটের ওপর চিত্তাকর্ষক সিনেমা, তবে কিছু দুর্বলতাও আছে। স্কুলে গুলি চালাতে গিয়ে আরেকটি ঘটনার কথা শুনে ফিরে এসেছে, সেটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। তবে এরপর চরিত্ররা যেভাবে বদলে যেতে শুরু করে, সেদিকে আর মনোযোগ থাকে না। এখানেই বোরগলির সাফল্য। ছবিটি মূলত চার্লির মানসিকভাবে ভেঙে পড়া নিয়েই কাজ করে; এটাই আসল গল্প।

‘দ্য ড্রামা’ অস্বস্তিকর, অদ্ভুত, কখনো হাস্যকর, আবার কখনো বিরক্তিকর—তবু চোখ সরানো যায় না।