যৌনতা থেকে নানা বিতর্ক, শেষ বারের মতো ফিরছে হইচই ফেলে দেওয়া সেই সিরিজ

‘ইউফোরিয়া ৩’–এর প্রিমিয়ারের জেনডায়া, সিডনি সুইনি, আনা ভ্যান প্যাটেন ও হান্টার শেফার। কোলাজ

চার বছরের অপেক্ষার পর আবারও ফিরেছে হলিউডের সেই সিরিজ, যা তরুণসমাজ, ট্রমা, আসক্তি ও জটিল সম্পর্কের গল্পকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে; ‘ইউফোরিয়া’। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই সিরিজ কেবল টিনএজারদের জীবন নিয়ে গল্প বলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি সামাজিক সমস্যা, যৌনতা, মাদক, মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলোকে সাবলীলভাবে এবং কখনো কখনো বিতর্কিতভাবে উপস্থাপন করেছে। ১২ এপ্রিল এইচবিওতে শুরু হবে সিরিজটির তৃতীয় ও শেষ মৌসুম। দেখার আগে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক ‘ইউফোরিয়া’র দুনিয়ায়।

‘ইউফোরিয়া’র জনপ্রিয়তার এক বড় কারণ হলো তার বিতর্কিত বিষয়বস্তু। সিরিজটি যৌনতা, মাদক সেবন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং তরুণদের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্রকে খুবই সরাসরি দেখিয়েছে। প্রিমিয়ার ও ট্রেলার প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা দেখা গেছে। কেউ প্রশংসা করেছেন, ‘এটি সত্যি জীবনকে প্রতিফলিত করে’ বলে। আবার কেউ বলেছেন, এটি অতিরঞ্জিত এবং বিপজ্জনক প্রভাব ফেলতে পারে।

গল্পের গভীরে
তৃতীয় মৌসুমের গল্প শুরু হবে আগের ঘটনার পাঁচ বছর পরে। ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই দর্শকদের উত্তেজনা তুঙ্গে। কারণ, এবার গল্প এগোচ্ছে একেবারে নতুন পর্বে, যেখানে কিশোর বয়স পেরিয়ে চরিত্রগুলো প্রবেশ করছে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে।
ট্রেলারে দেখা যায়, স্কুলজীবনের সীমা ছাড়িয়ে চরিত্রগুলো এখন জীবনের জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। প্রেম, বন্ধুত্ব, মাদকাসক্তি আর মানসিক টানাপোড়েন—সবকিছুই এবার আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। নির্মাতাদের ভাষ্য, এই সিজনে থাকবে আরও বেশি নাটকীয়তা, বিশ্বাসঘাতকতা ও অন্ধকার বাস্তবতা।

সিরিজটির কেন্দ্রীয় চরিত্র রু, যার ভূমিকায় আছেন জেনডায়া। নতুন ট্রেলারে দেখা যায়, আগের সিজনের মতোই রু আবারও বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মাদক ব্যবসায়ী লরির সঙ্গে তার সংঘাত আরও জটিল আকার নিয়েছে। শুধু তা–ই নয়, এবার ‘আলামো’ নামের এক নতুন হুমকির কথাও উঠে এসেছে, যে রুকে হত্যা করতে চায়। ট্রেলারের শুরুতেই দেখা যায়, রুকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার কর্মকর্তারা। পরে তাকে মেক্সিকোতে সন্দেহজনক কিছু গিলতে বাধ্য করার দৃশ্যও দর্শকদের চমকে দিয়েছে। একপর্যায়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে বলে, ‘তুমি খারাপ পরিস্থিতিতে আটকে পড়া এক ভালো মেয়ে।’

এদিকে ‘ক্যাসি’ চরিত্রে থাকা সিডনি সুইনিকে দেখা যায় একেবারে ভিন্ন ভূমিকায়। তিনি এখন প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট নির্মাতা এবং বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছেন নেটের সঙ্গে, যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন জ্যাকব এলর্ডি। তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েনের ইঙ্গিতও মিলেছে ট্রেলারে। নির্মাতা স্যাম লেভিনসনের ভাষায়, তাদের বিয়ে দর্শকদের জন্য ‘অবিস্মরণীয়’ হতে যাচ্ছে।

চমকপ্রদ একটি মোড় আসে যখন ক্যাসির সাবেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ‘ম্যাডি’ তার জীবনে ফিরে আসে। শুধু ফিরে আসাই নয়, তাকে সাহায্য করতেও দেখা যায় নতুন কাজে। অন্যদিকে ‘জুলস’ চরিত্রে হান্টার শেফারকে দেখা যাচ্ছে আর্ট স্কুলে নিজের জায়গা করে নেওয়ার লড়াইয়ে। পাশাপাশি ‘সুগার বেবি’ হিসেবে বয়স্ক পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্কেও জড়িয়ে পড়তে দেখা যায় তাকে।

‘ইউফোরিয়া ৩’–এর দৃশ্য। ছবি: এইচবিও

নির্মাতা স্যাম লেভিনসন আগেই জানিয়েছেন, পাঁচ বছর সময়ের ব্যবধান গল্পকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাঁর মতে, ‘এই সময়টিই স্বাভাবিক মনে হয়েছে, কারণ তারা যদি কলেজে যেত, তবে এই সময়ের মধ্যে কলেজ শেষ করে ফেলত।’ তিনি আরও জানান, ক্যাসি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত এবং অন্যদের ‘বড় জীবন’ দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ে। আর ‘লেক্সি’, যার ভূমিকায় আছেন মড অ্যাপাটাও, তাকে দেখা যাবে এক শোরানারের সহকারী হিসেবে, যে চরিত্রে অভিনয় করছেন শ্যারন স্টোন।
এই সিজনে মোট আটটি পর্ব থাকবে, যার শেষ পর্ব প্রচারিত হবে ৩১ মে। পুরোনো প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রই ফিরছে এই সিজনে। জেনডায়া, হান্টার শেফার, জ্যাকব এলর্ডি, সিডনি সুইনি, ‘ম্যাডি’ চরিত্রে অ্যালেক্সা ডেমি, ‘লেক্সি’ চরিত্রে মড অ্যাপাটাও—সবাই রয়েছেন। এ ছাড়া নতুন করে যুক্ত হয়েছেন প্রায় ২০ জন অভিনেতা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গায়িকা রোজালিয়া ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ট্রিশা পেটাস।

তবে কিছু পরিচিত মুখ আর থাকছে না। রুর বোনের চরিত্রে অভিনয় করা স্টর্ম রিড আগেই জানিয়েছিলেন, তিনি ফিরছেন না। একইভাবে অস্টিন অ্যাব্রামস, অ্যালজি স্মিথ এবং ‘ক্যাট’ চরিত্রে অভিনয় করা বার্বি ফেরেইরাও এই সিজনে অনুপস্থিত।

‘ইউফোরিয়া ৩’–এর প্রিমিয়ারে জেনডায়া। এএফপি

বিতর্কের কারণ
‘ইউফোরিয়া’র জনপ্রিয়তার এক বড় কারণ হলো তার বিতর্কিত বিষয়বস্তু। সিরিজটি যৌনতা, মাদক সেবন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং তরুণদের জীবনযাত্রার বাস্তব চিত্রকে খুবই সরাসরি দেখিয়েছে। প্রিমিয়ার ও ট্রেলার প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা দেখা গেছে। কেউ প্রশংসা করেছেন, ‘এটি সত্যি জীবনকে প্রতিফলিত করে’ বলে। আবার কেউ বলেছেন, এটি অতিরঞ্জিত এবং বিপজ্জনক প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রিমিয়ারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জেনডায়া। সিরিজটির প্রথম দুই মৌসুম থেকেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন অন্যতম বড় আকর্ষণ, আর এই সময়ের মধ্যে তার ক্যারিয়ার ছুঁয়েছে নতুন উচ্চতা। ‘ডিউন’, ‘স্পাইডার-ম্যান’, ‘চ্যালেঞ্জারস’ কিংবা ‘দ্য ড্রামা’—একটির পর একটি বড় প্রজেক্টে কাজ করে তিনি এখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া এক তারকা। তৃতীয় মৌসুমে তিনি আবার ফিরেছেন ‘রু’ চরিত্রে, যে এবার আরও জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি—এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে বিপদে জড়িয়ে পড়েছে তার জীবন।

তৃতীয় মৌসুমে এই বিতর্ক আরও গাঢ় হয়েছে। ‘ক্যাসি’র প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট নির্মাতা হওয়া এবং তার পুরোনো বন্ধু ‘ম্যাডি’র সঙ্গে তার পুনর্মিলন যৌনতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে। এ ধরনের বিষয়গুলো যুবসমাজের কাছে উদ্বেগ ও আগ্রহ উভয়ই সৃষ্টি করে, যা সিরিজকে শুধু বিনোদন নয়, চিন্তার ক্ষেত্রও করে তুলেছে।

‘ইউফোরিয়া ৩’–এর প্রিমিয়ারে সিডনি সুইনি। এএফপি

গল্প বলার অনন্য ধরন ও স্যাম লেভিসনের নির্মাণশৈলী এটিকে অন্য সিরিজ থেকে আলাদা করেছে। চিত্রনাট্য, সিনেমাটোগ্রাফি, কস্টিউম ডিজাইন ও সংগীত—সবকিছুই একত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা তৈরি করে। প্রতিটি দৃশ্য যেন চরিত্রগুলোর মানসিক অবস্থা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে। এই অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি সিরিজটিকে কেবল একবার দেখার জন্য নয়, বহুবার বিশ্লেষণ করার জন্যও প্রলুব্ধ করে।

আরও পড়ুন

সামাজিক প্রভাব ‘ইউফোরিয়া’ শুধুই বিনোদন নয়, বরং সামাজিক প্রভাবও ফেলেছে। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য, আসক্তি, যৌনতা ও সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক স্কুল, কলেজ ও অনলাইন কমিউনিটিতে সিরিজটির চরিত্র ও পরিস্থিতি নিয়ে চর্চা হচ্ছে। এটি একদিকে যেমন শিক্ষামূলক, অন্যদিকে বিতর্কও সৃষ্টি করছে, যা তরুণ দর্শক ও অভিভাবকদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া জাগিয়েছে।

তবে বিতর্কিত বিষয়গুলো সিরিজটিকে কেবল সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না। বরং এটি দর্শকদের জন্য বাস্তবতা এবং চরিত্রগুলোর মানসিক জটিলতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ তৈরি করে। এভাবে সিরিজটি বিনোদন ও সামাজিক সচেতনতা উভয়ই বহন করে।

‘ইউফোরিয়া ৩’–এর প্রিমিয়ারে অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতা। এএফপি

প্রিমিয়ারে পুনর্মিলন
মুক্তির আগে আয়োজন করা হয়েছিল সিরিজটির বিশেষ প্রদর্শনীর। যেখানে একত্র হন অভিনয়শিল্পী, যা ভক্তদের কাছে দারুণ এক পুনর্মিলনী।

প্রিমিয়ারের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জেনডায়া। সিরিজটির প্রথম দুই মৌসুম থেকেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন অন্যতম বড় আকর্ষণ, আর এই সময়ের মধ্যে তার ক্যারিয়ার ছুঁয়েছে নতুন উচ্চতা। ‘ডিউন’, ‘স্পাইডার-ম্যান’, ‘চ্যালেঞ্জারস’ কিংবা ‘দ্য ড্রামা’—একটির পর একটি বড় প্রজেক্টে কাজ করে তিনি এখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া এক তারকা। তৃতীয় মৌসুমে তিনি আবার ফিরেছেন ‘রু’ চরিত্রে, যে এবার আরও জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি—এক মাদক ব্যবসায়ীর কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে বিপদে জড়িয়ে পড়েছে তার জীবন।

শুধু জেনডায়াই নন, এই সিরিজ থেকেই আলোচনায় উঠে আসা আরও অনেক তারকা এখন হলিউডের প্রথম সারিতে। সিডনি সুইনি, যিনি ‘ক্যাসি’ চরিত্রে অভিনয় করছেন—এই সময়ের মধ্যে একাধিক সিনেমায় অভিনয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নতুন সিজনে তাঁর চরিত্র আরও ভিন্ন মোড় নিয়েছে। তিনি এখন প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট নির্মাতা। অন্যদিকে জ্যাকব এলার্দির ক্যারিয়ারও উড়ান দিয়েছে। তিনি সম্প্রতি ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য অস্কার মনোনয়ন পেয়েছেন এবং বিভিন্ন আলোচিত প্রজেক্টে কাজ করেছেন।

এই প্রিমিয়ারে উপস্থিত ছিলেন সিরিজটির নির্মাতা স্যাম লেভিনসন। তিনি জানিয়েছেন, চতুর্থ মৌসুমের কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই। তাঁর ভাষায়, যদি নতুন কোনো আইডিয়া আসে, তখন ভাবা যাবে। অর্থাৎ তৃতীয় সিজনই হতে পারে এই জনপ্রিয় সিরিজের শেষ অধ্যায়।

বিবিসি ও পিপলডটকম অবলম্বনে