অফিসে কি প্রেম করা উচিত
নেটফ্লিক্সের বৈশ্বিক দর্শক তালিকায় এখন শীর্ষে একটি রোমান্টিক কমেডি। নাম ‘অফিস রোমান্স’। মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই ছবিটি প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ ঘণ্টা দেখা হয়েছে, যা ভিউ হিসেবে প্রায় ২ কোটি ৯ লাখের সমান। ফলে এটি সহজেই নেটফ্লিক্সের সাপ্তাহিক চলচ্চিত্র তালিকার এক নম্বরে উঠে এসেছে।
বলিউড কিংবা হলিউড—দুই ইন্ডাস্ট্রিতেই অফিসভিত্তিক প্রেমের গল্প নতুন নয়। কিন্তু অফিস রোমান্স আলোচনায় এসেছে এর তারকাবহুল অভিনয়শিল্পী, সাহসী উপস্থাপনা ও কর্মক্ষেত্রে প্রেম নিয়ে সমসাময়িক বিতর্ককে ঘিরে।
ছবিটি মুক্তির পর জেনিফার লোপেজ ও ব্রেট গোল্ডস্টেইনের সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়ায়। কারণ পর্দায় তাঁদের রসায়ন অনেক দর্শকের কাছে বাস্তব মনে হয়েছে।
তবে দুই তারকাই স্পষ্ট করেছেন যে তাঁরা কেবল সহশিল্পী। জেনিফার লোপেজ এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি বলেছেন, তাঁদের মধ্যে কোনো প্রেমের সম্পর্ক নেই।
গল্পের কেন্দ্রে জেনিফার লোপেজ
ছবিতে জেনিফার লোপেজ অভিনয় করেছেন জ্যাকি ক্রুজ নামের এক শক্তিশালী এয়ারলাইন কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর চরিত্রে। জ্যাকি কঠোর নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। কর্মীদের মধ্যে প্রেম বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিরুদ্ধে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান।
কিন্তু সেই নিয়মই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যখন কোম্পানিতে যোগ দেন নতুন আইন উপদেষ্টা ড্যানিয়েল ব্ল্যাঞ্চফ্লাওয়ার। চরিত্রটিতে অভিনয় করেছেন ব্রেট গোল্টস্টেইন। দুজনের মধ্যে ধীরে ধীরে তৈরি হয় আকর্ষণ, আর সেখান থেকেই শুরু হয় গল্পের মূল দ্বন্দ্ব।
জ্যাকি এমন একজন নারী, যাঁকে অফিসে সবাই সমীহ করে। কর্মীরা তাঁকে নাম ধরে ডাকে না; সবার কাছে তিনি ‘মিস ক্রুজ’। তাঁর নেতৃত্বে এয়ার ক্রুজ নামের প্রতিষ্ঠানটি বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে।
তবু জ্যাকির জীবনে স্বস্তি নেই। কারণ, প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও তাঁর বাবা ক্যাপ্টেন জ্যাক ক্রুজ এখনো পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন। বোর্ড মিটিংয়ে মেয়েকে বিব্রত করা, ছোটবেলার ডাকনামে ডাকা কিংবা তাঁর কর্তৃত্বকে খাটো করে দেখা—এসব যেন বাবার নিত্যদিনের অভ্যাস।
এর মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বী একটি বিমান সংস্থা এয়ার ক্রুজের বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে সুযোগ পেতে জ্যাকি অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। অভিযোগের মধ্যে লুকিয়ে আছে নারী নেতৃত্বকে খাটো করে দেখার মানসিকতাও। এই সংকটের সময়ই গল্পে প্রবেশ করেন ড্যানিয়েল ব্ল্যাঞ্চফ্লাওয়ার। নতুন যোগ দেওয়া ব্রিটিশ আইনজীবী ড্যানিয়েলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ব্রেট গোল্ডস্টেইন। প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই তিনি জ্যাকির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। যদিও জ্যাকি বিষয়টি স্বীকার করতে চান না।
কারণ, জ্যাকির কোম্পানির সবচেয়ে কঠোর নিয়মগুলোর একটি হলো—অফিসে প্রেম নয়। কিন্তু প্রেম তো নিয়ম মেনে আসে না। কাজের সূত্রে ডোমিনিকান রিপাবলিকে একটি সফরে গিয়ে দুজনের মধ্যে দূরত্ব দ্রুত কমে আসে। অফিসের নীতিমালা, পেশাগত দায়িত্ব—সবকিছুই ধীরে ধীরে আবেগের কাছে হার মানতে শুরু করে।
প্রেম বনাম পেশা
ছবির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এখানেই। সাধারণত কর্মক্ষেত্রের প্রেম নিয়ে নির্মিত গল্পে ক্ষমতাবান পুরুষ ও অধস্তন নারী কর্মীর সম্পর্ক দেখানো হয়। অফিস রোমান্স সেই চেনা সমীকরণ উল্টে দিয়েছে। এখানে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে একজন নারী। আর সম্পর্কের ঝুঁকিও শেষ পর্যন্ত তাঁকেই বেশি বহন করতে হয়।
ড্যানিয়েল চাইলে চাকরি ছেড়ে চলে যেতে পারেন না। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের দায়বদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে জ্যাকির জন্য সম্পর্কটি শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি তাঁর নেতৃত্ব, বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে যায়। ছবিটি সূক্ষ্মভাবে দেখায়, কর্মক্ষেত্রে প্রেমের ক্ষেত্রে ক্ষমতার প্রশ্নটি কতটা জটিল।
‘টেড ল্যাসো’ তারকার কলমে প্রেমের গল্প
ব্রেট গোল্ডস্টেইন শুধু ছবির নায়ক নন, তিনি ছবিটির সহলেখকও। তাঁর সঙ্গে চিত্রনাট্য লিখেছেন জো কেলি। পরিচালনা করেছেন ওল পার্কার, যিনি আগে ‘মামা মিয়া! হেয়ার উই গো অ্যাগেইন’, ‘টিকিট টু প্যারাডাউস’ নির্মাণ করে প্রশংসা পেয়েছিলেন।
গোল্ডস্টেইনের জনপ্রিয়তা মূলত টিভি সিরিজ ‘টেড ল্যাসো’ থেকে। ফলে তাঁর প্রথম বড় রোমান্টিক কমেডিগুলোর একটি হওয়ায় ছবিটি নিয়ে আগ্রহও ছিল বেশি।
কেন এত জনপ্রিয়
নেটফ্লিক্সের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই ছবিটি ২০.৯ মিলিয়ন ভিউ অর্জন করেছে। বিশ্বের বহু দেশে এটি এক নম্বর অবস্থানে পৌঁছেছে। দর্শকদের একটি বড় অংশ জেনিফার লোপেজ ও ব্রেট গোল্ডস্টেইনের রসায়নকে জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন।
রোমান্টিক কমেডি ঘরানার সিনেমা গত কয়েক বছরে কিছুটা মন্দার মধ্য দিয়ে গেলেও অফিস রোমান্স সেই পুরোনো ‘রোম-কম’ আবহ ফিরিয়ে এনেছে বলে অনেকে মনে করছেন।
ছবির গল্প খুব জটিল নয়। শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে, সেটিও অনেকটাই অনুমেয়। তবু অফিস রোমান্স উপভোগ্য হয়ে ওঠে মূলত জেনিফার লোপেজ ও ব্রেট গোল্ডস্টেইনের রসায়নের কারণে।
জেনিফার লোপেজ বরাবরের মতোই আত্মবিশ্বাসী, গ্ল্যামারাস ও পর্দাজুড়ে উপস্থিতি জানান দেওয়া এক তারকা। অন্যদিকে ব্রেট গোল্ডস্টেইন তাঁর স্বাভাবিক হাস্যরস ও সহজাত আকর্ষণ দিয়ে চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন।
মি টু আন্দোলনের পর কর্মক্ষেত্রে সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, হয়রানি ও পেশাগত সীমারেখা নিয়ে সচেতনতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এই বাস্তবতায় অফিস রোমান্স কোনো বিতর্কিত অবস্থান নেয় না। বরং একটি সহজ প্রশ্ন তোলে—মানুষ যদি সত্যিই প্রেমে পড়ে, তাহলে সেই
অনুভূতিকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?
ছবিটি স্বীকার করে যে কর্মক্ষেত্রে সম্পর্ক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে করিয়ে দেয় যে মানুষ অনেক সময় নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রেমে পড়ে যায়।
সমালোচকেরাও বিভক্ত
তবে জনপ্রিয়তা মানেই সর্বজনীন প্রশংসা নয়। ব্রিটিশ সাময়িকী টাইম আউট ছবিটিকে মাঝারি মানের রোমান্টিক কমেডি হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, কর্মক্ষেত্রে প্রেমের বিষয়টি নিয়ে ছবিটি নতুন কিছু বলতে পারেনি, তবে প্রধান দুই অভিনেতার উপস্থিতি ছবিকে উপভোগ্য করেছে।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন দর্শক প্রতিক্রিয়ায় ছবিটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ জেনিফার লোপেজের ক্যারিশমা ও রোমান্টিক আবহের প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ চিত্রনাট্যকে অতিরিক্ত পূর্বানুমেয় ও ক্লিশে বলে সমালোচনা করেছেন।
বাস্তব জীবনেও গুঞ্জন
ছবিটি মুক্তির পর জেনিফার লোপেজ ও ব্রেট গোল্ডস্টেইনের সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়ায়। কারণ পর্দায় তাঁদের রসায়ন অনেক দর্শকের কাছে বাস্তব মনে হয়েছে।
তবে দুই তারকাই স্পষ্ট করেছেন যে তাঁরা কেবল সহশিল্পী। জেনিফার লোপেজ এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি বলেছেন, তাঁদের মধ্যে কোনো প্রেমের সম্পর্ক নেই।
কোথায় হয়েছে শুটিং
ছবিটির বেশির ভাগ শুটিং হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। অফিসের দৃশ্যগুলো ধারণ করা হয়েছে নেটফ্লিক্স স্টুডিও এবং বিভিন্ন বাস্তব অফিস ভবনে। এ ছাড়া রোমান্টিক আবহ তৈরির জন্য কিছু দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে ডোমিনিকান রিপাবলিকের সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায়।
জেনিফার লোপেজের জন্য নতুন সাফল্য
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেনিফার লোপেজের বেশ কয়েকটি সিনেমা প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি। সে কারণে অফিস রোমান্স তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাবর্তন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নেটফ্লিক্সের চার্টে শীর্ষে উঠে ছবিটি প্রমাণ করেছে, রোমান্টিক কমেডি ঘরানায় লোপেজের আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। মুক্তির মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ছবিটি বিশ্বের অন্যতম আলোচিত স্ট্রিমিং কনটেন্টে পরিণত হয়েছে।
পিপলডটকম, ভ্যারাইটি ও টাইম অবলম্বনে