রূপকথার আড়ালে নৃশংসতা! সিন্ডারেলার গল্পের ভয়ংকর সত্য
ফরাসি লেখক শার্ল পেরোর কালজয়ী রূপকথাগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ‘সিন্ডারেলা’। কয়েক প্রজন্ম ধরে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই ধ্রুপদি গল্পের অনুপ্রেরণায় ১৯৫০ সালে একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে হলিউডের বিশ্বখ্যাত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ডিজনি। মুক্তির পরপরই ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল সেই ছবি। সেই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করেই ২০১৫ সালে রুপালি পর্দায় আসে ছবিটির লাইভ-অ্যাকশন সংস্করণ।
একনজরে
সিনেমা: ‘দ্য আগলি স্টেপসিস্টার’ (ডেন স্টিগে স্টেসোয়েশতেরেন)
ধরন: ব্ল্যাক কমেডি (বডি হরর)
ভাষা: নরওয়েজিয়ান
পরিচালনা: এমিলি ব্লিকফেল্ট
অভিনয়: লিয়া মাইরেন, থিয়া সোফি লক নেস, অ্যান ডাল টর্প
স্ট্রিমিং: হুলু, অ্যামাজন প্রাইম (রেন্টাল)
দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৪৯ মিনিট
নিষ্পাপ চেহারার সেই মিষ্টি মেয়ে সিন্ডারেলাকে আমরা সবাই চিনি। কিন্তু এই চিরচেনা রূপকথার আড়ালে যে এক নিষ্ঠুর ‘গথিক’ গল্পের ছায়া লুকিয়ে আছে, তা কজনই–বা জানেন? সেই আদি ও ভয়ংকর গল্পটি সংগ্রহ করেছিলেন জার্মানির গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়। তবে ফরাসি লেখক শার্ল পেরোর পরিশীলিত বর্ণনা আর ডিজনির রুপালি পর্দার জাদু সিন্ডারেলার মূল গল্পের সেই নৃশংসতাকে মানুষের মন থেকে প্রায় মুছেই দিয়েছিল।
বিস্মৃত সেই নিষ্ঠুরতাকেই যেন ফের বড় পর্দায় ফিরিয়ে এনেছেন নরওয়েজিয়ান পরিচালক এমিলি ব্লিকফেল্ট। গত বছর মুক্তি পেয়েছে তাঁর নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য আগলি স্টেপসিস্টার’ (ডেন স্টিগে স্টেসোয়েশতেরেন)। চেনা ছকের বাইরে গিয়ে নরওয়ের সিনেমাটি দর্শককে গ্রিম ভাইদের সংগৃহীত রূপকথার সেই আদি, অস্বস্তিকর ও কদর্য জগতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্মিত এই সিনেমার গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এলভিরা (লিয়া মাইরেন), রাজ্যের আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই এক তরুণী। তার সব স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষা রাজ্যের সুদর্শন রাজপুত্রকে ঘিরে। তার জীবনে সৎবোন হিসেবে আসে অপরূপ সুন্দরী অ্যাগনেস (থিয়া সোফি লক নেস), যখন এলভিরার মা রেবেকা (অ্যান ডাল টর্প) বিয়ে করেন অ্যাগনেসের বাবাকে। কিন্তু অ্যাগনেসের বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর গল্পের মোড় ঘুরে যায়। সৎমা রেবেকার নিষ্ঠুরতায় অ্যাগনেস নিজের বাড়িতেই পরিচারিকার জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। এমন সময় ঘোষণা আসে ওই রাজ্যের রাজকুমারের সেই বহু প্রতীক্ষিত নৃত্যানুষ্ঠানের, যেখানে তিনি নিজের জীবনসঙ্গিনী বেছে নেবেন।
অনুষ্ঠানটি ছিল অ্যাগনেসের জন্য মুক্তির পথ, আর এলভিরার জন্য স্বপ্নপূরণের একমাত্র সুযোগ। কিন্তু সুন্দরী ও গুণী অ্যাগনেসের পাশে সাদামাটা এলভিরা যে পাত্তা পাবে না, তা তার মা ভালো করেই বোঝেন। এখান থেকেই শুরু হয় গল্পের ভয়ংকর পর্ব। মেয়েকে ‘সুন্দরী’ বানানোর এক অন্ধ মোহে এলভিরার মা এক নির্মম পরিকল্পনা আঁটেন। নাকের হাড় ভাঙা থেকে শুরু করে চোখের পাতায় নকল পাপড়ি সেলাই, সৌন্দর্য অর্জনের নামে এলভিরার ওপর চলতে থাকে একের পর এক যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়া। রূপকথার জাদুর বদলে এখানে জায়গা করে নেয় রক্ত, মাংস আর তীব্র কষ্টের এক বিভীষিকা।
এলভিরা চরিত্রে লিয়া মাইরেনের অভিনয় এককথায় দুর্দান্ত। এক সাধারণ লাজুক মেয়ের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে এক নিষ্ঠুর, আত্মকেন্দ্রিক সত্তার জন্ম হওয়ার এই রূপান্তর তিনি পর্দায় দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে সিনেমার চালকের আসনে বসে থাকেন এলভিরার মা রেবেকা। অ্যান ডাল টর্প এই চরিত্রে এক ভয়ংকর উচ্চাকাঙ্ক্ষী মায়ের শীতলতা ও চতুরতাকে অনবদ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর প্রতিটি চাহনি আর মাপা সংলাপ দর্শকের মেরুদণ্ডে শীতল স্রোত বইয়ে দিতে বাধ্য।
সিনেমাটির নির্মাতা এমিলি ব্লিকফেল্টের সংযমী ও বুদ্ধিদীপ্ত পরিচালনা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। তিনি শরীরী ভয়ের আশ্রয় নিয়েছেন বটে, কিন্তু তা কেবল দর্শকদের ভয়ের অনুভূতি দিতে নয়; বরং দর্শকের মনোজগৎকেও নাড়া দিতে চেয়েছেন। দ্য হলিউড রিপোর্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর এই ভাবনার পেছনের গল্প। এমিলি বলেন, ‘সিন্ডারেলা তো মাত্র একজনই হয়। বাকি আমরা সবাই তো সেই কুৎসিত সৎবোন, যে জুতায় পা ঢোকানোর জন্য আপ্রাণ লড়াই করে যাচ্ছে।’
সিনেমাজুড়ে রূপকথার নান্দনিক জগতের সমান্তরালে রয়েছে ভয়ংকর সব দৃশ্য।
বিশেষ করে অস্ত্রোপচার করে চোখের পাতায় নকল পাপড়ি লাগানো ও মাংস কাটার চাকু দিয়ে পায়ের পাতা আলাদা করে ফেলার মতো নৃশংসতা পুরো গল্পের আবহে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করে। এই বৈপরীত্যই যেন সিনেমার মূল বক্তব্যকে আরও জোরালো ও তীক্ষ্ণ করে তোলে। সিনেমার ধীরগতি শুরুতে কিছুটা একঘেয়ে লাগতে পারে, তবে গল্পের গভীরে থাকা মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনকে দর্শকের মনে ধীরে ধীরে ঘনীভূত করতে এই মন্থর গতিই সাহায্য করে।
‘দ্য আগলি স্টেপসিস্টার’ কোনোভাবেই মন ভালো করে দেওয়ার মতো সিনেমা নয়; বরং দেখা শেষে একরাশ অস্বস্তি আর প্রশ্ন জন্মাবে মনে। এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, সমাজের তৈরি করা সৌন্দর্যের মাপকাঠি কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে এবং সেই ছাঁচে নিজেকে ঢোকাতে গিয়ে মানুষ নিজের মনুষ্যত্ব কতদূর পর্যন্ত বিসর্জন দিতে পারে! যারা রূপকথার এক অচেনা, ভয়ংকর কুৎসিত রূপ দেখতে চান, তাদের জন্য এই সিনেমা এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। অসংখ্য সিনেমার ভিড়ে ব্যতিক্রমী এই সিনেমা যে আপনার ভাবনার জগতে এক গভীর ছাপ ফেলে যাবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।