‘জ্বীনের বাচ্চা’ আসছে, অভিনয় থেকে নির্মাণে ইমরান

‘জ্বীনের বাচ্চা’র দৃশ্য। ছবি: চরকির সৌজন্যে

ক্যামেরার সামনে থেকে এবার পেছনে গেলেন অভিনয়ে পরিচিত মুখ মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহর থেকে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে দেখা যাবে তাঁর নির্মাণ করা প্রথম ওয়েব কনটেন্ট ‘জ্বীনের বাচ্চা’।

‘মহানগর’-এ পুলিশ কর্মকর্তা ‘মলয়’ চরিত্রে অভিনয় করে প্রথম ওটিটি দুনিয়ায় আলোচনায় আসেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। সংযত অথচ দৃঢ় উপস্থিতি দ্রুত তাঁকে দর্শকের নজরে আনে। হইচইয়ের ‘রঙিলা কিতাব’-এ তাঁর চরিত্রের ভেতরের টানাপোড়েন ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা নজর কাড়ে। চরকির অরিজিনাল সিরিজ ফেউ-এ মার্শাল এবং ‘গুলমোহর’-এ রানা তালুকদার চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বময় চরিত্রে নিজের অবস্থান শক্ত করেন। ধারাবাহিকভাবে বৈচিত্র্যময় চরিত্রে কাজ করে হয়ে ওঠেন ওটিটির নির্ভরযোগ্য মুখ।

অভিনয় থেকে নির্মাণ—এই পরিবর্তনের পেছনে প্রেরণা কী? ইমরান বলেন, ‘কিছু গল্প আছে যেগুলো নিজের মতো করে বলতে চাই। সেই চাওয়াটাই আমাকে ক্যামেরার পেছনে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।’
প্রথম কাজের জন্য নানা গল্প নিয়ে ভেবেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ‘জ্বীনের বাচ্চা’র কাহিনিটা তাঁকে নাড়া দেয়। ‘গল্পটির ভেতরে একধরনের নিঃশব্দ ব্যথা আছে। এটাকে দৃশ্যমান না করলে দায় থেকে যেত,’ বলেন নির্মাতা।

‘জ্বীনের বাচ্চা’র দৃশ্য। ছবি: চরকির সৌজন্যে

নির্বাক ৩ দিন
নাম শুনলেই তৈরি হয় ভয় আর রহস্যের আবহ। তবে নির্মাতার দাবি, এটি মূলত মাতৃত্বের গল্প। সমাজের চাপ, কুসংস্কার, অবহেলা আর নিঃসঙ্গতার ভেতর দিয়ে এক নারীর মানসিক যাত্রা তুলে ধরা হয়েছে। ইমরান বলেন, ‘মাতৃত্বের অনুভূতি সর্বজনীন। এই জগৎ বা অন্য কোনো জগৎ—সব জগতেই মায়ের অনুভব এক। সেই অনুভূতির সঙ্গে সামাজিক অপমান আর নিঃসঙ্গতার সংঘাত দেখাতে চেয়েছি।’ গ্রামবাংলার পটভূমিতে নির্মিত হলেও এটি কেবল গ্রামীণ জীবনচিত্র নয়। বাস্তব ও অবাস্তবের সীমারেখা ইচ্ছাকৃতভাবে ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে। ‘দর্শক নিজেই ব্যাখ্যা খুঁজে নেবেন। গল্পের অর্থ একরৈখিক নয়,’ বলেন ‘মহানগর’–এর মলয়।

কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন মৌসুমী হামিদ। এখানে তিনি বাক্‌প্রতিবন্ধী ও নিঃসন্তান এক নারী। সন্তানহীনতার সামাজিক চাপ, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির অবহেলা, প্রতিবেশীদের কটূক্তি—সব মিলিয়ে চরিত্রটি হয়ে ওঠে নিঃশব্দ যন্ত্রণার প্রতীক। মৌসুমী বলেন, ‘চরিত্রটিতে আনন্দের চেয়ে বেদনা বেশি। কথা বলতে না পারার অসহায়তা আর নিঃসন্তান হওয়ার চাপ তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। তবে যখন সে নিজেকে কোনো এক শিশুর মা হিসেবে অনুভব করে, তখন তার মধ্যে জন্ম নেয় অন্য এক শক্তি।’
চরিত্রটির জন্য প্রস্তুতির অংশ হিসেবে টানা তিন দিন মৌসুমী হামিদকে সেটে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষায়, ‘শুধু চোখ আর শরীরী ভাষায় অনুভূতি প্রকাশ করা কঠিন। সেই নীরবতার অভিজ্ঞতাই চরিত্রকে সত্য করেছে।’

মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। ছবি: চরকির সৌজন্যে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ট্রেলারে দেখা যায় গ্রামে জিন তাড়ানোর আচার-অনুষ্ঠানের দৃশ্য। নির্মাতার মতে, এগুলো কেবল রহস্যের উপাদান নয়; বরং সমাজে প্রচলিত বিশ্বাস, ভয় ও অজ্ঞতার প্রতিফলন। মাতৃত্বকে কেন্দ্র করে নারীর প্রতি যে সামাজিক চাপ ও দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়, সেটিও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আরও পড়ুন

নির্মাণ দল ও প্রত্যাশা
মৌসুমী হামিদ ছাড়াও ‘জ্বীনের বাচ্চা’য় আরও অভিনয় করেছেন আজাদ আবুল কালাম, সরকার রওনক রিপন, অদ্রিজিৎ মন্ডল, আনোয়ারুল হক ও রিবন খন্দকার। তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে নাট্যমঞ্চে কাজ করে অভিনয়ের শক্ত ভিত গড়ে তুলেছেন; পাশাপাশি টেলিভিশন ও ওটিটিতেও নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। চরিত্রের গভীরতা ও গ্রামীণ বাস্তবতার টানাপোড়েন ফুটিয়ে তুলতে অভিজ্ঞ ও অভিনয়নির্ভর শিল্পীদেরই বেছে নিয়েছেন নির্মাতা।

গল্প লিখেছেন স্বাক্ষর কুন্ডু। চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা করেছেন রাজীব হোসেন।
চরকিতে সাম্প্রতিক সময়ে মৌলিক গল্পভিত্তিক কনটেন্ট ও নতুন নির্মাতাদের কাজকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় মোস্তাফিজুর নূর ইমরানের এই অভিষেককে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অভিনয়-অভিজ্ঞতা থেকে নির্মাণে ইমরানের পা রাখার এ উদ্যোগ চরকির কনটেন্ট ভান্ডারে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে—এমনটাই তাদের প্রত্যাশা।