ভুয়া গর্ভধারণ—বেবি শাওয়ার থেকে নবজাতক চুরি, পর্দায় সেই অবিশ্বাস্য গল্প
একদিকে স্বামী ও পরিবারের প্রবল চাপ, যেকোনো মূল্যে মা হতে হবে; অন্যদিকে একের পর এক গর্ভপাতের পর ভেঙে পড়া এক নারী। শেষ পর্যন্ত মা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে নিয়ে গেল এমন এক ভয়াবহ অপরাধের দিকে, যার পরিণতিতে ১৩ বছরের বেশি সময় কাটাতে হয়েছে কারাগারে।
মেক্সিকোর এ ঘটনা এখন উঠে এসেছে নেটফ্লিক্সের নতুন তথ্যচিত্র ‘আ চাইল্ড অব মাই ওন’-এ। ১৩ আগস্ট মুক্তি পাওয়া তথ্যচিত্রটির কেন্দ্রীয় চরিত্র এলেওর আলেহান্দ্রা মারিন মেন্দোজা—ডাকনাম আলী। ২০০৯ সালে মেক্সিকো সিটির একটি হাসপাতালে কাজ করার সময় তিনি এক নবজাতককে চুরি করেছিলেন। এর আগে পরিবার, স্বজন ও বন্ধুদের বিশ্বাস করিয়েছিলেন, তিনি অন্তঃসত্ত্বা।
ঘটনাটি এখানেই শেষ নয়। আলীর দাবি, শিশুটির মা নিজেই নাকি সন্তানটি তাঁকে দিতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু তদন্ত ও আদালতের নথি বলছে ভিন্ন কথা। শিশুটির মা মায়রা নাভারোর বক্তব্য, এমন কোনো চুক্তিই কখনো হয়নি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো তথ্যচিত্রের প্রথম প্রায় ৫০ মিনিটে এ ঘটনাকে সরাসরি তথ্যচিত্রের মতো দেখানো হয়নি। বরং পেশাদার অভিনয়শিল্পীদের দিয়ে আলীর বর্ণনা অনুযায়ী পুরো ঘটনাটি নির্মাণ করা হয়েছে সিনেমার আদলে। এরপর পর্দায় আসেন বাস্তবের আলী, শিশুটির মা মায়রা, আলীর তৎকালীন সঙ্গী আর্তুরো গারমিনো এবং মামলার বিচারক তাইসিয়া ক্রুজ পারসেরো।
ফলে ‘আ চাইল্ড অব মাই ওন’ শুধু একটি শিশু চুরির গল্প নয়। এটি মাতৃত্বের সামাজিক চাপ, সন্তানহীনতার ভয়, দাম্পত্য সম্পর্ক, অপরাধবোধ এবং সত্যকে নিজের মতো করে বিশ্বাস করার এক অস্বস্তিকর গল্প।
মায়ের হওয়ার চাপ থেকেই শুরু
আলীর গল্পের শুরু অপরাধ দিয়ে নয়, মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। স্বামী আর্তুরোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মধ্যে সন্তান নেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু পরপর তিনবার গর্ভপাতের পর তাঁদের সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, আর্তুরো দত্তক নিতে চাইতেন না। ফলে সন্তান জন্ম দেওয়ার চাপটা ক্রমেই আলীর ওপর এসে পড়ে।
পরিবারের প্রত্যাশাও ছিল একই রকম। আলী মনে করতে থাকেন, সন্তানধারণ করতে না পারলে হয়তো স্বামী তাঁকে ছেড়ে চলে যাবেন। সমাজ তাঁকে ব্যর্থ নারী হিসেবে দেখবে। নিজের ওপর তৈরি হওয়া সেই চাপ একসময় এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে তিনি একটি গর্ভধারণের গল্প তৈরি করেন, যে গর্ভধারণ বাস্তবে কখনো ঘটেনি।
‘আমি ভয় পেতাম, মা হতে না পারলে আর্তুরো আমাকে ছেড়ে যাবে। মানুষ আমাকে বিচার করবে’—তথ্যচিত্রে এমনটাই বলেন আলী।
এরপর শুরু হয় তাঁর অভিনয়। হাসপাতালে কাজ করার সুবাদে তিনি চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্র সম্পর্কে জানতেন। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজের জন্য ভুয়া আলট্রাসনোগ্রামের কাগজপত্র তৈরি করেন। পরিবারকে বোঝান, তিনি সত্যিই অন্তঃসত্ত্বা।
এমনকি নিজের শরীরেও গর্ভধারণের চেহারা তৈরি করার চেষ্টা করেন। দ্রুত ওজন বাড়াতে প্রচুর জাঙ্ক ফুড খেতে থাকেন, যাতে তাঁর পেট বড় দেখায়।
পরিবারও বিশ্বাস করে ফেলে। একপর্যায়ে আয়োজন করা হয় তাঁর বেবি শাওয়ার। অনুষ্ঠানে আলী উপহার খুলছেন, পেটের ওপর হাত রাখছেন, ঘরের ভিডিও ফুটেজে ধরা পড়ে সেই দৃশ্য। অথচ বাস্তবে তাঁর গর্ভে কোনো সন্তান ছিল না।
এরপর দরকার হলো একটি শিশু
ভুয়া গর্ভধারণের গল্প তৈরি করা গেল। কিন্তু একসময় শিশুর জন্ম দেওয়ার অভিনয় করতেই হবে। আলীর পরিকল্পনা ছিল, হাসপাতালে একা গিয়ে ‘সন্তান জন্ম দেওয়ার’ নাটক করবেন। এরপর নবজাতককে নিয়ে বাড়ি ফিরে স্বামীকে চমকে দেবেন। কিন্তু সেই নবজাতক আসবে কোথা থেকে?
এই জায়গাতেই গল্পটি ভয়াবহ মোড় নেয়। আলীর দাবি, সন্তান জন্মের কয়েক মাস আগে হাসপাতালে অপেক্ষাকক্ষে তাঁর সঙ্গে মায়রা নাভারোর পরিচয় হয়েছিল। আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, মায়রা প্রথমে গর্ভপাতের কথা ভেবেছিলেন। পরে সিদ্ধান্ত নেন, সন্তানটি দত্তক দিয়ে দেবেন। আলীর দাবি, সেখানেই দুজনের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল—মায়রা তাঁর সন্তান আলীকে দিয়ে দেবেন।
তথ্যচিত্রে এই অংশটিই প্রথমে অভিনয়ের মাধ্যমে দেখানো হয়। পর্দায় দেখা যায়, হাসপাতালের অপেক্ষার কক্ষে দুই নারীর পরিচয়। পরে মায়রা সন্তান জন্ম দেওয়ার পর শিশুটিকে আলীর হাতে তুলে দেন। এরপর মায়রা নাকি চিহুয়াহুয়ার উদ্দেশে চলে যান। দৃশ্যটি যেন কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য। কিন্তু বাস্তব মায়রা যখন পর্দায় আসেন, তখন সেই গল্পের ভিত্তিটাই ভেঙে পড়ে। ‘কোনো চুক্তিই হয়নি’—তাঁর সরাসরি বক্তব্য।
‘আমি সন্তানটি কাউকে দিতে চাইনি’
মায়রার বক্তব্য অনুযায়ী, আলীর সঙ্গে হাসপাতালে তাঁর কোনো পুরোনো চুক্তি ছিল না। এমনকি সন্তান জন্ম দেওয়ার আগে আলীর সঙ্গে তাঁর পরিচয়ও হয়নি। মায়রা বলেন, সন্তান জন্ম দেওয়ার পরই আলী তাঁর কক্ষে এসেছিলেন। নিজেকে হাসপাতালের একজন কর্মী পরিচয় দিয়ে একটি জরিপের কথা বলেছিলেন।
এরপর মায়রাকে প্রস্রাবের নমুনা দিতে বাথরুমে যেতে হয়। তখন তাঁর প্রচণ্ড জ্বর ছিল। ফিরে এসে দেখেন, তাঁর সন্তান নেই। কিন্তু তখনো তাঁর মাথায় আসেনি যে শিশুটিকে কেউ চুরি করেছে।
মায়রার ধারণা হয়েছিল, কোনো নার্স হয়তো শিশুটিকে গোসল করাতে বা খাওয়াতে নিয়ে গেছেন। একজন নতুন মা যে মুহূর্তে নিজের সন্তানকে চোখের সামনে হারিয়ে ফেলেছেন, কিন্তু প্রথমে বুঝতেই পারেননি সন্তান অপহৃত হয়েছে, তথ্যচিত্রের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশগুলোর একটি সেটিই।
অন্যদিকে আলীর দাবি ছিল, মায়রা স্বেচ্ছায় শিশুটিকে তাঁকে দিয়েছিলেন। কিন্তু মামলার বিচারক তাইসিয়া ক্রুজ পারসেরোর কাছে এই দাবির সঙ্গে প্রমাণের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
আদালতে ভেঙে যায় আলীর গল্প
মামলার তদন্তে বেরিয়ে আসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। মায়রার হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট কার্ড পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, আলী যে সময়ের কথা বলছেন, সেই সময় মায়রা ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন না। তাঁর নিয়মিত চেকআপ হতো অন্য একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।
অর্থাৎ আলীর দাবি অনুযায়ী, সন্তান জন্মের কয়েক মাস আগে হাসপাতালের অপেক্ষার কক্ষে দুজনের যে কথোপকথনের কথা বলা হয়েছে, সেটি ঘটার সুযোগই ছিল না।
বিচারক পারসেরো বলেন, মামলার সব প্রমাণ বিবেচনা করার পর একমাত্র যে বিষয়টি কোনোভাবেই খাপ খাচ্ছিল না, তা হলো মায়রা নাকি সন্তানটি দিতে সম্মতি দিয়েছিলেন।
এদিকে পুলিশের হাতে আসে আরও সরাসরি প্রমাণ। মায়রার কক্ষে আলীর একটি সোয়েটার পাওয়া যায়। সঙ্গে ছিল তাঁর পরিচয়পত্র। হাসপাতালের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, দুপুরের আগে আলী খালি একটি শপিং ব্যাগ নিয়ে হাসপাতালে ঢুকছেন। কয়েক ঘণ্টা পর তিনি হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন—সেই ব্যাগেই ছিল নবজাতক।
এরপর পুলিশ আলীকে খুঁজে বের করে। হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার প্রায় আট ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কাছের একটি হোটেলের কক্ষ থেকে পুলিশ আলী, তাঁর স্বামী আর্তুরো ও নবজাতককে উদ্ধার করে।
আর্তুরো কি জানতেন
এ মামলায় আরেকটি প্রশ্ন ছিল, আলীর স্বামী আর্তুরো কি শিশু চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন? তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও পরে তিনি খালাস পান। আর্তুরো বিশ্বাস করেছিলেন, আলী সত্যিই তাঁদের সন্তান জন্ম দিয়েছেন, ফলে তাঁর কাছে শিশুটি ছিল নিজের সন্তান।
মামলার বিচারকও মনে করেন, আর্তুরোর অপরাধে ইচ্ছাকৃত অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত তিনি দুই বছর ছয় মাস কারাগারে থাকার পর খালাস পান।
অর্থাৎ যে মানুষটির জন্য আলী প্রথমে মিথ্যা গর্ভধারণের নাটক করেছিলেন, সেই মানুষটিও শেষ পর্যন্ত এই অপরাধের কারণে কারাগারে যান।
১৩ বছরের কারাবাস
শিশু চুরির অপরাধে আলীকে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মোট ১৩ বছরের বেশি সময় তিনি কারাগারে কাটান। তিনি যখন কারাগারে ঢোকেন, তাঁর বয়স ছিল ২৬। মুক্তি পাওয়ার সময় বয়স ৩৯। এই দীর্ঘ সময় তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো কেটে যায় কারাগারের ভেতর। ২০২৩ সালে মুক্তির পর আলী নতুন করে জীবন শুরু করার কথা ভাবেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল কাজ করবেন, সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে যাবেন, নিজের জীবন উপভোগ করবেন।
আর একটি বিষয় তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন, তিনি আর কখনো গর্ভবতী হওয়ার চেষ্টা করবেন না। কারণ, তাঁর উপলব্ধি হয়েছিল, এত দিন মা হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা তিনি নিজের বলে ভেবেছিলেন, তার বড় অংশই ছিল অন্যদের সন্তুষ্ট করার ইচ্ছা।
‘আগে মনে হয়, মা হতে চাওয়ার ইচ্ছাটা ছিল অন্যদের খুশি করার জন্য’, তথ্যচিত্রে বলেন আলী। তারপর নিজেকেই প্রশ্ন করেন, মা হওয়া ছাড়া জীবনে আর কী আছে?
কিন্তু ১৩ বছর পরও কি চাপ বদলেছে
এখানেই ‘আ চাইল্ড অব মাই ওন’ আরও গভীর হয়ে ওঠে। কারাগার থেকে বেরিয়ে আলী ও আর্তুরোর সম্পর্ক টিকে যায়। কিন্তু কিছুদিন পর আর্তুরো আবারও সন্তান নেওয়ার কথা বলেন। অর্থাৎ ১৩ বছরের কারাবাস, অপরাধ, সামাজিক অপমান—কিছুই যেন সেই পুরোনো প্রত্যাশাকে পুরোপুরি বদলাতে পারেনি। আর্তুরো বলেন, তিনি সন্তান চান। তাঁর কাছে সন্তান মানে শুধু পরিবার নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মা–বাবার উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়া।
আলী তখন আর আগের মতো সন্তান নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী নন। তথ্যচিত্রের পরিচালক মাইতে আলবেরদি এই জায়গাকে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বলে মনে করেন। তাঁর ভাষায়, আলী ১৩ বছর পর সমাজে ফিরে এলেন, কিন্তু ফিরে এসে আবারও একই ধরনের চাপের মুখোমুখি হলেন, এবার স্বামীর কাছ থেকে।
‘এত বছরেও কিছুই বদলায়নি’—আলবেরদির উপলব্ধি।
শেষ পর্যন্ত আর্তুরোর জীবনে এল আরেক নারী
আলী যখন আর সন্তান নিতে রাজি হলেন না, আর্তুরো অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। সেই সম্পর্কে তাঁদের একটি সন্তানও হয়। কিন্তু গল্পটি এখানেও সরল নয়। আর্তুরো আলীকে জানান, তিনি তাঁকেই বেশি ভালোবাসেন এবং তাঁর সঙ্গেই থাকতে চান। আলী শেষ পর্যন্ত আর্তুরোর সন্তানের সঙ্গে সহমাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরি করেন।
অর্থাৎ যে সন্তান পাওয়ার জন্য একসময় তিনি আইন ভেঙেছিলেন, কারাগারে গিয়েছিলেন, জীবনের ১৩ বছরের বেশি সময় হারিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত মাতৃত্বের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অন্য এক রূপ নেয়।
কেন আলীর গল্পকে ‘রূপকথা’ হিসেবে দেখানো হলো?
‘আ চাইল্ড অব মাই ওন’-এর সবচেয়ে অভিনব দিক হলো এর নির্মাণের পদ্ধতি। পরিচালক মাইতে আলবেরদি ২০২২ সালে কারাগারে আলীর সঙ্গে পরিচিত হন। তখন তিনি অন্য একটি তথ্যচিত্রের কাজ করছিলেন। আলীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি এই অপরাধের গল্প শোনেন।
কিন্তু আলীর বর্ণনা ছিল অন্য রকম। তিনি নিজের অপরাধ অস্বীকার করেন না। কিন্তু একই সঙ্গে নিজের কাছে এমন একটি গল্প তৈরি করে রেখেছেন, যেখানে শিশুটির মা তাঁকে সন্তানটি দিয়েছিলেন।
আলবেরদির কাছে এই গল্প ছিল আলীর নিজের তৈরি একধরনের ‘রূপকথা’, যে গল্পের ভেতর দিয়ে তিনি নিজের বেঁচে থাকাকে অর্থপূর্ণ করার চেষ্টা করেছেন।
পরিচালক বলেন, এটি সেই গল্প, ‘যে গল্প সে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বলে।’ তাই প্রথম ৫০ মিনিটে বাস্তব ঘটনাকে সরাসরি পুনর্নির্মাণ না করে আলীর কল্পিত সংস্করণকে অভিনয়ের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে।
এরপর ধীরে ধীরে দর্শক বুঝতে পারেন যে দৃশ্যগুলো এতক্ষণ সত্যি বলে মনে হচ্ছিল, সেগুলোর অনেকটাই আসলে আলীর নিজের বয়ান। এই নির্মাণপদ্ধতি দর্শককে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—একজন অপরাধী যখন নিজের অপরাধের কথা বলেন, তখন তাঁর বলা গল্পের কতটা সত্য আর কতটা আত্মরক্ষার কৌশল?
মাতৃত্ব কি সত্যিই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত
আলবেরদি আলীর ঘটনাটিকে শুধু একটি অপরাধ হিসেবে দেখতে চাননি। কারণ, তাঁর কাছে প্রশ্নটি আরও বড়—একজন নারীকে মা হওয়ার জন্য সমাজ কতটা চাপ দেয়?
মেক্সিকো ও লাতিন আমেরিকার অনেক সমাজে বিয়ের সঙ্গে সন্তানকে প্রায় অবিচ্ছেদ্য হিসেবে দেখা হয়। একজন নারী বিয়ে করেছেন, অথচ তাঁর সন্তান নেই—এই বিষয় নিয়ে পরিবারের প্রশ্ন, আত্মীয়দের কৌতূহল, সামাজিক মন্তব্য কিংবা স্বামীর প্রত্যাশা অনেক সময় একজন নারীর ওপর অদৃশ্য চাপ তৈরি করতে পারে।
আলীর ক্ষেত্রে সেই চাপ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তিনটি গর্ভপাতের পর তাঁর ভয়, লজ্জা ও অপরাধবোধ তাঁকে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করতে বাধ্য করে, যা আদতে ছিল মিথ্যা। প্রথমে মিথ্যা গর্ভধারণ। তারপর ভুয়া চিকিৎসা নথি। তারপর বেবি শাওয়ার। তারপর এমন একটি সন্তান, যাকে তিনি নিজের সন্তান হিসেবে পরিবারকে দেখাবেন।
আর সেই সন্তান পাওয়ার জন্য শেষ পর্যন্ত একজন মায়ের কাছ থেকে নবজাতক চুরি।
‘চাইল্ড অব মাই ওন’ আসলে কার গল্প?
শিরোনামটি প্রথমে মনে হতে পারে, এটি একজন নারীর নিজের সন্তান পাওয়ার গল্প। কিন্তু তথ্যচিত্র যত এগোয়, ততই বোঝা যায়—এটি একই সঙ্গে অন্তত তিন নারীর গল্প। একজন আলী, যিনি মা হতে চেয়েছিলেন এবং সেই আকাঙ্ক্ষার কাছে নিজেকে হারিয়েছিলেন। একজন মায়রা, যিনি নিজের নবজাতক সন্তানকে হাসপাতালের কক্ষে রেখে কয়েক মিনিটের জন্য বাইরে গিয়ে ফিরে এসে দেখেছিলেন, সন্তান নেই।
আর একজন পরিচালক, যিনি একজন অপরাধীর বয়ান শুনে প্রশ্ন তুলেছেন—অপরাধের পেছনে থাকা সামাজিক চাপকে আমরা কতটা দেখি? মায়রার কাছে এটি নিছক সন্তান চুরি। তাঁর সন্তান তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। আইনের চোখেও সেটিই অপরাধের মূল সত্য।
কিন্তু আলীর নিজের কাছে ঘটনাটি অন্যভাবে সাজানো। তাঁর কল্পনায় ছিল একটি সন্তান, একটি পরিবার, স্বামীর ভালোবাসা এবং সমাজের স্বীকৃতি। এই দুই সত্যের সংঘর্ষই তথ্যচিত্রটির সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা।
সাজা শেষ হলেও গল্প শেষ হয়নি
আলী ভেবেছিলেন, ১৩ বছরের কারাদণ্ড শেষ হলেই হয়তো তাঁর জীবনের সেই অধ্যায়ও শেষ হবে। কিন্তু বাইরে এসে তিনি দেখলেন, মূল চাপের একটি অংশ এখনো একই রয়ে গেছে। তাঁর স্বামী আবারও সন্তান চাইলেন।
এই অভিজ্ঞতা পরিচালক আলবেরদিকে ভাবিয়েছে, একজন নারী যখন অপরাধ করে শাস্তি ভোগ করে সমাজে ফেরেন, তখন কি সমাজ তাঁর আগের সেই চাপগুলো থেকে মুক্তি দেয়? নাকি তাঁকে আবারও একই পুরোনো পরিচয়ের মধ্যে ফিরিয়ে নেয়? আলীর জন্য উত্তরটি সুখকর নয়। তিনি একসময় যে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘মা হওয়া ছাড়া আর কী আছে?’—সেই প্রশ্নই যেন পুরো তথ্যচিত্রের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
মা হওয়া একজন নারীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। কিন্তু সেটিই কি তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয়? আলীর জীবনের ভয়াবহ পরিণতি দেখিয়ে ‘আ চাইল্ড অব মাই ওন’ সেই প্রশ্নটাই দর্শকের সামনে ছুড়ে দেয়।
আলী বলেন, তিনি আইন ভেঙেছেন, মিথ্যা বলেছেন, প্রতারণা করেছেন এবং মানুষকে কষ্ট দিয়েছেন। নিজের অপরাধের এই স্বীকারোক্তি তাঁকে অন্য অনেক অপরাধীর চেয়ে আলাদা করে তোলে।
কিন্তু অপরাধ স্বীকার করলেই কি নিজের তৈরি গল্পটিও ভেঙে যায়? তথ্যচিত্রটি সেই উত্তর সহজে দেয় না। বরং দর্শককে আলীর দুই সংস্করণের মুখোমুখি দাঁড় করায়, একটি তাঁর নিজের বলা গল্প, আরেকটি আদালত ও প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত গল্প।
টাইম অবলম্বনে