মাইকেল জ্যাকসন কি সত্যি শিশুকে যৌন নির্যাতন করেছিলেন

‘মাইকেল জ্যাকসন: দ্য ভারডিক্ট’–এর দৃশ্য। ছবি: নেটফ্লিক্স

পপসংগীতের ইতিহাসে এমন তারকা খুব কমই আছেন, যাঁদের প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে। মাইকেল জ্যাকসন সেই বিরল ব্যতিক্রমদের একজন। তাঁর গান, নাচ, মঞ্চ পরিবেশনা এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব তাঁকে ‘কিং অব পপ’-এর আসনে বসিয়েছে বহু আগেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর প্রায় দুই দশক পরও আরেকটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—শিল্পী হিসেবে তাঁর অবদান কি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নিপীড়নের অভিযোগগুলোর ঊর্ধ্বে?

নেটফ্লিক্সের নতুন তথ্যচিত্র সিরিজ ‘মাইকেল জ্যাকসন: দ্য ভারডিক্ট’ সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। তিন পর্বের এই সিরিজ মূলত ২০০৩ সালে শুরু হওয়া এবং ২০০৫ সালে শেষ হওয়া বহুল আলোচিত বিচারপ্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নির্মিত। যেখানে জ্যাকসনের বিরুদ্ধে এক কিশোরকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

বায়োপিকের সাফল্যের পর পাল্টা বয়ান
মাত্র দুই মাস আগে মুক্তি পাওয়া জ্যাকসনের জীবনীচিত্র ‘মাইকেল’ বক্স অফিসে ৮৫ কোটি ডলারের বেশি আয় করে। ছবিটি মুক্তির পর বিশ্বজুড়ে অসংখ্য দর্শক আবারও জ্যাকসনকে উদ্‌যাপন করতে শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ঘিরে নতুন উন্মাদনা দেখা যায়। অনেকের কাছে যেন তিনি শুধুই এক ভুল বোঝাবুঝির শিকার শিল্পী।

কিন্তু ‘মাইকেল জ্যাকসন: দ্য ভারডিক্ট’ সেই জনপ্রিয় ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। ডকুমেন্টারিটি দাবি করে না যে আদালতের রায় ভুল ছিল। বরং এটি দেখানোর চেষ্টা করে, বিচারপ্রক্রিয়ায় কী ঘটেছিল, কীভাবে অভিযোগগুলো উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং কেন এত বিতর্কের পরও জ্যাকসন ‘নট গিল্টি’ বা নির্দোষ ঘোষিত হয়েছিলেন।

‘মাইকেল জ্যাকসন: দ্য ভারডিক্ট’–এর দৃশ্য। ছবি: নেটফ্লিক্স

‘নির্দোষ’ রায়, কিন্তু প্রশ্ন কি শেষ
২০০৫ সালে আদালত জ্যাকসনকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেন। আইনের দৃষ্টিতে সেটিই চূড়ান্ত সত্য। কিন্তু ডকুমেন্টারিটির নির্মাতারা মনে করেন, আদালতের রায় মানেই সব প্রশ্নের অবসান নয়। সিরিজটিতে বিচারকক্ষের নথি, সংবাদমাধ্যমের পুরোনো ফুটেজ, তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার এবং তৎকালীন সাংবাদিকদের বক্তব্য ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে—প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ উপস্থাপনে যথেষ্ট দক্ষতা দেখাতে পারেনি।
অন্যদিকে জ্যাকসনের পক্ষে ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ আইনজীবীদের দল। তাঁদের জেরা, কৌশল ও আদালতে উপস্থাপনার দক্ষতা অভিযোগকারীদের বক্তব্যে সন্দেহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।

‘মাইকেল জ্যাকসন: দ্য ভারডিক্ট’–এর পোস্টার। ছবি: নেটফ্লিক্স

জর্ডান চ্যান্ডলার থেকে গ্যাভিন আরভিজো
তথ্যচিত্রটি শুধু গ্যাভিন আরভিজোর মামলাই নয়, বরং আগের কয়েকটি অভিযোগও নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।
বিশেষ করে ১৯৯৩ সালে কিশোর জর্ডান চ্যান্ডলারের আনা অভিযোগের প্রসঙ্গ উঠে আসে। সেই মামলায় কখনো পূর্ণাঙ্গ বিচার হয়নি। পরবর্তী সময়ে আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি শেষ হয়। সিরিজটিতে দেখানো হয়, কীভাবে একের পর এক কিশোর ও তাদের পরিবার জ্যাকসনের নিকটবর্তী হয়ে উঠেছিল। সেখানে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ছিল স্পষ্ট। একদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত পপ তারকা, অন্যদিকে সাধারণ পরিবার। নির্মাতারা ইঙ্গিত দেন, এই অসম সম্পর্কই পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল।

আরও পড়ুন

ভক্তি, খ্যাতি ও বিচার
তথ্যচিত্রটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশগুলোর একটি হলো জুরি সদস্যদের বক্তব্য। একজন সাবেক জুরি সদস্য আজও স্মরণ করেন, আদালতে জ্যাকসন তাঁকে কীভাবে তাকিয়ে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়েছিলেন। তাঁর কথাবার্তায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, জ্যাকসনের তারকাখ্যাতি বিচারপ্রক্রিয়ার পরিবেশকে প্রভাবিত করেছিল।
আদালতের বাইরে হাজারো ভক্ত প্রতিদিন জড়ো হতেন। তাঁরা ‘মাইকেল নির্দোষ’ স্লোগান দিতেন। কখনো জ্যাকসন গাড়ির ছাদে উঠে তাঁদের অভিবাদন জানাতেন, কখনো হাত নেড়ে সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে সাড়া দিতেন।
তথ্যচিত্রটি প্রশ্ন তোলে—এমন পরিস্থিতিতে কি সত্যিই একজন বিশ্ববিখ্যাত তারকার বিচার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে সম্ভব?

‘মাইকেল জ্যাকসন: দ্য ভারডিক্ট’–এর দৃশ্য। ছবি: নেটফ্লিক্স

‘লিভিং নেভারল্যান্ড’-এর ছায়া
২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বিতর্কিত তথ্যচিত্র ‘লিভিং নেভারল্যান্ড’-এর কথাও এখানে উঠে আসে। বিশেষ করে ওয়েব রবসনের  প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ। বিচার চলাকালে তিনি জ্যাকসনের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু বহু বছর পরে তিনি দাবি করেন, শৈশবে জ্যাকসনের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তথ্যচিত্রটি এই পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে এবং দেখায়, শিশু বয়সে ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কথা বলা কতটা কঠিন হতে পারে।

দুই সত্তার সংঘাত
মাইকেল জ্যাকসনকে ঘিরে বিতর্কের সবচেয়ে জটিল অংশ সম্ভবত এখানেই। তাঁর সংগীতের প্রভাব অস্বীকার করা অসম্ভব। ‘থ্রিলার’, ‘বিলি জিন’, ‘বিট ইট’, ‘ম্যান ইন দ্য মিরর’ পপসংগীতের ইতিহাসে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে। তিনি সংগীতশিল্প, মিউজিক ভিডিও এবং লাইভ পারফরম্যান্সের ভাষাই বদলে দিয়েছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকেও পুরোপুরি উপেক্ষা করা যায় না।
‘দ্য ভারডিক্ট’ সেই অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় দর্শকদের। এটি কোনো চূড়ান্ত রায় দেয় না। বরং মনে করিয়ে দেয়, কোনো শিল্পীর প্রতিভা যত অসাধারণই হোক, তাঁকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে