ট্রাম্পের এলিয়েন-রহস্য উন্মোচনের আগে দেখতে পারেন যে সিনেমা
কিছুদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত জোরালোভাবে এলিয়েন ও ইউএফও-সংক্রান্ত অতি গোপনীয় ফাইলগুলো জনসমক্ষে প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন। এর পর থেকে বিশ্বজুড়ে পুরোনো জল্পনা নতুন করে শুরু হয়েছে। বিজ্ঞানপ্রেমী মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, সত্যিই কি এলিয়েনের সন্ধান পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র? নেভাডার সেই রহস্যময় ‘এরিয়া ৫১’-এ কি সত্যিই লুকানো আছে ভিনগ্রহের কোনো যান? এলিয়েনরা কি দেখতে হলিউডের সিনেমার মতোই ভয়ংকর? মনে যদি এমন হাজারো প্রশ্ন উঁকি দেয়, তবে ট্রাম্পের ক্ল্যাসিফায়েড ফাইলগুলো প্রকাশের আগেই আপনার ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া সায়েন্স ফিকশন কমেডি সিনেমা ‘পল’ দেখে নেওয়া উচিত।
একনজরে
সিনেমা: ‘পল’
ধরন: সাই-ফাই কমেডি
ভাষা: ইংরেজি
পরিচালনা: গ্রেগ মটোলা
অভিনয়: সাইমন পেগ, নিক ফ্রস্ট, ক্রিস্টেন উইগ, জেসন বেটম্যান, সেথ রজেন (ভয়েসওভার)
স্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্স
দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট
ব্রিটিশ কমেডিয়ান সাইমন পেগ এবং নিক ফ্রস্টের জুটির কথা সিনেমাপ্রেমীদের নিশ্চয়ই মনে আছে। ‘শন অব দ্য ডেড’ বা ‘হট ফাজ’-এর মতো তুমুল জনপ্রিয় সিনেমার পর ‘পল’ সিনেমাতেও তাঁদের আইকনিক রসায়ন দেখা যায়। এখানে তাঁরা গ্রায়েম এবং ক্লাইভ নামের দুই কল্পবিজ্ঞান ও কমিক বুক–পাগলের (গিক) চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই দুই অবিচ্ছেদ্য বন্ধু ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর ‘কমিক-কন’ উৎসব শেষে একটি আরভি (রিক্রিয়েশনাল ভেহিকেল) বা মোটরহোম ভাড়া করেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সব ইউএফও হটস্পট, বিশেষ করে ‘এরিয়া ৫১’-এর আশপাশে ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু তাঁদের এই নার্ডি রোড ট্রিপ অবিশ্বাস্যরকম রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে, যখন নির্জন এক হাইওয়েতে তাঁদের সামনে আছড়ে পড়ে একটি গাড়ি এবং ভেতর থেকে আক্ষরিক অর্থেই বেরিয়ে আসে এক এলিয়েন!
তবে দর্শকদের আগেই জানিয়ে রাখা ভালো, এই এলিয়েন কিন্তু ‘এলিয়েন’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সেই মতো ভীতিকর নয়, কিংবা ‘ই.টি’-র মতো আদুরে ও নিষ্পাপও নয়। এর নাম পল (যাতে দুর্দান্তভাবে কণ্ঠ দিয়েছেন হলিউড অভিনেতা সেথ রজেন)। পলের উচ্চতা চার ফুট, গায়ের রং সবুজ, চোখ দুটি বিশাল। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সে সমানে গালমন্দ করে, চেইন স্মোকার, হাফপ্যান্ট পরে ঘুরে বেড়ায়, বিয়ার পান করে এবং তার রসবোধ এতটাই ডার্ক যে আপনি হাসতে হাসতে লুটোপুটি খাবেন। ৬০ বছর ধরে পৃথিবীর এক গোপন সামরিক ঘাঁটিতে বন্দী ছিল পল। এই দীর্ঘ সময়ে সে মানবজাতির সংস্কৃতি, বিশেষ করে পপ-কালচার খুব ভালোভাবে রপ্ত করে নিয়েছে। সিনেমার অন্যতম মজাদার দিক হলো, এখানে দেখানো হয় যে প্রখ্যাত নির্মাতা স্টিভেন স্পিলবার্গকে ‘ই.টি’ সিনেমার ধারণা থেকে শুরু করে ‘এক্স-ফাইলস’-এর বিখ্যাত সব প্লট—সবই নাকি পল ফোন করে শিখিয়েছিল!
সেথ রজেনের কণ্ঠস্বর ‘পল’ চরিত্রটিকে এমন এক মাত্রা দিয়েছে যে কিছুক্ষণ পর দর্শকেরা ভুলেই যাবেন এটি একটি সিজিআই বা গ্রাফিকস-নির্ভর চরিত্র। গ্রায়েম, ক্লাইভ আর পলের এই ত্রিমুখী রসায়নই সিনেমার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। একদিকে দুই ব্রিটিশ যুবক, যারা সারা জীবন এলিয়েন দেখার স্বপ্ন দেখেছে, অথচ বাস্তবে দেখে ভয়ে জ্ঞান হারানোর উপক্রম; অন্যদিকে একেবারেই নির্ভার একটি এলিয়েন, যে কিনা মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ‘মানবিক ও আড্ডাবাজ’।
যাত্রাপথে তাদের পিছু নেয় এফবিআইয়ের এক বদরাগী এজেন্ট জয়েল (জেসন বেটম্যান)। ঘটনাক্রমে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় ধর্মান্ধ এক বাবার মেয়ে রুথ (ক্রিস্টেন উইগ)। ভিনগ্রহের পলের কাছ থেকে মহাবিশ্বের বিশালতা এবং বিবর্তনবাদ সম্পর্কে জানার পর রুথের প্রতিক্রিয়া এবং নতুন করে গালাগালি শেখার আপ্রাণ চেষ্টা সিনেমার অন্যতম সেরা হাসির খোরাক জুগিয়েছে।
সিনেমায় ডার্ক কমেডির দারুণ একটি দৃশ্য রয়েছে, যেখানে পল একটি মৃতপ্রায় পাখিকে তার রহস্যময় শক্তিতে বাঁচিয়ে তোলে। দর্শকেরা যখন ভাবছেন, ‘বাহ, কী সুন্দর! ই.টি.র মতো আবেগঘন দৃশ্য!’ ঠিক পরমুহূর্তেই পল পাখিটিকে গপ করে খেয়ে ফেলে। এ ধরনের অপ্রত্যাশিত হাস্যরস পুরো সিনেমাতেই রয়েছে। এ ছাড়া ২০১১ সালের সিনেমা হলেও পলের সিজিআই কাজ ছিল বেশ নিখুঁত।
মূলত ‘পল’ নিছক কোনো কমেডি সিনেমা নয়; এটি কল্পবিজ্ঞানপ্রেমীদের জন্য একটি বিশাল ‘ট্রিবিউট’। ‘স্টার ওয়ার্স’, ‘স্টার ট্রেক’, ‘ম্যান ইন ব্ল্যাক’ থেকে শুরু করে ‘ক্লোজ এনকাউন্টারস অব দ্য থার্ড কাইন্ড’—সবকিছুর মজাদার রেফারেন্স পুরো সিনেমাতেই ছড়িয়ে আছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইউএফও ফাইলগুলো হয়তো আগামী দিনে আমাদের সামনে এলিয়েনদের সম্পর্কে অনেক চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরবে। কিন্তু তার আগে আমরা অন্তত এটুকু কল্পনা করে শান্তি পেতে পারি যে মহাবিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে হয়তো পলের মতো কোনো এলিয়েন আছে; যে স্পেসশিপ বা মহাকাশযান চালানোর চেয়ে সোফায় শুয়ে পপকর্ন খেতে আর মানুষের সঙ্গে জোকস করতেই বেশি পছন্দ করে।
আপনি যদি নিখাদ বিনোদন, দুর্দান্ত সব জোকস আর একটু ভিন্ন স্বাদের সাই-ফাই সিনেমা খোঁজেন, তবে ‘পল’ আপনার জন্য উপযুক্ত একটি সিনেমা। রোজকার একঘেয়েমি কাটাতে পলের সঙ্গে এই পাগলাটে যাত্রায় অনায়াসেই শামিল হতে পারেন।