১০ বছর পর ফিরল হইচই ফেলে দেওয়া সেই সিরিজ, জমল কি

‘দ্য নাইট ম্যানেজার ২’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

১০ বছর আগে বিবিসির সিরিজ ‘দ্য নাইট ম্যানেজার’ মুক্তির পর বিশ্বজুড়ে হইচই পড়ে যায়। বিলাসবহুল লোকেশন আর পরিমিত আভিজাত্য সিরিজটিকে করে তোলে আলাদা। তখন ওটিটির এতটা রমরমা ছিল না, ফি সপ্তাহে এন্তার থ্রিলারও দেখার সুযোগ ছিল না। তাই ব্রিটিশ এই গুপ্তচর সিরিজ দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন দর্শক। তখন অনেকেই অবশ্য এটিকে বলেছিলেন, টেলিভিশনের জন্য অতিরিক্ত স্টাইলিশ স্পাই থ্রিলার। প্রথম মৌসুম মুক্তির পর ভক্তদের কাছ থেকে দ্বিতীয়টির দাবি ছিল। কিন্তু জন লে কারের একই নামের উপন্যাস থেকে সিরিজটি নির্মিত হয়েছিল, সেটার আর কোনো কিস্তি নেই; তাই দ্বিতীয় মৌসুমের দাবি একরকম নাকচ করে দিয়েছিলেন নির্মাতারা। তাই ১০ বছর পর যখন প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দিল ‘নাইট ম্যানেজার’ টিম, অনেকেরই আশঙ্কা ছিল—পুরোনো জাদু ফিরবে তো! গত ১ জানুয়ারি থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছে দ্বিতীয় মৌসুমের ছয় পর্ব। দেখার পর বলাই যায়, ফেরাটা মন্দ হয়নি।

একনজরে
সিরিজ: ‘দ্য নাইট ম্যানেজার ২’
ধরন: স্পাই থ্রিলার
পরিচালনা: জর্জি ব্যাংকস-ডেভিস
অভিনয়: টম হিডলস্টন, হিউ লরি, অলিভিয়া কোলম্যান, ডগলাস হজ, দিয়েগো কালভা, কামিলা মোরোনে
স্ট্রিমিং: অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও
পর্বসংখ্যা:
দৈর্ঘ্য: ৫২-৬৪ মিনিট

প্রথম মৌসুমে আমরা দেখেছিলাম, আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র প্রেমিকাকে খুন করলে এমআই৬-এ যোগ দিতে বাধ্য হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও হোটেল ম্যানেজার জনাথন পাইন। প্রথম মৌসুমের মতো এখনো তিনি গোপন সংস্থায় আছেন, কিন্তু আর সরাসরি মাঠে নামেন না। মানসিক আঘাত সামলে তিনি এখন লন্ডনের সবচেয়ে অভিজাত হোটেলগুলোর সিসিটিভি নজরদারি করা একটি ইউনিট চালাচ্ছেন। উদ্দেশ্য, ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্ত্রাসের সম্ভাব্য ইঙ্গিত খোঁজা। এভাবে নজরদারি চালাতে চালাতে পুরোনো এক শত্রুর ওপর পাইনের চোখ আটকে যায়, এখানেই শুরু হয় গল্প। ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় দেদারে আসছে অস্ত্র, উদ্দেশ্য সরকার উৎখাত। জনাথন পাইন কি পারবেন এই ষড়যন্ত্র থামাতে—মোটাদাগে এটাই দ্বিতীয় মৌসুমের সারকথা।

দ্বিতীয় মৌসুমও নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত। আজকাল অনেক শোতেই মনে হয় যেন কেউ স্টিয়ারিংয়ে নেই, গল্পটা লক্ষ্যহীনভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ‘দ্য নাইট ম্যানেজার ২’ সেই তালিকায় পড়বে না। যদিও এবার জন লে কারের উপন্যাসের ওজন নেই, তবু পরিচিত মুখেরা ফিরেছেন—হিডলস্টন, কোলম্যান, অ্যালিস্টার পেট্রি, ডগলাস হজ। আরও বড় একটা চমকও আছে, মুক্তির আগে যা গোপন রাখা হয়েছিল—হিউ লরির প্রত্যাবর্তন। রোপার চরিত্রে, যেন মৃত্যুর পরও ফিরে আসা এক অন্ধকার ছায়া (স্পয়লার নয়, টিজারে তাঁকে দেখানো হয়েছে)। প্রধান চরিত্রে টম হিডলস্টন আবারও চরিত্রটিকে এমনভাবে ধারণ করেছেন যে তাঁর চোখের ক্লান্তির ভেতরেই গল্পের অর্ধেক বলা হয়ে যায়। তাঁর অভিব্যক্তি, চাহনি কিছু না বলেও যেন অনেক কিছু বলে দেয়।

নতুন মুখগুলোও নজর কেড়েছে। কলম্বিয়ার অস্ত্র ব্যবসায়ী টেডি দোস সান্তোস চরিত্রে দিয়েগো কালভা দুর্দান্ত। ব্রিটিশ অস্ত্র আমদানি করে নিজ দেশে সে গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলছে। আর কামিলা মোরোনে অভিনীত রোক্সানা বোলানিয়োস কিছুটা প্রথম কিস্তির এলিজাবেথ ডেবেকি অভিনীত চরিত্রটির নতুন সংস্করণ। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, দ্বিতীয় মৌসুম যেন প্রথমটিরই নতুন সংস্করণ—অস্ত্র ব্যবসায়ী, সুন্দরী তরুণী, গুপ্তচর বনাম গুপ্তচর। কিন্তু এই সিরিজ প্রথম দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করার ভান করে, তারপর সেগুলো সম্পূর্ণ উল্টে দিয়ে ঠিকই নিজের পথ খুঁজে নেয়।

‘দ্য নাইট ম্যানেজার ২’–এর পোস্টার থেকে। আইএমডিবি

হিডলস্টন আর লরির মুখোমুখি হওয়া আবারও এক দারুণ উপভোগ্য অভিজ্ঞতা। স্টেক লাঞ্চের টেবিলে প্রায় ১০ মিনিটের টান টান এক দৃশ্যে দুই চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক খেলা জমে ওঠে।

এবারের গল্প বলার ধরন প্রথম মৌসুমের চেয়ে আলাদা। শুরু থেকেই নির্মাতারা ধোঁয়াশা রেখেছেন; কে ভালো, কে মন্দ মালুম হয় না। এই পরিবর্তনই সিরিজকে আরও পরিণত করেছে। তবে এটা করতে গিয়ে সিরিজটি কোথাও কোথাও রোমাঞ্চ হারিয়েছে। তবে গতিমন্থরতা চরিত্রগুলোর মানসিক ভঙুরতা দেখানোর জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। এবারের মৌসুম অ্যাকশনের চেয়ে মানুষের ভেতরের যুদ্ধকে গুরুত্ব দিয়েছে বেশি। সিরিজটি গতি খুঁজে পেতে অর্ধেক সময় নেয়।

আরও পড়ুন

গল্প এগোয় ধীরে ধীরে, চরিত্রগুলো দীর্ঘ সময় ধরে পরিচিত হয় আর দর্শক অপেক্ষা করে সেই মুহূর্তের জন্য, যখন সত্যিই কিছু ঘটবে। প্রথম মৌসুম ছিল বিশ্ব রাজনীতি ও অস্ত্র–বাণিজ্যের গল্প। দ্বিতীয় মৌসুমেও সেই রাজনৈতিক কাঠামো রয়েছে, তবে মনোযোগ সরে এসেছে ব্যক্তিগত পর্যায়ে।

এবারের মৌসুমে বিবিসির সঙ্গে প্রযোজনায় যুক্ত হয়েছে অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওজ। বোঝাই যাচ্ছে, গল্পের চেয়ে বাণিজ্যের জোরেই ফিরেছে ‘নাইট ম্যানেজার’। বাজেট বাড়িয়ে সিরিজটিকে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজিতে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে (এরই মধ্যে তৃতীয় মৌসুমের প্রি-প্রোডাকশনও শুরু হয়ে গেছে)। এত কিছু মাথায় রেখেও সাম্প্রতিক সময়ের অনেক স্পাই থ্রিলারের চেয়ে এগিয়ে ‘দ্য নাইট ম্যানেজার ২’।

‘দ্য নাইট ম্যানেজার ২’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি