পদোন্নতি না দিলে কী হয়, দ্বীপে আটকা পড়ে টের পেলেন বস

‘সেন্ড হেল্প’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

অফিসে বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনি। কথা ছিল মিলবে কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি। কিন্তু নতুন বস চেয়ারে বসেই সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘আপনি পদোন্নতির যোগ্য নন!’ এমন বসের ওপর রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে সেই নাকউঁচু বসই যদি অধস্তন সেই কর্মীর সঙ্গে এক নির্জন দ্বীপে আটকা পড়েন এবং নিজের প্রাণ বাঁচাতে পুরোপুরি তাঁর ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন সমীকরণটা কেমন দাঁড়াবে?

এমনই এক অদ্ভুত (অনেকাংশে ভৌতিক) ‘সারভাইভালের’ গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে নতুন সিনেমা ‘সেন্ড হেল্প’। আর এই ছবির হাত ধরেই দীর্ঘ বিরতি শেষে নিজের চেনা ছন্দে ফিরেছেন হলিউডের প্রখ্যাত নির্মাতা স্যাম রাইমি।

একনজরে
সিনেমা:
‘সেন্ড হেল্প’
ধরন: ডার্ক কমেডি, সারভাইভাল হরর থ্রিলার
পরিচালনা: স্যাম রাইমি
চিত্রনাট্য: ড্যামিয়ান শ্যানন ও মার্ক সুইফট
অভিনয়: র‍্যাচেল ম্যাকঅ্যাডামস, ডিলান ও’ব্রায়েন
স্ট্রিমিং: ডিজনি +
সময়: ১ ঘণ্টা ৫৩ মিনিট

বিশাল বাজেটের সুপারহিরো কিংবা ফ্র্যাঞ্চাইজির ছবি বানাতে গিয়ে পরিচালকেরা অনেক সময় নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলেন। ‘ডক্টর স্ট্রেঞ্জ ইন দ্য মাল্টিভার্স অব ম্যাডনেস’ কিংবা ‘ওজ দ্য গ্রেট অ্যান্ড পাওয়ারফুল’ নির্মাণের সময় স্যাম রাইমির দশাও অনেকটা তেমনই হয়েছিল। ১৯৮১ সালে মাত্র সাড়ে তিন লাখ ডলারে ‘ইভিল ডেড’ বানিয়ে যিনি হরর সিনেমায় একরকম বিপ্লবই এনেছিলেন বলা চলে, বড় প্রযোজনার চাপে সেই চেনা রাইমিকে যেন পাওয়াই যাচ্ছিল না। অবশেষে ‘সেন্ড হেল্প’ দিয়ে তিনি স্বরূপে ফিরলেন।

ছবির পটভূমি খুব একটা জটিল নয়। ব্র্যাডলি প্রেস্টন একটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্তা। বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পদে বসে কর্মীদের মানুষ হিসেবে গোনার সময় পান না তিনি। অন্যদিকে লিন্ডা লিডল একই অফিসে বছরের পর বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পদোন্নতির আশায় দিন গুনছেন। আগের সিইও কথা দিলেও নতুন বস ব্র্যাডলি দায়িত্ব নিয়েই জানিয়ে দেন, লিন্ডা পদোন্নতির যোগ্য নন। এরপর একটি ব্যবসায়িক সফরে থাইল্যান্ড যাওয়ার পথে তাঁদের বিমান বিধ্বস্ত হয়। বাকি সবাই মারা গেলেও বেঁচে যান কেবল লিন্ডা ও ব্র্যাডলি। থাইল্যান্ড উপসাগরের এক নির্জন দ্বীপে আটকা পড়েন দুজন।

জঙ্গলে টিকে থাকার কোনো অভিজ্ঞতাই ব্র্যাডলির নেই, সঙ্গে পায়ে গুরুতর চোট। বিপরীতে শখের বশে ‘সারভাইভাল ট্রেনিং’ নেওয়া লিন্ডা শিকার করতে জানেন; জানেন আশ্রয় বানানোর ও ক্ষতস্থান বাঁধার কৌশল। অফিসে যে কর্মীকে ব্র্যাডলি কখনো পাত্তাই দেননি, এখন জীবন বাঁচাতে সেই কর্মীর ওপরই তাঁকে পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে। ক্ষমতার সমীকরণ উল্টে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে শুরু হয় মূল কাহিনি।

‘সেন্ড হেল্প’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

র‍্যাচেল ম্যাকঅ্যাডামস এমনিতেই বেছে কাজ করতে পছন্দ করেন। ২০০৪ সালে একই বছর ‘মিন গার্লস’ ও ‘দ্য নোটবুক’ নামের সম্পূর্ণ দুই মেরুর দুটি ছবিতে অভিনয় করে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। পরে ‘স্পটলাইট’ বা ‘ট্রু ডিটেকটিভ’ সিরিজেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। তবে ‘সেন্ড হেল্প’ ছবিতে লিন্ডা চরিত্রে তিনি যেন আগের সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছেন। অফিসের সেই নিষ্প্রভ ও জড়সড় লিন্ডা কীভাবে জনমানবহীন দ্বীপে গিয়ে আত্মবিশ্বাসী এক নারীতে পরিণত হন, সেই রূপান্তর ম্যাকঅ্যাডামস অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্দায় তুলে এনেছেন। হাসির দৃশ্য হোক বা গুরুগম্ভীর মুহূর্ত—তাঁর পরিমিতিবোধ এককথায় অসাধারণ।

ডিলান ও’ব্রায়েনকে দর্শক মূলত ‘মেজ রানার’ দিয়ে চিনলেও এখানে তিনি অভাবনীয় পরিণতিবোধ দেখিয়েছেন। ব্র্যাডলি চরিত্রটি চরম অহংকারী ও আত্মকেন্দ্রিক হলেও ডিলানের অভিনয়ের গুণে তাকে পুরোটা সময় ঘৃণা করা যায় না। ছোট ছোট অভিব্যক্তিতে তিনি বুঝিয়েছেন এই বিরক্তিকর মানুষটার ভেতরেও অন্য রকম একটি সত্তা লুকিয়ে আছে। লিন্ডাকে ছাড়া দ্বীপে একা পড়ে থাকার দৃশ্যটিতে তার মুখের অভিব্যক্তিগুলো যেকোনো দর্শকের মনে দাগ কাটবে।

‘সেন্ড হেল্প’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

ভয় আর হাসির অদ্ভুত রসায়ন তৈরিতে স্যাম রাইমির জুড়ি মেলা ভার। ‘ইভিল ডেড টু’ ছবিতে রক্ত আর কৌতুকের মিশেলে তিনি যে নতুন ধারার জন্ম দিয়েছিলেন, তার ছাপ এই ছবিতেও স্পষ্ট। এখানে ভয়ের দৃশ্যের পরপরই অত্যন্ত সাবলীলভাবে হাসির দৃশ্য চলে আসে, দর্শক একঘেয়েমির সুযোগই পান না। ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের কাজ কিছু জায়গায় কাঁচা মনে হলেও রাইমির কাজের সঙ্গে পরিচিত দর্শকদের কাছে এটি তার স্বভাবসুলভ স্টাইল হিসেবেই মনে হবে।

আরও পড়ুন

চিত্রনাট্যকার ড্যামিয়ান শ্যানন ও মার্ক সুইফটের মুনশিয়ানা চোখে পড়ার মতো। শুরুতে দর্শক খুব সহজেই ধরে নেন তারা কার পক্ষে আছেন। কিন্তু গল্প যত এগোয়, সেই প্রাথমিক নিশ্চয়তা ধীরে ধীরে নড়বড়ে হতে থাকে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের বঞ্চনার বিষয়টিও গল্পে নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে।

তবে চিত্রনাট্যের কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়ে। যেমন অফিসের দৃশ্যগুলোতে লিন্ডাকে একটু বেশিই অদ্ভুতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্র্যাডলির পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব বোঝাতে লিন্ডাকে আলাদা করে এতটা জড়সড় দেখানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না। আর যদি তা করতেই হয়, তবে ছবির একেবারে শেষে বা এন্ড ক্রেডিটে লিন্ডাকে অতটা অভিজাতরূপে দেখানোর দরকার ছিল না। পুরো ছবির বুনো ও অগোছালো মেজাজের সঙ্গে শেষের এই পরিপাটি রূপ ঠিক মানানসই মনে হয় না।

ছোটখাটো এই ত্রুটিগুলো বাদ দিলে ‘সেন্ড হেল্প’ অবশ্যই দেখার মতো একটি সিনেমা। যাঁরা হরর সিনেমায় খুব একটা অভ্যস্ত নন, তাঁরাও অনায়াসে ছবিটি উপভোগ করতে পারবেন। আর কিছু না হোক, কেবল র‍্যাচেল ম্যাকঅ্যাডামসের অভিনয়ের জাদু দেখতে হলেও ছবিটি অন্তত একবার দেখা উচিত।

‘সেন্ড হেল্প’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি