গ্ল্যামার চরিত্র ছেড়ে নতুন মিম, কেমন হলো ‘লাইফলাইন’
ওটিটিতে থ্রিলার, ক্রাইম আর অ্যাকশন গল্পের ভিড়ে মানবিক গল্প যেন খুঁজেই পাওয়া যায় না। সেই জায়গায় আলাদা করে নজর কাড়ে চরকির ‘লাইফলাইন’। ওয়েব ফিল্মটির নির্মাতা কাজী আসাদ এমন একটি গল্প বেছে নিয়েছেন, যার কেন্দ্রে রয়েছে সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা; সর্বোপরি বাবা আর মেয়ের গল্প। প্রিয় মানুষটিকে বাঁচাতে কত দূর যেতে পারে একজন মানুষ, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে ‘লাইফলাইন’।
একনজরে
সিনেমা: ‘লাইফলাইন’
ধরন: ড্রামা
গল্প: মাহমুদুল হাসান টিপু ও কাজী আসাদ
চিত্রনাট্য: আসাদুজ্জামান আবীর ও কাজী আসাদ
পরিচালক: কাজী আসাদ
অভিনয়: বিদ্যা সিনহা মিম, খায়রুল আলম সবুজ, রেজওয়ান পারভেজ, আ খ ম হাসান, গাজী রাকায়েত, নাজনীন হাসান চুমকি, ফাতেমাতুজ জোহরা ইভা, আনিসা নুর আয়াত
স্ট্রিমিং: চরকি
রানটাইম: ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র অনন্যা (বিদ্যা সিনহা মিম)। শুরুতেই তাঁকে নৌকা থেকে অচেনা এক চরে নামতে দেখা যায়। গ্রামের মেঠোপথে উঠে আসতেই তাকে ঘিরে ধরে বাইকচালকেরা। সবাই তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে চায়। কিন্তু যখন জানতে পারে অনন্যা অনেক দূরের জোঁকের চরে যাবে, তখন সবার উৎসাহে যেন ভাটা পড়ে। দুর্গম সে পথে কেউই যেতে চায় না। কিছুক্ষণ পর আরেক বাইকচালক কোরবানের (রেজওয়ান পারভেজ) সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। শুরুতে দোনোমনা করলেও টাকার অঙ্ক শুনে রাজি হয়ে যায় কোরবান। জোঁকের চর যাওয়া তো হয়। কিন্তু অনন্যার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি আক্কাস আলীকে (আ খ ম হাসান) খুঁজে পাওয়াটা হয়ে ওঠে দুষ্কর। কেন আক্কাস আলীকে খুঁজছে অনন্যা? কেনইবা এত তাড়া? শেষ পর্যন্ত কি আক্কাসকে খুঁজে পায় অনন্যা?
বেশ ধীরগতিতেই শুরু হয় সিনেমা। প্রথম দিকে গ্রামের মেঠোপথ ধরে এগিয়ে চলা অনন্যা ও কোরবানকে ছাড়া আর তেমন কোনো গল্পই নেই। অনন্যা খুঁজছে এক ব্যক্তিকে আর একের পর এক ব্যর্থতা তাকে কখনো করে তুলছে বিচলিত, কখনো উদাস কিংবা চিন্তিত। তবে এখানেই হয়তো পরিচালক নিজস্বতা। গল্পকে তিনি অতি নাটকীয় করতে চাননি। বরং বড় কোনো নাটকীয়তা ছাড়াই ধীরে ধীরে দর্শককে চরিত্রগুলোর ভেতরে প্রবেশ করাতে চেয়েছেন তিনি।
প্রথমার্ধে গল্পে খুব একটা গতি না থাকলেও গ্রামের ভিজ্যুয়াল মুগ্ধ করে। কাজী আসাদের আগের কাজ ‘আধুনিক বাংলা হোটেল’ সিনেমাটিতেও ব্যাপারটি ছিল। শহুরে চেনা পরিবেশ থেকে বেরিয়ে মফস্সলের গল্প দেখাটা ছিল চোখের আরাম। এবারও নদী, চর, কাঁচা রাস্তা আর গ্রামবাংলার প্রকৃতি আলাদা চরিত্র হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সূর্যমুখী বাগানের ভেতর বাইক যখন এগিয়ে যায়, সে দৃশ্য চোখে লেগে থাকে। এ জন্য চিত্রগ্রাহক ড্যানিয়েল হাওলাদারের কাজও প্রশংসনীয়। দ্বিতীয়ার্ধে গল্পের জট খুলতে শুরু করে, ফলে গতি ফিরে পায় চলচ্চিত্র।
অনন্যা চরিত্রে বিদ্যা সিনহা মিম তাঁর সাম্প্রতিক কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম পরিণত অভিনয় করেছেন। মিম দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে একজন ভালো অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে আসছেন। ‘লাইফলাইন’ সেই যাত্রায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। গ্ল্যামারের মোড়ক ছেড়ে একেবারে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ের ভূমিকায় তিনি নিজেকে বেশ ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
তাঁর বাবার চরিত্রে খায়রুল আলম সবুজ ছিলেন যথাযথ। স্বল্প সময়ে তাঁর উপস্থিতিতে বাবা-মেয়ের আন্তরিক সম্পর্ককে দেখালেও তাঁকে পর্দায় আরেকটু সময় দিতে পারতেন নির্মাতা; তাতে গল্পের বুনন আরেকটু জমত। তেমনি কোরবান ও হালিমার (রেজওয়ান পারভেজ ও ফাতেমাতুজ জোহরা ইভা) রসায়নকে সাব প্লট হিসেবে আরেকটু বিকশিত করার সুযোগ ছিল। কোরবান চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজ বেশ ভালো। কিছুদিন আগে চরকির ‘চা গরম’ ওয়েব সিনেমাতেও তিনি নিজের চরিত্রে সাবলীল ছিলেন। তবে চা গরম আর ‘লাইফলাইন’–এ তাঁর চরিত্রের মধ্যে একটা যোগ আছে; দুটি চরিত্রই সিনেমার প্রধান চরিত্রের একধরনের গাইড হিসেবে কাজ করে।
ভিন্নধর্মী চরিত্রে আবারও চমকে দিয়েছেন আ খ ম হাসান। দর্শক তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে মূলত কৌতুক অভিনেতা হিসেবেই দেখে এসেছেন। ঈদের ওয়েব ফিল্ম ‘তাজমহল’–এর পর ‘লাইফলাইন’–এও তিনি ব্যতিক্রমী চরিত্র পেয়েছেন। অসহায় বাবা হিসেবে তিনি চমৎকার অভিনয় করেছেন। ছোট চরিত্র হলেও স্বল্প উপস্থিতিতেও তিনি দর্শকের মনে দাগ কেটে যান। গাজী রাকায়েতও খল চরিত্রে ভালো। এ ছাড়া শিশুশিল্পী আনিসা নুর আয়াত ও অন্যান্য সহ–অভিনয়শিল্পীর অভিনয়ও বিশ্বাসযোগ্য।
এই সিনেমার মেজাজের সঙ্গে মিলিয়ে আবহ সংগীত ব্যবহার মিনিমাল। আবেগঘন জায়গায় অতিরিক্ত সাউন্ড ব্যবহার করা হয়নি। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় জায়গায় নীরবতার ব্যবহারও সমানভাবে কার্যকর ছিল। জাহিদ নিরব এখানে প্রশংসার দাবিদার। এ সিনেমায় দুটি গান রয়েছে। দেবাশীষ দাসের কণ্ঠে ‘খুঁজতে খুঁজতে’ ও ঐশীর কণ্ঠে ‘আমারে নাও’ গল্পের আবহের সঙ্গে মানিয়েছে।
যাঁরা দ্রুতগতির থ্রিলার বা টুইস্ট–নির্ভর গল্প খোঁজেন, তাঁদের কাছে ‘লাইফলাইন’ কিছুটা ধীরগতির মনে হতে পারে। তবে যাঁরা আবেগঘন ও মানবিক গল্প দেখতে চান; এই সিনেমা তাঁদের ভালো লাগবে।