প্রিয়াঙ্কা কি এবার ‘ধোঁকা’ দিলেন

‘দ্য ব্লাফ’ সিনেমায় প্রিয়াঙ্কা। আইএমডিবি

স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের যুগে মাঝারি মানের বড় বাজেটের অ্যাকশন সিনেমা বানানো যেন এক অদ্ভুত ‘দক্ষতা’র ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন সিনেমা যেটা খুব ভালোও নয়, আবার একেবারে খারাপও নয়—কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে থাকে। ১৯ শতকের দস্যুদের নিয়ে নির্মিত প্রিয়াঙ্কা চোপড়া–জোনাস অভিনীত ‘দ্য ব্লাফ’ ঠিক সেই ধরনেরই একটি উদাহরণ। বিপুল বাজেট, বড় পরিসরের প্রযোজনা, রক্তাক্ত লড়াই—সবই আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছবিটি এমনভাবে গড়পড়তা হয়ে থাকে যে খুব বেশি মনে রাখার মতো কিছুই তৈরি করতে পারে না।

একনজরে
সিনেমা: ‘দ্য ব্লাফ’
ধরন: অ্যাকশন থ্রিলার
পরিচালক: ফ্র্যাঙ্ক ই ফ্লাওয়ার্স
অভিনয়: প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাস, কার্ল আরবান
স্ট্রিমিং: অ্যামাজন প্রাইম ভিডিও
দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৪১ মিনিট

সিনেমাটি মুক্তির আগে এক সাক্ষাৎকারে প্রিয়াঙ্কা বলেছিলেন, বলিউডে কাজ করতে গিয়ে নিজেকে অনেক সময় সীমাবদ্ধ মনে হতো। কিন্তু হলিউডে মনোযোগ দেওয়ার পর তিনি কি সেই ‘সীমাবদ্ধতা’ ভাঙতে পেরেছেন? কারণ, এই সময়ে তাঁর অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে খুব বেশি উল্লেখযোগ্য কাজ নেই। ২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য হোয়াইট টাইগার’ কেবল ব্যতিক্রম। সে যাই হোক, আসা যাক ‘দ্য ব্লাফ’ প্রসঙ্গে।

এখন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো যেন মধ্যম মানের সিনেমাকে প্রায় বৈধতা দিয়ে ফেলেছে। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি যেন নতুন এক শিল্পরীতিতে পরিণত হয়েছে—যেখানে সিনেমা তৈরি হয়, দর্শক দেখেও ফেলে, কিন্তু খুব বেশি দিন মনে থাকে না। অভিনেত্রী ছাড়াও ছবিটির অন্যতম প্রযোজকও প্রিয়াঙ্কা; সঙ্গে আছেন হলিউডের পরিচিত প্রযোজক জুটি রুশো ভ্রাতৃদ্বয়। কিন্তু এত হেভিওয়েট প্রযোজকেরাও সিনেমাটি নিয়ে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন না। ছবিতে কিছুটা নির্মম সহিংসতা আছে, কেন্দ্রীয় চরিত্রে প্রাণবন্ত অভিনয়ও আছে—তবু ছবির শেষ দৃশ্যের পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই এর নির্দিষ্ট কোনো মুহূর্ত মনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

‘দ্য ব্লাফ’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

ছবির প্রধান চরিত্রে আছেন এরসেল বোডেন (প্রিয়াঙ্কা চোপড়া)। চরিত্রটি আদতে একটি আদর্শ অ্যাকশন নায়িকার ছাঁচে তৈরি—যাঁর অতীত একসময় ফিরে এসে তাঁকে আবার লড়াইয়ে নামতে বাধ্য করে। গল্পের সময়কাল ১৮৪৬ সাল। ক্যারিবীয় অঞ্চলের এক শান্ত দ্বীপে ছেলে ও ভাবির সঙ্গে সাধারণ জীবন কাটাচ্ছেন এরসেল। তাঁর নাবিক স্বামী সমুদ্রযাত্রায় গেছেন, আর তিনি অপেক্ষা করছেন তাঁর ফিরে আসার জন্য। কিন্তু হলিউডের সিনেমায় যখন কোনো সুন্দর দ্বীপে সবকিছু খুব শান্ত থাকে, তখনই সাধারণত ঝড় আসে।

আরও পড়ুন

এখানেও তাই হয়। একসময় দ্বীপে হামলা চালায় নির্মম দস্যু অধিনায়ক কনর (কার্ল আরবান)। হারিয়ে যাওয়া সোনার খোঁজে সে পুরো দ্বীপ দখল করে ফেলে। তার হাতে বন্দী হয় এরসেলের স্বামীও। একঝটকায় বদলে যায় এরসেলের জীবন। প্রথমে তাঁকে অসহায় এক নারী হিসেবে দেখা গেলেও দ্রুতই জানা যায়, তিনি নিজেও একসময় দস্যু ছিলেন। অতীতের সেই নির্মম অভিজ্ঞতা তাঁকে আবার লড়াইয়ে নামতে বাধ্য করে।
একটি মাত্র অ্যাকশন দৃশ্যের মধ্যেই চরিত্রের এই রূপান্তর ঘটে—অসহায় গৃহবধূ থেকে হঠাৎ ভয়ংকর প্রতিশোধপরায়ণ যোদ্ধায় পরিণত হন এরসেল। বোঝা যায়, দস্যুদের ভাষা, তাদের কৌশল—সবই তিনি ভালোভাবে জানেন। এমনকি কনরের সঙ্গে তাঁর রক্তাক্ত অতীতের সম্পর্কও আছে। সহজভাবে বললে, ভুল বাড়িতে আক্রমণ করেছিল দস্যুরা।
এরপর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পালাতে থাকেন এরসেল। একই সঙ্গে এগোতে থাকে তাঁর ও কনরের  অবশ্যম্ভাবী মুখোমুখি হওয়ার গল্প। কিন্তু যখন সেই মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্ত আসে, তখন প্রত্যাশিত রোমাঞ্চ তৈরি হয় না। তাঁদের অতীত সম্পর্কের বিষয়ে গল্প খুব বেশি বিশদে যায় না। ফলে সম্ভাব্য মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত কিংবা আবেগঘন উত্তেজনা তৈরি হওয়ার সুযোগও হারিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি খুব সহজ করে দাঁড়ায়—কনর খলনায়ক, আর এরসেল সেই অন্ধকার জীবন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন।
গল্পের কাঠামো অতি পরিচিত। হলিউডের বহু অ্যাকশন ছবির মতোই এখানে অতীতের ছায়া বর্তমানকে তাড়া করে। তবে ছবিটি প্রিয়াঙ্কাকে অভিনয়ের সুযোগ দেয়।

‘দ্য ব্লাফ’ সিনেমার পোস্টার। এক্স থেকে

অভিনয়টি দুভাবে দেখা যায়। বলিউড থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর আত্মনিবেদন প্রশংসনীয়। চরিত্রটির সংলাপ কম, আবেগের প্রকাশও সীমিত; বরং তাঁর এক্সপ্রেশনের ওপরই ভর করে চরিত্রটি এগোয়। গত এক দশকে তার ক্যারিয়ারের নানা অভিজ্ঞতা যেন এই দৃঢ়তায় প্রতিফলিত হয়েছে।

তবে হলিউডের মূলধারার অ্যাকশন ফর্মুলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে অভিনয়টি খুব বেশি আলাদা কিছু নয়। চরিত্রটি এমনভাবে লেখা হয়নি যে অভিনেত্রীর সাংস্কৃতিক পটভূমি বা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যকে আলাদা করে উজ্জ্বল করে তুলতে পারে। তা সত্ত্বেও বলা যায়, এ ধরনের চরিত্রে অনেক অভিনেত্রীকে ব্যর্থ হতে দেখা গেছে। সেই তুলনায় তিনি একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছেন—পুরোপুরি মিশে যাননি, আবার আলাদা করেও চোখে পড়েননি।

‘দ্য ব্লাফ’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

ছবিতে কয়েকটি লড়াইয়ের দৃশ্য আছে, যদিও সরাসরি স্ট্রিমিংয়ের জন্য নির্মিত অনেক ছবির মতো এখানেও অ্যাকশন দৃশ্যের ভাষা খুব স্পষ্ট বা স্বতন্ত্র হয়ে ওঠেনি। তবু একটি জলাভূমির ধাওয়া দৃশ্যে কুমিরের উপস্থিতি কিছুটা আলাদা মুহূর্ত তৈরি করে। আশ্চর্যের বিষয়, সমুদ্রভিত্তিক দস্যুগল্প হওয়া সত্ত্বেও এখানে জলজ প্রাণী বা সমুদ্রের বিস্তৃত দৃশ্য খুব বেশি নেই। বরং এটি এমন এক বিরল দস্যুকাহিনি, যেখানে স্থলভাগের দৃশ্যই বেশি।
একটি দৃশ্যে এরসেল তাঁর ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, দস্যুদের রোমান্টিকভাবে দেখার কোনো কারণ নেই। ছেলে যখন গল্পের বইয়ের নায়কদের মতো দস্যুদের কল্পনা করে, তখন তিনি তাকে থামিয়ে বলেন—‘সত্যিকারের দস্যুরা নায়ক নয়, তারা খুনি।’ তিনি জানান, কনর ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক নির্মম উপনিবেশবাদী সহযোগী। কথাগুলো শুনে মনে হয়, যেন ছেলেকে সতর্ক করা হচ্ছে এমন সব কাল্পনিক নায়কের ব্যাপারে, যারা দস্যুদের রোমাঞ্চকর রূপ তুলে ধরে।

এই মা-ছেলের কথোপকথন শুধু অতীতের গল্প নয়; সময়ের সীমা ছাড়িয়ে এটি আজকের যুগের সঙ্গেও মিল খুঁজে দেয়। উনিশ শতকের সেই সতর্কবাণী যেন একবিংশ শতকের দর্শকদেরও মনে করিয়ে দেয়—সাহিত্য কিংবা সিনেমায় যে বীরত্বের গল্প দেখা যায়, বাস্তবে তার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে নিষ্ঠুর সত্য।

‘দ্য ব্লাফ’ এমন এক সিনেমা, যা একবার দেখা যায়। গল্পের গভীরতা বা স্মরণীয় মুহূর্তের অভাব ছবিটিকে শেষ পর্যন্ত মাঝারি মানের বিনোদন হিসেবেই আটকে রেখে। টাইটেল কার্ড শেষ হওয়ার আগেই ছবির খুব বেশি কিছু মনে থাকে না।