যে চুম্বন বদলে দিয়েছিল স্পেনের ফুটবলকে

‘ইটস অল ওভার: দ্য কিস দ্যাট চেঞ্জড স্প্যানিশ ফুটবল’-এর দৃশ্য। নেটফ্লিক্স

নারী ফুটবলের ইতিহাসে ২০২৩ সালের নারী বিশ্বকাপ ছিল স্পেনের জন্য স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত। প্রথমবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল দেশটি। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক জয়কে ছাপিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে একটি চুম্বন—যে চুম্বন শুধু একজন ফুটবলারের ব্যক্তিগত সীমারেখা লঙ্ঘন করেনি, বরং স্পেনের ক্রীড়া প্রশাসন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নারীদের প্রতি আচরণ নিয়ে এক অভূতপূর্ব সামাজিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল।

সেই ঘটনাকেই কেন্দ্র করে ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায় তথ্যচিত্র ‘ইটস অল ওভার: দ্য কিস দ্যাট চেঞ্জড স্প্যানিশ ফুটবল’। কী আছে এই তথ্যচিত্রে

বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ থেকে বিতর্কের ঝড়
২০২৩ সালের নারী বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। ট্রফি বিতরণ অনুষ্ঠানে খেলোয়াড়দের গলায় পদক পরিয়ে দিচ্ছিলেন স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি লুইস রুবিয়ালেস। সেই সময় তিনি স্পেনের তারকা ফুটবলার হেনি হেরমোসোকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে চুমু খান। ঘটনাটি টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং মুহূর্তেই সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ইনস্টাগ্রাম লাইভে হেনি হেরমোসো জানান, ওই চুম্বন তাঁর অনিচ্ছাকৃত ছিল এবং তিনি সেটি পছন্দ করেননি। এরপরই শুরু হয় বিতর্ক, প্রতিবাদ এবং জবাবদিহির দাবি।

‘সে আকাবো’—এক আন্দোলনের জন্ম
স্প্যানিশ ভাষায় ‘সে আকাবো’ অর্থ—‘এবার শেষ’ বা ‘আর নয়’। স্পেন দলের অন্যতম সেরা ফুটবলার অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস প্রথম এই স্লোগান ব্যবহার করেন। তিনি এবং তাঁর সতীর্থরা ঘোষণা দেন, ফুটবল ফেডারেশনের নেতৃত্বে পরিবর্তন না এলে তাঁরা জাতীয় দলে ফিরবেন না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় ‘সে আকাবো’ হ্যাশট্যাগ। কেবল ফুটবলার নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রীড়াবিদ, জাতিসংঘ, স্পেন সরকার এবং সাধারণ মানুষও এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।

একটি চুম্বনের ঘটনা ধীরে ধীরে নারীদের প্রতি বৈষম্য, হয়রানি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সামাজিক প্রতিবাদে রূপ নেয়।

‘ইটস অল ওভার: দ্য কিস দ্যাট চেঞ্জড স্প্যানিশ ফুটবল’–এর পোস্টার। আইএমডিবি

কী দেখায় তথ্যচিত্রটি?
তথ্যচিত্রটিতে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে মুখ খুলেছেন স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলের বেশ কয়েকজন সদস্য। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হেনি হেরমোসো, অ্যালেক্সিয়া পুতেলাস, আইতানা বোনমাতি, ওলগা কারমোনা, ইভানা আন্দ্রেস প্রমুখ। তথ্যচিত্রে শুধু বিতর্ক নয়, বিশ্বকাপ জয়ের আগের অস্থির সময়, খেলোয়াড়দের সঙ্গে ফেডারেশনের দ্বন্দ্ব, বিশ্বকাপ অভিযানের সংগ্রাম এবং পরবর্তী আন্দোলনের নেপথ্যের গল্পও উঠে এসেছে। তথ্যচিত্রে ফুটবলারদের অনেকেই বলেছেন, তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের আনন্দ শেষ পর্যন্ত অন্যরা ছিনিয়ে নিয়েছিল।
দলের অধিনায়ক ইভানা আন্দ্রেস বলেন, ‘আমরা এত কষ্ট করেছি, এত ত্যাগ স্বীকার করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের সাফল্যের গল্পটা অন্য কেউ দখল করে নিল।’

আরও পড়ুন

পরিচালকের ভাষ্য
তথ্যচিত্রটির পরিচালক হোন্না পারডোস বলেছেন, খেলোয়াড়েরা এমন কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, যা আগে কখনো প্রকাশ্যে বলেননি। তাঁর মতে, এটি শুধু ফুটবলের গল্প নয় বরং এমন এক সময়ের দলিল, যা স্পেনের ক্রীড়া ও সামাজিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।

রুবিয়ালেসের পতন
চুম্বন-কাণ্ডের পর রুবিয়ালেস প্রথমে ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানান। বরং তিনি পদত্যাগ করবেন না বলে ঘোষণা দেন।
ঘটনাকে ঘিরে আরও নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন তাঁর মা স্থানীয় একটি গির্জায় অবস্থান নিয়ে অনশন শুরুর ঘোষণা দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাপক চাপের মুখে রুবিয়ালেস তাঁর পদ হারান এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেও নিষিদ্ধ হন।

শুধু ফুটবল নয়, সমাজের গল্প
তথ্যচিত্রটি  মূলত একটি ফুটবল নিয়ে হলেও এর পরিধি ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে।
এটি এমন এক ঘটনার গল্প, যেখানে বিশ্বকাপজয়ী নারীরা নিজেদের সাফল্যের জন্য নয়, বরং নিজেদের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার জন্যও লড়াই করেছিলেন। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত চুম্বন কীভাবে গোটা দেশের ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল, সেই ইতিহাসই তুলে ধরবে নেটফ্লিক্সের এই তথ্যচিত্র।

ভ্যারাইটি অবলম্বনে