ঝামেলা যখন বেস্ট ফ্রেন্ডের গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে

‘মাই বেস্ট ফ্রেন্ড, হিজ গার্লফ্রেন্ড অ্যান্ড মি’র পোস্টার থেকে। আইএমডিবি

একজনের কাছে বন্ধুত্ব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আরেকজনের কাছে প্রেম। কিন্তু যখন সবচেয়ে কাছের বন্ধুর জীবনে নতুন প্রেম আসে, তখন সমীকরণটা কি আগের মতো থাকে? এই সহজ প্রশ্ন থেকেই তৈরি হয়েছে জার্মান কমেডি সিনেমা ‘মাই বেস্ট ফ্রেন্ড, হিজ গার্লফ্রেন্ড অ্যান্ড মি’। মার্কো পেট্রি পরিচালিত সিনেমাটি ১৪ আগস্ট নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর দর্শকদের নজর কেড়েছে মূলত বন্ধুত্ব, প্রেম, ঈর্ষা ও বড় হয়ে ওঠার অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে হালকা মেজাজে তুলে ধরার কারণে। নেটফ্লিক্সের গ্লোবাল টপ চার্টের নন-ইংলিশ সিনেমার তালিকায় এটি রয়েছে পাঁচে।

তবে সিনেমাটিকে নিখাদ রোমান্টিক কমেডি ভাবলে কিছুটা ভুল হবে। এখানে প্রেমের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে দুই বন্ধুর সম্পর্ক। আর সেই সম্পর্কের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে একজন নারী। ফলে তৈরি হয়েছে হাস্যরস, প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা এবং বন্ধুত্ব হারানোর ভয়—সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক ত্রিভুজ।

গল্পটা আসলে কী?
সিনেমার কেন্দ্রে ওলি ও মাতসে। ছোটবেলা থেকে তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শুধু বন্ধুত্বই নয়, বড় হয়েও তারা একসঙ্গে থাকে, একই রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করে এবং ভবিষ্যতে একসঙ্গে বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনাও করেছে। নেটফ্লিক্সের ভাষায়, তাদের জীবন প্রায় সব দিক থেকেই পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে। এই সাজানো জীবনে হঠাৎ প্রবেশ করে রেবেকা।

মাতসে রেবেকার প্রেমে পড়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই নতুন প্রেম তার জীবনে পরিবর্তন আনতে শুরু করে। কিন্তু এই পরিবর্তন মেনে নিতে পারে না ওলি। কারণ, তার চোখে রেবেকা শুধু বন্ধুর প্রেমিকা নয়, তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের জন্যও হুমকি।
এত দিন মাতসে যে সময়টা ওলির সঙ্গে কাটাত, এখন তার বড় অংশ চলে যাচ্ছে রেবেকার সঙ্গে। একসঙ্গে খেলা, আড্ডা কিংবা পরিকল্পনার জায়গায় এসেছে প্রেম, স্বাস্থ্যকর খাবার, দৌড়ানো এবং নতুন জীবনযাপন। এমনকি তাদের বহুদিনের বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনাও ভেস্তে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করে ওলি। তখনই শুরু হয় আসল লড়াই।

প্রেমিকার বিরুদ্ধে বন্ধুর ‘যুদ্ধ’
ওলি মনে করতে থাকে, রেবেকা তার বন্ধুকে বদলে দিচ্ছে। মাতসে যেন আর আগের মানুষটি নেই। তাই বন্ধুকে ‘বাঁচাতে’ ওলি নিজের মতো করে পরিকল্পনা করতে শুরু করে। এই কাজে তার সঙ্গী হয় আরেক বন্ধু শ্মিত্তি। কিন্তু রেবেকাও সহজ প্রতিপক্ষ নয়। ফলে সিনেমার গল্প এগোয় অনেকটা ‘বন্ধু বনাম প্রেমিকা’ লড়াইয়ের মতো। দুজনেরই লক্ষ্য একই—মাতসেকে নিজের কাছে রাখা। একজন চায় বন্ধুকে হারাতে না, অন্যজন চায় প্রেমিকের জীবনে নিজের জায়গাটা নিশ্চিত করতে। এই জায়গাতেই সিনেমাটি প্রচলিত প্রেমের ত্রিভুজ থেকে একটু আলাদা হয়ে যায়।
এখানে নায়ক-নায়িকা দুজনের মাঝখানে তৃতীয় ব্যক্তি কোনো প্রেমিক বা প্রেমিকা নন; বরং সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

বন্ধুত্ব যখন প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী
সিনেমাটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় সম্ভবত এই প্রশ্ন—একজন মানুষের জীবনে বন্ধুত্ব আর প্রেমের জায়গা কি আলাদা করা যায়? বাস্তব জীবনে অনেক বন্ধুত্বই ভেঙে যায় নতুন সম্পর্কের কারণে। স্কুল-কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিদিনের যোগাযোগ কমে যায়, প্রেমিক বা প্রেমিকার সঙ্গে সময় বাড়ে। কারও কারও কাছে বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও অন্য পক্ষের কাছে তা হয়ে উঠতে পারে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতি। সিনেমাটি সেই অনুভূতিকেই কমেডির মোড়কে সামনে এনেছে।
ওলির আচরণ অনেক সময় অতিরঞ্জিত, শিশুসুলভ কিংবা বিরক্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু তার ভেতরের ভয়টা খুব পরিচিত, ‘আমার সবচেয়ে কাছের মানুষটি কি আমাকে ছেড়ে অন্য কারও হয়ে যাচ্ছে?’ এই ভয়ই সিনেমার আবেগের জায়গা।

‘মাই বেস্ট ফ্রেন্ড, হিজ গার্লফ্রেন্ড অ্যান্ড মি’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

শুধু প্রেম নয়, বড় হয়ে ওঠার গল্পও
সিনেমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুই বন্ধুর বয়স বাড়লেও মানসিকভাবে কোথাও যেন তাঁরা পুরোনো জায়গাতেই আটকে আছে। মাতসে নতুন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে জীবনের পরবর্তী ধাপে যেতে চাইছে। আর ওলি যেন সেই পরিবর্তন মেনে নিতে পারছে না। সে চায় সবকিছু আগের মতোই থাকুক—বন্ধু থাকবে, একসঙ্গে থাকবে, একইভাবে সময় কাটাবে, পুরোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু জীবন তো সব সময় একই জায়গায় থাকে না।

একজন মানুষের জীবনে প্রেম এলে বন্ধুত্বের ধরন বদলাতে পারে। কাজ, পরিবার, সম্পর্ক—সবকিছুই সময়ের সঙ্গে নতুন ভারসাম্য দাবি করে। সিনেমাটি সেই পরিবর্তনকে মজার ঘটনা ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছে।

তিন অভিনয়শিল্পীর রসায়ন
সিনেমার প্রধান তিন চরিত্রে অভিনয় করেছেন কোস্টিয়া উলমান, ডেভিড ক্রস ও জানিনা উহসে। ওলির চরিত্রে উলমান, মাতসের চরিত্রে ক্রস ও রেবেকার চরিত্রে উহসে। তিনজনের রসায়নই সিনেমার অন্যতম বড় শক্তি।
বিশেষ করে রেবেকাকে নিছক ‘খারাপ প্রেমিকা’ হিসেবে দেখানো হয়নি। সে বুঝতে পারে, ওলি তাঁর সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে ওলিকে সামলাতেও সে নিজের কৌশল ব্যবহার করে। এই দ্বন্দ্বই সিনেমায় বারবার নতুন পরিস্থিতি তৈরি করে।

‘মাই বেস্ট ফ্রেন্ড, হিজ গার্লফ্রেন্ড অ্যান্ড মি’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

নেটফ্লিক্সের জন্য আদর্শ ‘লাইট’ সিনেমা
সিনেমাটির জনপ্রিয়তার একটি কারণ হতে পারে এর সহজ দর্শকবান্ধব কাঠামো। নেটফ্লিক্সে সিনেমাটি ১ ঘণ্টা ৩৮ মিনিটের কমেডি হিসেবে জায়গা পেয়েছে। ভাষা জার্মান; তবে প্ল্যাটফর্মে একাধিক ভাষার অডিও ও সাবটাইটেলের সুবিধাও রয়েছে।
গল্প বুঝতে খুব বেশি প্রস্তুতির দরকার নেই। চরিত্রগুলোও দ্রুত পরিচিত হয়ে যায়। ফলে কাজের ফাঁকে, রাতে বা সপ্তাহান্তে হালকা কিছু দেখতে চাওয়া দর্শকদের জন্য এটি সহজ পছন্দ।

আর সিনেমাটির মূল দ্বন্দ্বও খুব পরিচিত—বন্ধু বনাম প্রেমিকা। ফলে জার্মান সিনেমা হলেও এর পরিস্থিতিগুলো আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে সহজেই বোধগম্য।

আরও পড়ুন

সমালোচকেরা অবশ্য পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন
দর্শকের আগ্রহ আর সমালোচকের প্রশংসা—দুটো সব সময় এক পথে হাঁটে না। এই সিনেমার ক্ষেত্রেও তেমনটা দেখা যাচ্ছে। রটেন টমেটোজে এখনো সমালোচকের সংখ্যা খুব কম; সেখানে সিনেমাটির একটি সমালোচনা রয়েছে। সেই রিভিউতে সিনেমাটির ধারণাকে আকর্ষণীয় বলা হলেও বাস্তবায়ন নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে।
আরেক সমালোচনায় বলা হয়েছে, সিনেমাটি দুই বন্ধুর সম্পর্ক ও নতুন প্রেমের সংঘাতকে মজার ভাবে ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েও অনেক জায়গায় সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। তবু নেটফ্লিক্সে দর্শকের আগ্রহ তৈরি হওয়ার জন্য সব সময় অসাধারণ সমালোচনাও দরকার হয় না।

‘মাই বেস্ট ফ্রেন্ড, হিজ গার্লফ্রেন্ড অ্যান্ড মি’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

তাহলে জনপ্রিয়তার রহস্য কোথায়?
প্রথমত, বিষয়টি পরিচিত। পৃথিবীর প্রায় সব দর্শকই কোনো না কোনোভাবে বন্ধুত্ব ও প্রেমের দ্বন্দ্ব বুঝতে পারেন। দ্বিতীয়ত, কমেডির মোড়ক। গল্পে আবেগ থাকলেও সিনেমাটি ভারী হয়ে ওঠে না। ঝগড়া, ঈর্ষা, পরিকল্পনা আর পাল্টা পরিকল্পনা—সবকিছুই হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে এগোয়।

তৃতীয়ত, চরিত্রগুলোর সম্পর্কের টানাপোড়েন। দর্শককে বারবার ভাবতে হয়, ওলি কি সত্যিই বন্ধুকে রক্ষা করতে চাইছে, নাকি নিজের একাকিত্ব থেকে পালাতে চাইছে? রেবেকা কি মাতসেকে বন্ধুর কাছ থেকে সরিয়ে নিচ্ছে, নাকি নিজের সম্পর্কটাকে রক্ষা করছে?

সবশেষ কারণ সম্ভবত নেটফ্লিক্সের মতো বৈশ্বিক পৌঁছানো। জার্মান ভাষার একটি সিনেমা খুব সহজেই বিশ্বের নানা দেশের দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত এটি কার গল্প?
শুধু মাতসে ও রেবেকার প্রেমের গল্প নয়। শুধু ওলির বন্ধুত্বের গল্পও নয়। এটি আসলে সেই মুহূর্তের গল্প, যখন জীবনে পরিবর্তন আসে এবং পুরোনো সম্পর্কগুলোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। মাতসে প্রেমে পড়েছে। রেবেকা নতুন সম্পর্ককে নিজের মতো করে গড়ে তুলতে চায়। আর ওলি ভয় পাচ্ছে, তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটিকে সে হারিয়ে ফেলবে। এই তিনজনের টানাপোড়েনই ‘মাই বেস্ট ফ্রেন্ড, হিজ গার্লফ্রেন্ড অ্যান্ড মি’-এর মূল আকর্ষণ।

আইএমডিবি, নেটফ্লিক্সডটকম ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে