দাম্পত্যের টানাপোড়েন, যৌনতা আর অস্বস্তিকর ডিনার পার্টির গল্প
দুই দম্পতির ডিনার পার্টিকে ঘিরে সিনেমা—এ কথা জানার পরই দর্শক হিসেবে আমাদের মনে প্রত্যাশা তৈরি হয়ে যায়। সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেসব প্রত্যাশা যেন আমাদের ডিএনএর মধ্যেই মিশে আছে। প্রথমে কথাবার্তা হবে হালকা, মজার, ব্যঙ্গাত্মক। সন্ধ্যা যত গড়াবে, ভদ্রতার মুখোশ খুলে যাবে; প্রকাশ পাবে নির্মম কোনো সত্য। অলিভিয়া ওয়াইল্ডের ‘দ্য ইনভাইট’ এই প্রত্যাশাগুলোই পূরণ করে।
একনজরে
সিনেমা: ‘দ্য ইনভাইট’
ধরন: ড্রামা
পরিচালনা: অলিভিয়া ওয়াইল্ড
অভিনয়: সেথ রোগান, অলিভিয়া ওয়াইল্ড, এডওয়ার্ড নর্টন ও পেনেলোপে ক্রুজ
দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট
স্ট্রিমিং: এইচবিও ম্যাক্স
সিনেমার কেন্দ্রে আছেন জো (সেথ রোগান) ও অ্যাঞ্জেলা (অলিভিয়া ওয়াইল্ড)—সান ফ্রান্সিসকোর সাধারণ এক দম্পতি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার উদ্দেশ্যে পাশের ফ্ল্যাটের দম্পতি—পিনা (পেনেলোপে ক্রুজ) ও হককে (এডওয়ার্ড নর্টন) রাতের খাবারের আমন্ত্রণ জানান অ্যাঞ্জেলা। বেশ ভদ্র পরিবেশে শুরু হয় রাতের খাবার। চারজনই নিজেদের জীবন, পেশা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে দাম্পত্য ও যৌনজীবনের দিকে বাঁক নেয় কথোপকথনের বিষয়। একপর্যায়ে পিনা ও হকের কাছ থেকে আসে অদ্ভুত এক ‘আমন্ত্রণ’। তখনই সিনেমাটি প্রথার্ধের খানিকটা ঢিমেতাল ভুলে অন্য উচ্চতায় চলে যায়।
ছবিটির সবচেয়ে অভিনব দিকগুলোর একটি এর টোন। ওপরে ওপরে এটি দারুণ মজার কিন্তু ভেতরে-ভেতরে সিরিয়াস। নির্মাণে উডি অ্যালেনের প্রভাব স্পষ্ট, সবচেয়ে স্পষ্ট জো চরিত্রে। জো একসময় একটি ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন। কিন্তু স্বপ্ন পূরণ না হওয়ায় এখন একটি কলেজে সংগীত পড়ান। জীবনের প্রতি তাঁর একধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা, পিঠের ব্যথা আর পেশাগত ব্যর্থতা তাঁকে ক্রমেই খিটখিটে করে তুলেছে। অন্যদিকে অ্যাঞ্জেলা চেষ্টা করেন সংসারটাকে স্বাভাবিক রাখতে। অ্যাঞ্জেলা আর্ট স্কুল থেকে পড়াশোনা করলেও সেই শিক্ষা নিয়ে আর এগোননি। অ্যাঞ্জেলা স্নায়ুচাপে থাকা এক নারী।
আর জো যেন উডি অ্যালেন ও ল্যারি ডেভিডের সেই রসিক ও বিরক্তিকর মানুষ যে সবকিছুতেই খুঁত ধরে। দ্য ইনভাইট–এর সঙ্গে রোমান পোলানস্কির ‘কারনেজ’–এরও মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ইয়াসমিনা রেজার মঞ্চনাটক অবলম্বনে নির্মিত সেই ছবিতেও চারজন মানুষকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল নানা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি।
সিনেমাটির আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো সংলাপের প্রবাহ। চরিত্রগুলো প্রায়ই একে অন্যের কথার ওপরে কথা বলে—যেভাবে বাস্তব জীবনে মানুষ কথা বলে। তার সঙ্গে থাকে বুদ্ধিদীপ্ত পাল্টা জবাব। ফলে এখানে যে ঘরোয়া রাগ ও বিরক্তি দেখানো হয়েছে, সেটিও উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
চার অভিনেতাই দুর্দান্ত। সেথ সেথ রোগান তাঁর পরিচিত খসখসে, যুক্তিবাদী চরিত্রের ওপর দাঁড়িয়েই জো চরিত্রটিকে নির্মাণ করেছেন। অলিভিয়া ওয়াইল্ডও অ্যাঞ্জেলা চরিত্রে আকাঙ্ক্ষা, অসুখী জীবন আর এখনো আঁকড়ে থাকা স্বপ্নের এত রকমের অস্থিরতা ফুটিয়ে তুলেছেন, যা তারিফ করার মতোই। এডওয়ার্ড নর্টনের হক চরিত্রটি দর্শককে হাসায়। কিন্তু যখন তাঁর নিজের জীবনের গল্প সামনে আসে, তখন একটি মনোলগের সময় চুপ হয়ে যেতে হয়। আর পেনেলোপে ক্রুজের পিনা তো এই পুরো ঘটনার অনুঘটক।
দ্য ইনভাইট নিখুঁত নয়। বরং প্রথমার্ধ বেশ বিরক্তিকর। শুরুতে দর্শককে মুগ্ধ করার জন্য সিনেমাটি একটু বেশিই চেষ্টা করে। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে সহজ, স্বচ্ছন্দ ছন্দে পৌঁছে যায়। তখন আর মনে থাকে না যে কেউ আমাদের একটি গল্প শোনাচ্ছে। মনে হয়, কেবল কয়েকজন মানুষের জীবনযাপন দেখছি।
দুই দম্পতির যন্ত্রণাদায়ক এক ডিনার পার্টির মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্ত বিবাহিত জীবনের নানা অসংগতি ও ভণ্ডামিকে তুলে ধরেছে দ্য ইনভাইট। অল্প বাজেটে, চার অভিনয়শিল্পী নিয়ে চার দেয়ালে বন্দী গল্পকে যেভাবে উপভোগ্য বানিয়েছেন, সে জন্যও অলিভিয়া ওয়াইল্ড ধন্যবাদ পাবেন।