‘চক্র ২’: সমাধান, না আরও জটিল রহস্য
ময়মনসিংহের একটি পরিবারের ৯ সদস্যের রহস্যজনক আত্মহত্যা—দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা সেই ঘটনাকে প্রেরণা হিসেবে নিয়ে নির্মিত ‘চক্র’। প্রথম মৌসুমে সেই ঘটনার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার কিছু দরজা খুললেও শেষ পর্যন্ত রহস্যকে পুরোপুরি উন্মোচন করা হয়নি। বরং ইচ্ছাকৃতভাবেই কিছু প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখে দর্শককে ভাবনার ভেতরে আটকে রাখা হয়েছিল। সেই অসমাপ্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রতিশ্রুতি নিয়েই ২৬ মার্চ এসেছে ‘চক্র ২’। তবে এটি কেবল উত্তর দেওয়ার সিরিজ নয়; বরং প্রশ্নকে আরও গভীর করে, মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে আরও জটিলভাবে তুলে ধরার এক প্রচেষ্টা।
নির্মাতা ভিকি জাহেদ এই মৌসুমে গল্প শুরু করেছেন ঠিক সেই জায়গা থেকে, যেখানে আগের মৌসুম শেষ হয়েছিল। একটি পরিবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর সেই সংকটময় মুহূর্তে পরিবারের সদস্য লুবনা সাহায্যের আশায় যোগাযোগ করে শিক্ষক হুমায়ূনের সঙ্গে। কিন্তু প্রত্যাশিত সহায়তার বদলে হুমায়ূনের আচরণই রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে তোলে। এখানেই ‘চক্র ২’ নিজেকে আলাদা করে—এটি রহস্য ভাঙার গল্প নয়, বরং রহস্যের ভেতরে ঢুকে পড়ার গল্প।
ভিকি জাহেদের কাজের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তিনি শুধু ধারাবাহিকভাবে কাজ করছেন না—একটি স্বতন্ত্র ধারাও নির্মাণ করছেন। ‘পুনর্জন্ম’, ‘আকা’, ‘রেডরাম’, ‘দ্য সাইলেন্স’, ‘চক্র’—প্রতিটি কাজই মুক্তির পর আলোচনায় এসেছে, দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—একধরনের মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ভাষা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ‘পুনর্জন্ম’ সিরিজটি যে ধরনের আলোড়ন তৈরি করেছিল, তা বাংলাদেশের ওটিটি কনটেন্টের দর্শককে নতুন এক ঘরানার সঙ্গে পরিচয় করায়। সেই ধারাবাহিকতায় ‘চক্র ২’ শুধু একটি সিকুয়েল নয়; বরং নির্মাতার ভাবনার একটি বিস্তৃত রূপ—যেখানে গল্প, চরিত্র এবং মনস্তত্ত্ব—সবকিছুর স্তর আরও গভীর হয়েছে।
এই সিরিজের কেন্দ্রে আছে মানুষের মনস্তত্ত্ব। ‘নিয়ন্ত্রণ’—একটি শব্দ, যা গল্পের ভেতর বারবার ফিরে আসে। হুমায়ূনের সংলাপ—‘অ্যানিকে আমি নিয়ন্ত্রণ করেছি মায়া, ভালোবাসা আর নির্ভরতা দিয়ে’—শুধু একটি সম্পর্কের ভাষ্য নয়, বরং পুরো সিরিজের দার্শনিক ভিত্তি। মানুষ অন্য মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, কিন্তু নিজের ভেতরের লোভ, লালসা বা ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে? এই প্রশ্নই সিরিজটির ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়।
ভিকি জাহেদের কাজের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তিনি শুধু ধারাবাহিকভাবে কাজ করছেন না—একটি স্বতন্ত্র ধারাও নির্মাণ করছেন। ‘পুনর্জন্ম’, ‘আকা’, ‘রেডরাম’, ‘দ্য সাইলেন্স’, ‘চক্র’—প্রতিটি কাজই মুক্তির পর আলোচনায় এসেছে, দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—একধরনের মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ভাষা তৈরি করেছে।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতায় আছে, ‘আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকি—তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখব বলে।’ মানুষের ভেতরের মানুষ, মুখোশের আড়ালের আসল মানুষ। কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কতটুকু জানা যায়? ততটুকুই জানা সম্ভব যতটুকু প্রকাশিত। ‘চক্র ২’ যেন সেই অদেখা মানুষটির অনুসন্ধান করে। বাইরে থেকে আমরা যে মানুষটিকে দেখি, তার ভেতরে যে আরেকটি জটিল, কখনো অন্ধকারাচ্ছন্ন সত্তা লুকিয়ে থাকে—এই সিরিজ সেই স্তরগুলোকে একে একে উন্মোচন করে।
চরিত্র নির্মাণ এই সিরিজের সবচেয়ে বড় শক্তি। এখানে কোনো চরিত্র একমাত্রিক নয়। প্রত্যেকেই একধরনের দ্বন্দ্বের ভেতরে বাস করে। অ্যানি চরিত্রে আজমেরী হক বাঁধন তাঁর অভিনয়ের সূক্ষ্মতা দিয়ে চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছেন। স্বামীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানসিক অবসাদের মধ্যে থাকে অ্যানি। তাঁর চোখের ভাষা, সংলাপের গতি এবং নীরবতার ব্যবহার—সব মিলিয়ে অ্যানির মানসিক বিপর্যয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হুমায়ূন চরিত্রে তৌসিফ মাহবুব এই সিরিজের কেন্দ্রীয় শক্তি। তিনি চরিত্রটিকে ‘ওভার’ না করে, বরং সংযত অভিনয়ের মাধ্যমে একধরনের ভয়ংকর বাস্তবতা তৈরি করেছেন। তাঁর চোখের চাহনি, সংলাপের ভঙ্গি—সবকিছুতেই একধরনের নিয়ন্ত্রিত শীতলতা আছে, যা চরিত্রটিকে আরও অস্বস্তিকর করে তোলে। অতীত ও বর্তমান—দুই সময়ের মধ্যে তাঁর অভিনয়ের পার্থক্যও স্পষ্ট, যা গল্পকে আরও শক্তিশালী করে।
চরিত্র নির্মাণ এই সিরিজের সবচেয়ে বড় শক্তি। এখানে কোনো চরিত্র একমাত্রিক নয়। প্রত্যেকেই একধরনের দ্বন্দ্বের ভেতরে বাস করে।
জেনি চরিত্রে মৌসুমী মৌ এই সিরিজের অন্যতম চমক বললে বাড়াবাড়ি হবে না। উপস্থাপক হিসেবে পরিচিত এই শিল্পী অভিনয়ে আগেও কাজ করেছেন, কিন্তু এখানে তিনি একেবারেই অন্য রকম। দৃষ্টিশক্তিহীন একজন মানুষের শারীরিক ভাষা, মানসিক ভাঙন এবং আবেগের ওঠানামা—সবকিছু তিনি গভীরভাবে ধারণ করেছেন। তাঁর অভিনয়ে যে ভঙ্গুরতা আছে, সেটিই চরিত্রটিকে বাস্তব করে তোলে।
রাহাত চরিত্রে আরেফিন জিলানী আবারও নিজের সংযত অভিনয়ের প্রমাণ দিয়েছেন। ‘ক্যাকটাস’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর মতো কাজ দিয়ে আগেই নজর কাড়েন তিনি। ‘চক্র ২’-এ সাংবাদিক রাহাত চরিত্রে তাঁর অভিনয় আরও পরিণত। চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব—ভালোবাসা, সংশয়, পরিবর্তন—সবকিছু তিনি ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা গল্পের আবেগীয় স্তরকে সমৃদ্ধ করেছে।
আরেকজনের কথা না বললেই নয়। গাজী রাকায়েত। সিরিজে জটিল চরিত্রবিন্যাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন গাজী রাকায়েত। অভিনয়ের জায়গা থেকে গাজী রাকায়েত বরাবরের মতোই সংযত। অতিরঞ্জন নেই; বরং রয়েছে ধীর, পরিমিত সংলাপ এবং চোখের ভাষায় অনুভূতি প্রকাশের দক্ষতা। এই সিরিজের আবহের সঙ্গে তাঁর অভিনয় একেবারেই মানানসই—কারণ ‘চক্র ২’ এমন একটি কাজ, যেখানে অভিনয়ে অতিরিক্ত নাটকীয়তা গল্পকে নষ্ট করার ঝুঁকি তৈরি থাকত।
সঠিক চরিত্র বাছাই, যথাযথ অভিনয় আদায় করে আনার জায়গায় নির্মাতার প্রস্তুতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বলতে হয় নিজের মতো গল্প বলার পাশাপাশি বিভিন্ন ঘরানার শ্রেষ্ঠ কাজ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে ভিকি জাহেদের। শোনা যায়, জেনি চরিত্রটির জন্য মৌসুমী মৌকে তিনি ‘সেন্ট অব আ ওমেন’ চলচ্চিত্রের আল পাচিনোকে (লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফ্রাঙ্ক স্লেড) গিলে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পর্বগুলো দেখে মনে হয়েছে মৌসুমী সেটা করছেনও।
সঠিক চরিত্র বাছাই, যথাযথ অভিনয় আদায় করে আনার জায়গায় নির্মাতার প্রস্তুতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বলতে হয় নিজের মতো গল্প বলার পাশাপাশি বিভিন্ন ঘরানার শ্রেষ্ঠ কাজ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে ভিকি জাহেদের।
সিরিজজুড়ে ভয়, গা ছমছম, ‘কী হয় কী হয়’—এই টানটান অনুভূতিটি বজায় থাকে। তবে চতুর্থ পর্বের পর থেকে গতিময়তায় কিছুটা ছন্দপতন চোখে পড়ে। কিছু দৃশ্য পুনরাবৃত্তির মতো মনে হয়, যা সামান্য ভাটা তৈরি করে। মনে হয়, নির্মাতার ভাবনার সেতার কিছু জায়গায় দুলেছে।
সবচেয়ে বড় কথা, সিরিজের প্রায় সব শিল্পীর সংযত ও বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় সিরিজটিকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। তাঁরা চরিত্রগুলোতে শুধু অভিনয় করেননি, বরং জীবন্ত করে তুলেছেন।
ডাক্তার সিরাজ চরিত্রটি আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। তাঁর জীবনে পেশাগত সততা থাকলেও সামাজিক বাস্তবতা তাকে ব্যর্থ করে। ‘মানুষ ভিড় পছন্দ করে…’—এই সংলাপটি সমাজের একটি গভীর মানসিকতার প্রতিফলন। ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, স্ত্রীর চাপ—সব মিলিয়ে তিনি ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে যান।
নির্মাণশৈলীর দিক থেকে ‘চক্র ২’ ভিকি জাহেদের স্বাক্ষর বহন করে। আলো–ছায়ার ব্যবহার, ক্লোজ ফ্রেম, ধীরগতি—সব মিলিয়ে একটি ক্লস্ট্রোফোবিক আবহ তৈরি করা হয়েছে। এই আবহ দর্শককে গল্পের ভেতরে টেনে নেয়, একই সঙ্গে মানসিক চাপ তৈরি করে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সংযত, কিন্তু কার্যকর—যেখানে প্রয়োজন, সেখানে উত্তেজনা বা ভয় তৈরি করে।
সব মিলিয়ে ‘চক্র ২’ এমন একটি কাজ, যা সহজ বিনোদনের জন্য নয়। এটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়, দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে, অস্বস্তিতে ফেলে। রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান না দিয়ে বরং নতুন প্রশ্ন তৈরি করে—এটাই এর শক্তি। সবচেয়ে বড় কথা, সিরিজের প্রায় সব শিল্পীর সংযত ও বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় সিরিজটিকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। তাঁরা চরিত্রগুলোতে শুধু অভিনয় করেননি, বরং জীবন্ত করে তুলেছেন।
বাংলাদেশি ওটিটি কনটেন্টে মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের যে ভাষা তৈরি হচ্ছে, ‘চক্র ২’ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। শতাভাগ নিখুঁত না হলেও, এটি সাহসী—কারণ এটি সহজ উত্তর দেয় না, বরং কঠিন প্রশ্ন তোলে। আর সেই প্রশ্নই দর্শকের মনে থেকে যাবে দীর্ঘ সময়।