স্টার শিপ ফিউশন শেফ: প্রথম রানারআপ

আর্কিটেকচারের মতো রান্নাও স্পেস, কালার, কম্পোজিশন এবং নান্দনিকতার খেলা

দেশের সবচেয়ে বড় ফিউশন কুকিং রিয়েলিটি শো ‘স্টার শিপ ফিউশন শেফ’–এর গ্র্যান্ড ফিনালে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৭ জুলাই, শুক্রবার। গত ২২ মে থেকে চ্যানেল আই, চরকি এবং প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত হওয়া আট পর্বের এই আয়োজনে প্রতিযোগীরা ধাপে ধাপে নিজেদের সৃজনশীলতা, দক্ষতা ও চাপ সামলানোর সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। চট্টগ্রামের মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল হয়েছেন প্রথম রানারআপ। পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন ১০ লাখ টাকা, সনদ এবং ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টে তিন মাসের ইন্টার্নশিপের সুযোগ। এই প্রতিযোগিতায় পুরো যাত্রা, শেখা, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন তারেক মাহমুদ নিজামী

প্রথম আলো:

অভিনন্দন আপনাকে। ‘স্টার শিপ ফিউশন শেফ’ প্রতিযোগিতার প্রথম রানারআপ হওয়ার অনুভূতি কেমন?

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: অনুভূতি সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। দেশজুড়ে শত শত প্রতিভাবান রন্ধনশিল্পীর মধ্যে প্রথম রানারআপ হওয়াটা বিশাল প্রাপ্তি। এটি আমার কঠোর পরিশ্রম ও রান্নার প্রতি ভালোবাসার স্বীকৃতি। আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত।

প্রথম আলো :

কোন ভাবনা থেকে এবং কীভাবে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন?

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: মূলত ‘স্টার শিপ ফিউশন কিচেন: সিজন–২’–এর পর্বগুলো দেখার সময়ই জানতে পারি, এতে দর্শকদের জন্য সরাসরি অংশগ্রহণ করার সুযোগ আছে। তখনই মনে হয়েছিল, একবার চেষ্টা করে দেখা উচিত। তারপর প্রতিযোগিতার নিয়ম মেনে আমি আমার রেসিপি তৈরি করে পাঠাই। এভাবেই আমার যাত্রা শুরু হয়।

‘স্টার শিপ ফিউশন শেফ’–এর ফার্স্ট রানারআপ হওয়ার পাশাপাশি ১০ লাখ টাকা পুরস্কার জিতে নিয়েছেন চট্টগ্রামের মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রতিযোগিতার প্রধান বিচারক অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতা আফসানা মিমি। সঙ্গে ছিলেন অভিনেতা আফরান নিশো, প্রতিযোগিতার উপস্থাপক মাসুমা রহমান নাবিলা এবং দুই বিচারক শেফ মো. আসাদুজ্জামান আসাদ ও শেফ সৈয়দ তাজাম্মুল হক তারেক। ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ কিছুটা কড়া ও মসলাদার হয়। ‘চাটগাঁইয়া স্বাদে’র নিজস্বতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফিউশন মেলানোর শুরুটা কীভাবে?

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: চট্টগ্রামের মেজবানি মাংস বা কালা ভুনার মতো খাবারগুলোর মসলার ভারসাম্য অসাধারণ। তবে আন্তর্জাতিক ফিউশনে মসলার তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে টেক্সচার ও প্রেজেন্টেশনে ভিন্নতা আনতে হয়। আমি চাটগাঁইয়া রান্নার মূল সুবাস ও মসলাদার নিজস্বতা ঠিক রেখে ফ্রেঞ্চ টেকনিক বা ইতালিয়ান সসের ফিউশন করার চেষ্টা করেছি। যেমন মেজবানি মসলার ফ্লেভারে তৈরি করা কোনো স্টেকের কম্বিনেশন। এই এক্সপেরিমেন্টগুলো কিচেনে করতে করতেই আমার ফিউশন যাত্রার শুরু।

প্রথম আলো :

ফাইনালের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজেকে যখন মূল্যায়ন করছিলেন, তখন কি মনে হয়েছিল রন্ধনশিল্পের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় আরেকটু দখল থাকলে চ্যাম্পিয়নের ট্রফিটা আপনারও হতে পারত?

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: ফাইনালের মুহূর্তটায় মিশ্র এক অনুভূতি কাজ করছিল। চ্যাম্পিয়নশিপের ব্যবধানটা সব সময়ই খুব সূক্ষ্ম হয়। আমার মনে হয়, আন্তর্জাতিক ডেজার্ট তৈরি কিংবা পেস্ট্রির সূক্ষ্ম কৌশলগুলোতে যদি আমার আরেকটু প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা থাকত, তাহলে হয়তো ফলটা অন্য রকম হতেও পারত। তবে যা শিখেছি এবং যেখানে এসে পৌঁছেছি, তা নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই।

প্রথম আলো :

প্রতিযোগিতায় বিচারকদের কোন পরামর্শটা আপনার রান্নার ধরন বদলে দিয়েছে বলে মনে করেন?

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: বিচারক এবং গ্রুমারদের থেকে পাওয়া শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা সত্যিই দারুণ ছিল। প্রতিদিনের নতুন নতুন টিপস ও ট্রিকস রান্নার খুঁটিনাটি বুঝতে সাহায্য করেছে। পাশাপাশি রান্নার বাইরেও প্রেজেন্টেশন ও কথা বলার ধরন নিয়ে তাঁদের দিকনির্দেশনা পুরো ব্যক্তিত্বকে বদলে দিতে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে আফসানা মিমি আপুর হাসিমুখের ইতিবাচক পরামর্শগুলো অনুপ্রাণিত করত। স্টুডিও রাউন্ডে গ্রুমার নাজনীন আপুর বলা সেই অসাধারণ কথাটি, ‘জীবনে চলতে গেলে সবার আগে নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই করতে জানতে হবে’—এটি শুধু রান্নার ধরন বা প্রতিযোগিতাই নয়, জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রেই বড় ধরনের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

প্রথম আলো:

এ ধরনের প্রতিযোগিতায় টাইম ম্যানেজমেন্ট এবং বিচারকদের সামনে তাৎক্ষণিক উপস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একদম শেষ মুহূর্তের সেই তীব্র স্নায়ুচাপ কীভাবে সামাল দিতেন?

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: সত্যি বলতে, শেষ মুহূর্তের কাউন্টডাউন যখন শুরু হতো, তখন বুকের ধড়ফড়ানি সামলানো কঠিন ছিল। আমি মাথা ঠান্ডা রাখার জন্য লম্বা শ্বাস নিতাম এবং মনে মনে একটা সুনির্দিষ্ট রুটম্যাপ তৈরি করে ফেলতাম যে—কোন মিনিটে কী করব। আর আর্কিটেকচারের ব্যাকগ্রাউন্ড থাকায় ডেডলাইনের মধ্যে কাজ করার একটা মানসিক প্রস্তুতি আগে থেকেই ছিল, যা আমাকে কিচেনের স্নায়ুচাপ সামলাতে দারুণভাবে সাহায্য করেছে।

প্রথম আলো :

প্রথম রানারআপ হিসেবে আপনি পেয়েছেন ১০ লাখ টাকা পুরস্কার, সঙ্গে ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টে তিন মাসের ইন্টার্নশিপ। এ সুযোগকে কীভাবে কাজে লাগাতে চান?

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: পুরস্কারের অর্থটা আমি আমার রন্ধনশিল্পের ভবিষ্যৎ গবেষণায় এবং একটি নিজস্ব ফিউশন ক্যাফে বা স্টুডিওর প্রাথমিক সেটআপে কাজে লাগাতে চাই। আর ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানের পাঁচ তারকা হোটেলে ইন্টার্নশিপ আমার জন্য শেখার এক বিশাল সুযোগ। পেশাদার শেফদের কাছ থেকে কিচেন ম্যানেজমেন্ট, হাইজিন এবং গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের কাজ লাইভ শেখার সুযোগকে শতভাগ কাজে লাগাব।

প্রথম আলো :

আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা এবং বর্তমান পেশা সম্পর্কে জানতে চাই।

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল:  খুব ছোটবেলা থেকেই সৌদি আরবে বড় হয়েছি। পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে নিজের পড়াশোনা শেষ করি এবং স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক সম্পন্ন করি। বর্তমানে একটি আর্কিটেকচারাল ফার্মে লিড আর্কিটেক্ট হিসেবে কাজ করছি। সেই সঙ্গে নিজের ক্যাটারিং সার্ভিস ‘আর্কিশেফ’ পরিচালনা করছি। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে রান্নার অনুষ্ঠানও করছি।

প্রথম আলো:

একজন আর্কিটেক্ট হওয়ার পাশাপাশি রান্নার প্রতিও আপনার দারুণ আগ্রহ। এই দুই ভিন্ন জগৎকে কীভাবে ব্যালেন্স করছেন?

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন মনে হলেও এই দুটির মধ্যে গভীর মিল রয়েছে। আর্কিটেকচার যেমন স্পেস, কালার, কম্পোজিশন এবং নান্দনিকতার খেলা; রান্নাও ঠিক তা–ই—এখানেও উপাদানের ব্যালেন্স, কালার থিওরি ও প্লেটের কম্পোজিশন গুরুত্বপূর্ণ। আমি দুটিকেই একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছি এবং নিতে চাই। ডিজাইন এবং ডাইনিংকে মিলিয়ে ফিউশন কিছু করারও স্বপ্ন আছে।

প্রথম আলো :

রান্নার প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা কখন থেকে, কীভাবে? আপনার এই যাত্রায় পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা কেমন ছিল?

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: ছোটবেলায় কিচেনে নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট দেখে রান্নার প্রতি আমার কৌতূহল ও ভালোবাসার জন্ম নেয়। বিকেলে সবাই যখন ঘুমাত, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে রান্না করতাম। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে নিজেও টুকটাক রান্না করতাম। আমার এই যাত্রায় পরিবার ও বন্ধুদের ভূমিকা অতুলনীয়। বিশেষ করে আমার বড় বোনের সাপোর্ট ছিল সবচেয়ে বেশি। যখন আমি আর্কিটেকচারের মতো ব্যস্ত পেশার পাশাপাশি রান্নার প্রতিযোগিতায় আসার সিদ্ধান্ত নিই, তাঁরা একটুও দ্বিধা না করে আমাকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। তাঁদের বিশ্বাস না থাকলে আমি এই মঞ্চে দাঁড়াতে পারতাম না।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

ফিউশন রান্না নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা স্বপ্ন কী?

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: আমার স্বপ্ন এমন একটি সিগনেচার ফাইন ডাইনিং রেস্তোরাঁ করা, যেখানে মানুষ এসে বাংলাদেশি খাবারের এক আধুনিক ও আন্তর্জাতিক রূপের স্বাদ পাবেন। আমাদের লোকাল ইনগ্রেডিয়েন্টস শুঁটকি, চুইঝাল বা সাতকরা ব্যবহার করে কীভাবে গ্লোবাল ডিশ তৈরি করা যায়, তা নিয়ে আরও গবেষণা করতে চাই।

প্রথম আলো :

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারকে ফিউশন রূপে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে ‘স্টার শিপ ফিউশন শেফ’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে আপনি মনে করেন?

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: আমাদের দেশের খাবার পুষ্টি ও স্বাদে অতুলনীয় হলেও বিশ্বমঞ্চে এর মডার্ন প্রেজেন্টেশন বা ফিউশন নিয়ে আগে সেভাবে কাজ হয়নি। এই রিয়েলিটি শো আমাদের মতো হোম কুক এবং প্রফেশনালদের এক ছাদের নিচে এনেছে। পাশাপাশি বিশ্বকে দেখিয়েছে যে বাংলাদেশি খাবারকেও ফাইভ স্টার স্ট্যান্ডার্ডে রূপান্তর করা সম্ভব। দেশের রন্ধনশিল্পকে বিশ্বদরবারে ব্র্যান্ডিং করার ক্ষেত্রে এই আয়োজন এক মাইলফলক হয়ে থাকবে।

প্রথম আলো:

আপনাকে ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ আবিদ ইকবাল: আপনাকেও ধন্যবাদ।