‘এই তুমি সেই তুমি’ ছবির গান রেকর্ডিংয়ের ফাঁকে স্টুডিওতে সাবিনা ইয়াসমিন ও সারাহ বেগম কবরী
‘এই তুমি সেই তুমি’ ছবির গান রেকর্ডিংয়ের ফাঁকে স্টুডিওতে সাবিনা ইয়াসমিন ও সারাহ বেগম কবরীফাইল ছবি

আমাদের বন্ধুত্ব আজকের নাকি। প্রায় ৫২ বছরের বন্ধুত্ব। কী বলব, বুঝতে পারছি না। বন্ধু হিসেবে কবরী যেমন অসাধারণ, মানুষ হিসেবেও তেমনি সেরা। আর অভিনেত্রী হিসেবে আমার কিছু বলার নেই। ওটা তো বলার বাইরে। আমি বলে ঠিকমতো বোঝাতে পারব না। কবরী তো কবরী, তিনি একজনই। কবরী একজনই। কবরী জীবনে জীবনে আর কোনো দিনই আসবে না। আমাদের বন্ধুত্ব অনেক আগের।

default-image

আমাদের যে কত স্মৃতি! কত যে মজা করেছি। এফডিসিতে কবরী শুটিং করত, আমি পাশে রেকর্ডিং করতাম। প্রায় সময় হয় ও আসত, না হয় আমি যেতাম। আমরা পরস্পরকে তুমি করে বলতাম। আমরা কত জায়গায় একসঙ্গে গিয়েছি, থেকেছি, ঘুরেছি! প্রায়ই আমি তার শাড়ি নিয়ে নিতাম, কবরী আমার শাড়ি নিত। এফডিসিতে দেখা হলেই কবরীর শাড়ি পছন্দ হলে মেকআপ রুমে যেতাম। শাড়ি বদল করে নিয়ে নিতাম। ঢাকার বাইরে গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বের হয়ে যেতাম। মাঝখানে অবশ্য আমাদের যোগাযোগটা কম হতো। চামেলি আমাদের কমন বন্ধু, কানাডায় থাকত। আমাদের খুব কাছের বন্ধু। তবে কবরীর খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল। কয়েক বছর আগে আমাদের সেই বন্ধুটি মারা গেল। এরপর আবার আমাদের যোগাযোগ শুরু হলো।

বিজ্ঞাপন
default-image

চ্যানেল আইতে দেখা অথবা অন্য কোনো পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে দেখা হতো। কবরী আমাকে তার ছবিতে মিউজিক ডিরেকশন দিতে বলল। আমি বলেছি, এত বড় দায়িত্ব আমাকে দিও না। নাছোড়বান্দা সে। বলল যে তুমিই তো পারবা। আমি তো আছি। কী এমন হবে। তোমার যে অভিজ্ঞতা তুমি করলে ভালো হবে। কাজ শুরু করলাম। প্রথম গানটিতে কবরী ঠোঁট মিলিয়েছে। রেকর্ডিংয়ের পর শুটিংও করল। বলল যে গানটি খুবই সুন্দর হয়েছে। গানটি নিয়ে খুব খুশি ছিল।

default-image

তারপর কবরী বলল, দ্বৈত গানটি নিয়ে কী করব? এটি ছিল কবরীর লেখা গান। জীবনে প্রথম গান লিখেছে। তাই গানটি কারা গাইবে তা নিয়ে খুব চিন্তা ছিল। আমরা দুজনে মিলে ঠিক করলাম, কোনাল আর ইমরান গাইবে। কবরী খুশি। আমি আরও খুশি, কারণ দুজনেই আমার সন্তানতুল্যও। ‘সেরাকণ্ঠ’–এ বিচারক হিসেবে ওদের দুজনকে পেয়েছি। আমি বললাম, খুব ভালো হবে। চলো। তারপর গানটি তৈরি হলো। এরপর তো প্রায়ই কথা হতো। গান নিয়ে আমরা প্রায়ই কবরীর বাড়িতে বসতাম। গাজী ভাই (গাজী মাজহারুল আনোয়ার), আমি, জাহাঙ্গীর (জাহাঙ্গীর সাঈদ) কবরীর বাড়িতে বসলাম। নিজ হাতে কত কী রান্না করে খাওয়াল! এরপর গানের আলাপ নিয়ে জাহাঙ্গীরের বাড়িতেও একাধিকবার বসলাম। আড্ডা ও খাওয়াদাওয়ার ফাঁকে নামাজের সময় নামাজ পড়ল। কোনো দিনই নামাজ মিস করত না।কবরী ও সাবিনা ইয়াসমীন

default-image

এত বেশি কবরী আমার গানে ঠোঁট মিলিয়েছে...! সবাই বলত যে মনেই হয় না এই গান অন্য কেউ গেয়েছে। আমাদের দুজনের কেমিস্ট্রি খুবই ভালো ছিল। ‘সে যে কেন এলো না...’, ‘হই হই রঙ্গিলা...’ থেকে থেকে শুরু করে অজস্র গানে কবরী ঠোঁট মিলিয়েছে। আমি যে কীভাবে অল্প কথায় তার মূল্যায়ন করব।

আমাকে মাঝেমধ্যে বলত, করোনা নামে কী যে একটা এল পৃথিবীতে! বাড়িতে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠছি। মাঝেমধ্যে গাড়ি নিয়ে বের হতো, একটু হাতিরঝিলের দিকে যেত। একটু হাঁটাহাঁটি করে চলে আসত। আমি বলতাম, বাইরে বেশি যেও না। কবরী বলত, কী করব বলো। বাড়িতে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। আমার তো সময় কাটানো মুশকিল। আমার তো তেমন বন্ধুবান্ধবও নেই।

default-image

অভিনয়শিল্পী কবরীর কথা আর কী বলব। তার চোখেমুখে অভিনয়। হাসিতে অভিনয়, চলাফেরায় অভিনয়, কথাবার্তায় অভিনয়! কবরীর ঠোঁট, চোখ, গলার আওয়াজও সব কথা বলত! তার জন্মই হয়েছে অভিনয় করার জন্য, জাতশিল্পী যাকে বলে। তার অভিনয়ের মূল্যায়ন করার মতো ক্ষমতা আমার নেই। তারপরও যতটা বুঝি, কবরীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত সবকিছুই কথা বলত। এত সুন্দর করে একটা দৃশ্য ফুটিয়ে তুলত, মনে হতো ওই দৃশ্যটি বুঝি কবরী ছাড়া সম্ভবই না। কবরীর মৃত্যুর পর সারা দিন টিভিতে তার অভিনীত গান দেখাচ্ছে। আমি একটাও দেখছি না, দেখতে পারছি না, কষ্ট হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
গান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন