কপিরাইট অধিকারে সচেতন হচ্ছেন সংগীতশিল্পীরাসংগীতাঙ্গন
কপিরাইট অধিকারে সচেতন হচ্ছেন সংগীতশিল্পীরাসংগীতাঙ্গনছবি: কোলাজ

সেসব দিন আর নেই। এককালীন কিছু টাকা দিয়ে একটি গান কিংবা ১২টি গানের একটি অ্যালবামের চিরস্থায়ী মালিক হওয়ার দিন শেষ। যথাযথ অনুমোদন ছাড়া অন্যের গানের সুর কিংবা কথা হুবহু নকল করে গাওয়া বা বাণিজ্যিকভাবে পরিবেশন করার দিন শেষ।
গত ১০ বছরে সংগীতের বাজারে আলোচনার বড় বিষয় ছিল কপিরাইট অধিকার। এ বিষয়ে শিল্পীরা যেমন সচেতন হয়েছেন, তেমনি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও হয়েছে সক্রিয়। বেশ কয়েক বছর আগে গঠিত হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকার (আইপিআর) টাস্কফোর্স। কপিরাইট অফিস নানা সময় কপিরাইট-সচেতনতায় শিল্পীদের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে অর্থদণ্ডসহ বেশ কিছু শাস্তির ঘটনাও ঘটেছে। তা ছাড়া মেধাস্বত্ব আইন নিয়ে আলাপ, এ বিষয়ে সচেতনতা কিংবা এটি বাস্তবায়নে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, গীতিকারদের বেশ কিছু সংগঠন ও প্ল্যাটফর্মও উদ্যোগ নিয়েছে। লকডাউনেও এসব সংগঠনের প্রতিনিধিরা তৎপর ছিলেন।

default-image

সচেতনতার অভাবে দেশের সংগীতাঙ্গনে কপিরাইট আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি বছরের পর বছর। শিল্পী বা মূল মালিকের অনুমতি ছাড়া গান আপলোড হয়েছে ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে। গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীর অধিকার বাস্তবায়ন হয়নি। গান এমনকি গানের দল নিয়েও জটিলতা তৈরি হচ্ছে নানাভাবে। আবার কখনো কখনো বাণিজ্যিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রকৃত প্রযোজক ও পরিবেশকেরা।

বিজ্ঞাপন
অধিকার আদায়ের তাগিদে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, গীতিকারেরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। বলা চলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন শিল্পীরা।

বারবারই কপিরাইট আইন লঙ্ঘিত হয়েছে, কপিরাইট অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন শিল্পীরা। অবশ্য কয়েক বছর আগেও এ বিষয়ে উদাসীন ছিলেন শিল্পীরা।

default-image

শুরুতে বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশন এবং মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইবি) মতো মাত্র দুটি সংগঠন বেসরকারিভাবে কপিরাইট অধিকার আদায়ে সক্রিয় ছিল। এখন অধিকার আদায়ের তাগিদে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, গীতিকারেরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। বলা চলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন শিল্পীরা।

default-image

ইতিমধ্যে এ অঙ্গনের বেশ কিছু জটিলতার মীমাংসা হয়েছে কপিরাইট অফিসের মধ্যস্থতায়। যেমন কয়েক বছর আগে আলোচিত ‘আমি তো ভালা না, ভালা লইয়াই থাইকো’ গানটির গীতিকার আর সুরকার নিয়ে তৈরি হয়েছিল জটিলতা। শেষ পর্যন্ত কপিরাইট অফিস গানের মূল গীতিকার ও সুরকার নির্ধারণ করে দেয়। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফিডব্যাক ব্যান্ডের সদস্যদের মধ্যে কখনোই কোনো লিখিত চুক্তি হয়নি। ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য মাকসুদ একসময় সেই দল ছেড়ে গড়েন আরেকটি ব্যান্ড। নতুন দলটি যখন মঞ্চে ফিডব্যাকের গান পরিবেশন শুরু করে, তৈরি হয় স্বত্ব নিয়ে জটিলতা, যা চলতে থাকে বছরের পর বছর।

অবশেষে গত বছরের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের মধ্যস্থতায় ফিডব্যাকের গানগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি রয়্যালটির সুষম বণ্টন নিশ্চিতে ফিডব্যাক ও মাকসুদের মধ্যে সমঝোতা হয়। এভাবে মাইলস, শিরোনামহীন, ওয়ারফেজ, সরলপুর ব্যান্ড পরিবেশিত গানের স্বীকৃতিরও সমাধান হয়। এ-সংক্রান্ত অভিযোগ দিয়ে বিভিন্ন সময় সমাধান পেয়েছেন সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন, দিলরুবা খান, শুভ্র দেব, সেলিম চৌধুরী, মনির খানসহ আরও বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পী।

default-image

বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত বছরে গড়ে রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা ছিল মাত্র সাড়ে ৫০০। ক্রমেই সেটা বেড়েছে। পরের বছর রেজিস্ট্রেশন বেড়ে হয় ১ হাজার ৭৯৫টি, গত বছর এটি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২০৫টিতে। ক্রমেই সংখ্যাটি বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে রেজিস্ট্রার অব কপিরাইটস (যুগ্ম সচিব) জাফর রাজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘রয়্যালটি নিয়ে শত শত অভিযোগ ছিল। গীতিকার-সুরকারেরা প্রায়ই অভিযোগ দিতেন, তাঁরা রয়্যালটি পাচ্ছেন না। নিজের গান নিজে ইউটিউবে আপলোড করতে বাধার মুখে পড়ছেন। এ বিষয়ে সবাইকে বুঝিয়ে সচেতন করতে তিন বছর লেগে গেছে।’

কোনো গানের নিবন্ধন করাতে হলে অবশ্যই তা কপিরাইট কার্যালয়েই করাতে হবে। এ জন্য নির্ধারিত আবেদনপত্র পূরণ করে আবেদন করতে হয়। সঙ্গে লাগে প্রতিটির ক্ষেত্রে এক হাজার টাকার ট্রেজারি চালান। দুই কপি ছবি, পণ্যটি নিজের বলে হলফনামা, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি আর যে সৃজনশীল পণ্যটি নিবন্ধন করা হবে, তার দুটি কপি এবং সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
বিজ্ঞাপন

পরিস্থিতি বিবেচনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনো সংস্কার এবং বাড়তি উদ্যোগের প্রয়োজন। যেমন শিল্পীদের রয়্যালটি বাস্তবায়নে সরকার অনুমোদিত সিএমও বাংলাদেশ লিরিসিস্টস কম্পোজার্স অ্যান্ড পারফরমার্স সোসাইটি (বিএলসিপিএস) ২০১৪ সালে গঠিত হয়।

default-image

সে সময়ে সংস্থাটির সভাপতি সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন জানিয়েছিলেন, সংগীতশিল্পীদের অর্থনৈতিক ও নৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘সিস্যাক’ ও ‘ওয়াইপো’র কনভেনশন অনুযায়ী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কপিরাইট সোসাইটিগুলো সংগীত স্রষ্টাদের প্রাপ্য রয়্যালটি নিশ্চিতকরণে কাজ করছে। কিন্তু আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরেই অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, টিভি চ্যানেল, এফএম রেডিওসহ বিভিন্ন মাধ্যম এবং ওয়েবসাইটে প্রচারিত কাজ থেকে শিল্পীরা রয়্যালটি পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএলসিপিএস সংগীতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার রয়্যালটি আদায়ের লক্ষ্যেই গঠন করা হয়েছে বলেও জানান সাবিনা ইয়াসমীন।

default-image

সে সময় তিনি সংগীতসংশ্লিষ্ট সবাইকে এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে শিল্পীদের গান ব্যবহারের অনুমোদন এবং রয়্যালটি প্রদানের জন্য এই সংস্থাটির কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। যেহেতু এই সংস্থা শিল্পীদের প্রাপ্য টাকা সংগ্রহ এবং বিতরণের দায়িত্ব নেবে।’
অবশ্য পরে সংগঠনটির কার্যকর কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। বরং সংগীতাঙ্গনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ থাকলেও অধিকার এবং প্রাপ্তির জায়গায় গরমিল দেখা দেয়।

এ নিয়ে নানা সময়ে নতুন নতুন সংকট, জটিলতা তৈরি হতো। তা ছাড়া সরকারি অনুমোদন ছাড়াও বাংলাদেশে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অবৈধ ব্যবসা করছে গানের বাজারে। সংগীতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এসব থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে মিউজিক্যাল বোর্ড গঠন। গীতিকবি আসিফ ইকবাল বলেন, ‘বর্তমান বাজারে সংগীতচর্চা শুধু শখ নয়, পেশা হিসেবে নেওয়ার সময় এসেছে। কিন্তু নানা রকম অনিয়মের কারণে এত দিন এটি পেশা হিসেবে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। সম্মিলিতভাবে ক্ষেত্র তৈরি করে পরের প্রজন্মের জন্য ন্যায্য প্রাপ্তির পথ বের করতে হবে।’
রেজিস্ট্রার অব কপিরাইটস (যুগ্ম সচিব) জাফর রাজা চৌধুরীও যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে কপিরাইট ক্লেইম বোর্ড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘আমাদেরও সব সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে মিউজিক বোর্ড গঠন করতে হবে।’

default-image

যেভাবে নিবন্ধন করতে হয়
অনেক আগেই কপিরাইট আইনের প্রচলন থাকলেও ২০১৭ সাল থেকে অভিযোগ দেওয়া শুরু করেছেন শিল্পীরা। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী সংখ্যাটি একেবারেই কম মন্তব্য করে রেজিস্ট্রার অব কপিরাইটস জাফর রাজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘অধিকার নিশ্চিত করতে হলে সৃষ্টিশীল নতুন পণ্য নিবন্ধন করতে হবে। আমাদের দেশে এ বিষয়ে সচেতনতার বড় অভাব।’

তিনি জানান, একটি গানের স্বত্বাধিকারী তিনজন-গীতিকার সুরকার এবং শিল্পী। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তিনজনের সমন্বয়ের অভাবে যথাযথভাবে নিবন্ধন হয় না। এ ছাড়া স্বত্বাধিকারীরা যদি কোনো প্রযোজকের কাছে বিক্রি করেন তাঁদের সৃষ্টকর্মটি, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই নির্ধারিত কাগজে লিখিত চুক্তি করতে হবে। কোনো গানের নিবন্ধন করাতে হলে অবশ্যই তা কপিরাইট কার্যালয়েই করাতে হবে। এ জন্য নির্ধারিত আবেদনপত্র পূরণ করে আবেদন করতে হয়। সঙ্গে লাগে প্রতিটির ক্ষেত্রে এক হাজার টাকার ট্রেজারি চালান।

default-image

দুই কপি ছবি, পণ্যটি নিজের বলে হলফনামা, জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি আর যে সৃজনশীল পণ্যটি নিবন্ধন করা হবে, তার দুটি কপি এবং সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বিবরণ। এই কাজ এখন সরাসরি আগারগাঁওয়ের কপিরাইট অফিসে (জাতীয় গণগ্রন্থাগারের তৃতীয় তলায়) না গিয়ে অনলাইনেও করা যায়। শুধু তা–ই নয়, কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজনে যে আবেদনকারী দূরদূরান্ত থেকে আসা, ব্যক্তিগত ব্যস্ততা, ট্রাফিক জ্যাম বা অন্য অসুবিধার কারণে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসে সরকারি দৈনন্দিন সময়সূচির মধ্যে আসতে পারেন না, তাঁদের জন্য নির্ধারিত অফিস সময়সূচির পরে কিংবা বিশেষ ক্ষেত্রে ছুটির দিনেও কপিরাইট রেজিস্ট্রেশনসংক্রান্ত সেবা দিয়ে থাকে কপিরাইট অফিস। এ জন্য সেবা গ্রহণকারীকে নির্ধারিত সময়ে সেবা গ্রহণের অপারগতার সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখসহ কমপক্ষে তিন দিন আগে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের সঙ্গে ই-মেইল বা টেলিফোনে যোগাযোগ করে সেবা গ্রহণের সময় নির্ধারণ করে নিতে হয়।

default-image
বিজ্ঞাপন
গান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন