সংগীতশিল্পী খৈয়াম সানু সন্ধির সঞ্চালনায় ‘কোক স্টুডিও বাংলা’র গানের নেপথ্যের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্রথম আলোর নিয়মিত আয়োজন ‘গানগল্প’। এবারের গানগল্প অনুষ্ঠানটি ছিল আরও তাৎপর্যময়। কারণ কোক স্টুডিও বাংলার সম্পূর্ণ সংগীতায়োজনের দায়িত্ব যার ওপর, সেই শায়ান চৌধুরী অর্ণব প্রথমবারের মতো যোগ দিলেন গানগল্পে। সঙ্গে ছিলেন লোকগীতি গেয়ে সাড়া জাগানো সংগীতশিল্পী রিপন কুমার সরকার, যিনি ‘বগা’ নামেই সুপরিচিত।

গল্পের শুরুতেই কোক স্টুডিও বাংলার গানগুলোর ভিন্ন রকম, মনোমুগ্ধকর ও চমকে দেওয়া সংগীতের প্রশংসা করা হয়। সে সূত্রে বিনয়ের সঙ্গে অর্ণব বলেন, ‘পাকিস্তান ও ভারতে সফল হওয়া কোক স্টুডিও যখন আমাদের এখানে করার পরিকল্পনা হলো, তখন ভাবছিলাম, এর মিউজিক ডিজাইনটি কীভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হতে পারে। মনে হলো, আমাদের দেশে, এই ঢাকা শহর বা অন্যান্য জায়গাতেও, রাস্তাঘাটে কী এক হইচই, কোলাহল আর জমজমাট ভিড়-ভাট্টা। যে যার পথে চলছে, আবার সবাই একই জায়গায় সহাবস্থান করছে। সবার মধ্যে কী যেন এক অদ্ভুত হারমনি বা সমন্বয় আছে। ঠিক এই অনুপ্রেরণা থেকেই ভাবলাম, এমন একটি সংগীতায়োজন করা দরকার, যেখানে বিভিন্ন ধরনের আপাতসাদৃশ্যবিহীন যন্ত্রাণুষঙ্গ বাজবে যার যার মতো করে, কিন্তু এক অনির্বচনীয় ঐকতান থাকবে তাতে। থাকবে স্যাক্সোফোন, বাঁশি, সানাই, বেজ-ড্রাম, সঙ্গে এসরাজ বা দোতারা।’

আলাপের একপর্যায়ে ‘চিলতে রোদে’র গল্পে, সঙ্গে বগার মন হরণ করা ভাওয়াইয়া গান ‘ও কি একবার আসিয়া’র অসাধারণ মেলবন্ধনের প্রসঙ্গ আসে। জানা গেল, অনেক আগে অর্ণবের প্রথম অ্যালবামের গানটি যে এখানে ব্যবহার করা হবে, তা আগে থেকে ঠিক ছিল না। এই ‘চিলতে রোদ’ গানের কথা অর্ণবের বড় বোনের শান্তিনিকেতনের বন্ধুর লেখা চিঠি থেকে পাওয়া। গানের কথায় ‘বালিশ চাদর গড়িয়ে নেয়া’ আর ‘এমনই আধো ঘুমে কাউকে ভীষণ রকমের মনে পড়া’র আখ্যান থাকায় অর্ণব আরবান মিউজিকের সঙ্গে ঘুমপাড়ানি গানের ঘুরে ঘুরে আসা একই সুরের তান বেঁধেছেন। অনবদ্য।

রিপন কুমার সরকার শুরু থেকেই কোক স্টুডিও বাংলার প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সার্বিক কাজে অর্ণবকে সহায়তা করেছেন। রিপনের গান এখানে ব্যবহার করার কথা ভাবার সঙ্গে সঙ্গেই অর্ণব তাকে কিছু ভাওয়াইয়া গান নির্বাচন করতে বলেন, যা গাওয়া যেতে পারে। রিপন কুড়িটির মতো গানের তালিকা করেন এবং একটি একটি করে গেয়ে শোনাতে থাকেন অর্ণবকে। এরপর ‘ও কি একবার আসিয়া’ গাওয়ার পর অর্ণব বলেন, তারও একই রকম আবেগ থেকে গাওয়া একটি গান আছে।

নাম ‘চিলতে রোদ’। গিটার হাতে থাকায় দুটি গান দুজনে মিলে গাইতে গিয়ে রিপনের ভাষায়, ‘দুটো গান পরস্পর বন্ধু হয়ে গেল নিজেরাই’। তার সঙ্গে অত্যন্ত উপযোগী অথচ অবাক করা বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ, কোরাস, হামিং সবকিছু মিলে জাদু ছড়িয়ে গেল চিলতে রোদের। তবে সব ছাপিয়ে রিপনের কণ্ঠের দরদ কাঁদাল বহু দর্শক-শ্রোতাকে। অর্ণব নিজেও বলছিলেন, ‘রিপনের গানের সুরে আমি ভেসে যাচ্ছিলাম। আবেগ ধরে রেখে গান করা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছিল।’

ইউটিউবে কোক স্টুডিও বাংলার প্রতিক্রিয়াভিত্তিক ভিডিওগুলো খুব উপভোগ করেন অর্ণব। তিনি বলেন, ‘এভাবেই বাংলা ভাষার গান হলেও ভাষাগত পার্থক্য আর প্রতিবন্ধকতা ঘুচিয়ে দেয় সংগীত। আমার এমনই আকাঙ্ক্ষা ছিল যে আমাদের মাটির গান তুলে ধরব, কিন্তু একেবারে বৈশ্বিক, আধুনিক ও কিছুটা বিচিত্র সংগীতায়োজনের মধ্য দিয়ে।’
‘তবে শ্রোতা-দর্শকেরা কীভাবে এই মিলমিশ করা অমিলগুলো গ্রহণ করবেন, এ নিয়ে একধরনের শঙ্কার মধ্যেও ছিলাম। কিন্তু “ভবের পাগল” গানের সঙ্গে অভিনব বেজ-ড্রাম অ্যারেঞ্জমেন্ট পর্যন্ত শ্রোতারা লুফে নিয়েছেন।’ বলছিলেন অর্ণব।

অর্ণব মনে করেন, কোক স্টুডিও বাংলার প্রথম সিজনকে পরবর্তী সিজনের সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে শ্রোতারাই সবচেয়ে বড় শক্তি। সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়ায় গ্রে অ্যাডভারটাইজিং এবং কোকা কোলা কোম্পানির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। তা ছাড়া কোক স্টুডিওর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই তাঁদের সর্বোচ্চ মেধা, চেষ্টা আর আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করছেন বলে জানান অর্ণব। গানগল্পের আড্ডায় সুযোগ পেয়ে রিপনের কাছে অর্ণব জানতে চান, তিনি যেমন রিপনের গানে প্রচণ্ড প্রভাবিত হয়েছেন গাইতে গিয়ে, রিপনেরও কি তেমনটা হয়েছে কি না। জবাবে রিপন বলেন, ‘অত্যন্ত প্রিয় আর শ্রদ্ধার শিল্পী অর্ণবের সঙ্গে গাইতে পারাটাই তার জন্য জাদু।’
সবশেষে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সুন্দর আর আবেগময় গান গেয়ে ‘গানগল্প’র ভিডিও কনফারেন্স-আড্ডার ইতি টানেন রিপন কুমার সরকার।