বাংলা গানের বিশ্বমানের স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম কতদূর

গত কয়েক দশকে এই শিল্পীরাই হাতে ধরে এগিয়ে নিয়েছেন সংগীতাঙ্গনকে। এই দলে রয়েছেন আরও বহু শিল্পী। কিন্তু নানা কারণে বাংলা গানকে যুগোপযোগী করে এগিয়ে নেওয়া যায়নি।

বাংলা গান শুনতে কোনো টাকা লাগে না। এ কথা শুনলে আঁতকে উঠতে পারেন জাস্টিন বিবার বা টেলর সুইফটের মতো শিল্পীরা। আর যদি শোনেন, শিল্পীরা একটি গানের জন্য সম্মানী পান ৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা! তাহলে হিসাব মেলাতে কষ্ট হবে না কারও। অথচ বিশ্বসংগীত এখন অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। গান শোনা ও ক্রয়ের প্রবণতা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। বাংলা গানের ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক উল্টো। এমনকি বাংলা গানের জন্য বিশ্বমানের কোনো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মও গড়ে তোলা যায়নি।

জার্মান ডেটাবেইস কোম্পানি স্টাটিসটা জানাচ্ছে, ২০০০ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বব্যাপী স্ট্রিমিংয়ের সাবস্ক্রাইবার ছিল ৪০ কোটি। ২০১৯ সালের প্রথমার্ধে এ সংখ্যা ছিল ৩০ কোটি ৫০ লাখ। এর একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রোতা অর্থের বিনিময়ে গান শোনেন। নতুন গান বের হলে এখনো ডিজিটাল অ্যালবাম বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। যেমন গত এপ্রিলে প্রকাশিত টেলর সুইফটের অ্যালবাম ফিয়ারলেস এক সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৯১ হাজার কপি। এটি সম্ভব হয়েছে অ্যাপল মিউজিক, স্পোটিফাই, প্যানডোরা রেডিও ও আইহার্ট রেডিওর মতো গান বিক্রি ও স্ট্রিমিংয়ের প্ল্যাটফর্মগুলোর কারণে। ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার গানের বাজারে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

কুমার বিশ্বজিৎ
ফেসবুক

সিডি অবলুপ্তির পর বাংলাদেশে সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো স্ট্রিমিং নিয়ে ততটা ভাবেনি বললেই চলে। তারা বরং বেছে নিয়েছে ভিডিও দেখার মাধ্যম ইউটিউবকে। সেখানে গান শোনানোর বদলে শুরুতে হতো দেখানো। পরে নাটক চালিয়ে আয় এবং টিকে থাকতে তৎপর সংগীতা, সাউন্ডটেক, লেজার ভিশন, জি সিরিজের মতো সংগীত প্রযোজক বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। বাংলা গানের জন্য পেশাদার ও লাভজনক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম করা গেল না কেন? গানচিল মিউজিকের স্বত্বাধিকারী ও গীতিকবি সংঘের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসিফ ইকবাল মনে করেন, ‘দূরকল্প ও ইচ্ছার অভাব, গানের মানুষদের বহু বিভক্তি এর প্রধান কারণ।’ তবে আশাবাদী তিনি বলেন, ‘সংগীতের তিন সংগঠন একাত্ম হয়েছে। তারা নিজেদের বাঁচার তাগিদে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম করবে, এক ছাতার নিচে আসবে।’

বাংলা গানের শিল্পীদের রয়্যালটি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা নেই। পরিচিতি, জনপ্রিয়তা ও বাজারের ওপর ভিত্তি করে কোনো কোনো শিল্পী গান করার জন্য ৫ থেকে ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকা সম্মানী নেন। পরে সেই গান থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো রয়্যালটি তিনি পান না। যা কিছু প্রাপ্তি, যোগ হয় প্রযোজকের পকেটে। এমনকি রেডিও, টেলিভিশন, মঞ্চ, মুঠোফোনের ভিএএস, কোনো ক্ষেত্রেই যথাযথ সম্মানী পান না শিল্পী, গীতিকবি, সুরকার বা যন্ত্রসংগীতশিল্পীরা। এসব কি কাম্য? সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, ‘এসব প্ল্যাটফর্ম থার্ড পার্টির মাধ্যমে দিনের পর দিন ব্যবসা করেছে। তখন তারা কাউকে জবাবদিহি করেনি, লভ্যাংশ নিয়েছে। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়, থার্ড পার্টির কাছ থেকে গান নেওয়া যাবে না, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানকে গান দিতে হবে। এরপর তারা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লিখিত নিয়ে গানগুলো থেকে ব্যবসা করত। সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও সুরকারেরা আপত্তি জানালে গান প্রচার করত না।’

গীতিকবি আসিফ ইকবাল। ছবি: ফেসবুক থেকে

অডিও থেকে আয় কমে যাওয়ায় ভিডিওতে ঝুঁকেছেন সংগীতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বেড়েছে সংগীতচিত্রের দৌরাত্ম্য। এতে শোনার থেকে গান দেখার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সংগীতের বিদগ্ধজনেরা এ নিয়ে বিভিন্ন সময় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। অনলাইনে গান শোনা বা স্ট্রিমিং থেকে আয়ের পথ সুগম হলে হয়তো এ চিত্র হতো কিছুটা ভিন্ন। জিপি মিউজিক, ইয়োন্ডার মিউজিকের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান সে চেষ্টা করে শিল্পীদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এমনকি ঘোষণা দিয়ে বন্ধ হয়ে যায় ইয়োন্ডারের কার্যক্রম। তবে আশার কথা হচ্ছে, এরই মধ্যে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে বিশ্বখ্যাত স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠান স্পোটিফাই। এতে যুক্ত হলে হয়তো বাংলা গানের শিল্পীদের গান থেকে আয় নিয়ে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হতে পারে।

গানের বাণিজ্যিক ব্যবহারের বিনিময়ে শিল্পীদের ‘সম্মানী’ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশে কালেকটিভ ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন বা সিএমও গড়ে ওঠেনি। যেটা ছিল, তার ছিল না কোনো কার্যক্রম, জবাবদিহি ও নৈতিক বৈধতা। সম্প্রতি এ বিষয়ে নড়েচড়ে বসেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।