মামুন ফিরলেন গায়ক হয়ে

লিখেছিলেন কবিতা। বন্ধুরা সুর দিয়ে বেঁধে ফেলেছেন গান। সেই গান সাড়া জাগালো দেশের সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে। আশির দশকে সবার মুখে মুখে ছিল সেই গান। হ্যাঁ, ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’ গানটির কথা বলছিলাম। এরপর আরও কয়েকটি গান লিখেছেন তিনি। সেগুলোও তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সংগীতজগৎ থেকে হারিয়ে গেলেন তিনি। তিন দশকের বেশি সময় পর আবার ফিরে এসেছেন সংগীতজগতে। এবার গীতিকার হিসেবে নয়, এসেছেন শিল্পী হিসেবে।
তিনি আবদুল্লাহ আল মামুন। ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’ গানটি বাংলাদেশের শোনেননি, এমন সংগীতপ্রেমী খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।
কথা প্রসঙ্গে মামুন জানালেন, ১৯৭৭ সালে কলেজে এইচএসসিতে দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, মনে রং। কলেজেরই এক মেয়েকে দেখে হৃদয়ে আঁকেন নতুন ছবি। সেই ছবি বাস্তবে রূপ পায় ওই বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি। অচেনা মেয়েটির জন্য লিখে ফেলেন একটি কবিতা। প্রথম দুই লাইন ছিল এমন, ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে, আমি হৃদয়ের শো কেসে রাখব।’
মামুন বলেন, ‘কবিতাটি লিখে বন্ধু নকীব খানকে দেখাই। বললাম, কিছু করা যায় কি না দেখো। তিনি “শো কেসে” কেটে লিখে দেন কোঠরে। হয়ে গেল আমি হৃদয়ের কোঠরে রাখব।’
নকীব খান সুর দিয়ে মামুনের কবিতাটিকে গানে রূপ দিলেন। আর সেই গান কুমার বিশ্বজিতের কণ্ঠে পৌঁছে গেল সংগীতপাগল শ্রোতাদের কাছে। তারপর তো সব ইতিহাস।
কলেজজীবনেই মোটামুটি কবিতা আর গানের সঙ্গে ছিল মামুনের বসবাস। প্রথম গানের পর রোমান্টিক মামুন এবার নিজেকে খুঁজে পান যেন অন্যরূপে। জন্ম আর শৈশব কেটেছে সাগরপাড়ে। প্রিয় সাগরপাড়ে নিজের শৈশবের সেই ঘুরে বেড়ানো আর নানা স্মৃতি তুলে আনতে লাগলেন গানের ছন্দে। ১৯৭৭ সালের ২৪ আগস্ট লিখলেন আরেকটি কালোত্তীর্ণ গান ‘মুখরিত জীবনের চলার বাঁকে’। আবার বন্ধু নকীব খান সুর দিলেন তাঁর গানে। সোলসের শিল্পী তপন চৌধুরীর কণ্ঠে গানটি শ্রোতাদের মনে গেঁথে যায়। গানের সঙ্গে শ্রোতারাও যেন খুঁজে ফিরেন নিজেদের শৈশব। এরপর নকীব খানের কণ্ঠে ‘ছোট্ট বেলার সাথী’ গানটিও জনপ্রিয়তা পায়।
এইচএসসি পড়ার সময়ই লিখে ফেলেন আরও কয়েকটি গান। কিন্তু পেশায় প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল মামুন তৎকালীন চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তির পর কবিতা আর গান থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। প্রকৌশলে ডিগ্রি লাভের পর পুরকৌশল বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে উচ্চশিক্ষা ও জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। ব্যস্ত হয়ে পড়েন প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে।
তবে সংগীতজগতের সঙ্গে যাঁর মিতালি, যাঁর রক্তে মিশে আছে কবিতা আর গান, দেশ ছেড়ে চলে তিনি কি ভুলতে পারেন সেসব? এটাও ঠিক, মামুনের জনপ্রিয় গানগুলো বাংলাদেশের সংগীতজগতের সঙ্গে তাঁর অদৃশ্য একটি সেতুবন্ধনও তৈরি করে রেখেছিল। হয়তো তাই আবার শ্রোতাদের সামনে হাজির হলেন, তবে এবার কণ্ঠশিল্পী হিসেবে। এ যেন নতুন রূপে তাঁর ঘরে ফিরে আসা।
মামুন জানালেন, ছোটবেলায় বড় ভাই বদিউল আলমের কাছে গান শিখেছেন, গেয়েছেন। কণ্ঠশিল্পী হিসেবে প্রবাসে কিংবা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে প্রশংসিত হয়েছেন। এবার আনুষ্ঠানিকভাবে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করতে চেয়েছেন। আর এ জন্য নিয়ে এসেছেন একক অ্যালবাম। গত ২৫ নভেম্বর ঢাকার বেইলি রোডের একটি ক্যাফেতে তাঁর প্রথম একক গানের অ্যালবাম তোমার জন্য সিডির প্রকাশনা উৎসব হয়।
মামুন বলেন, সময়ের সঙ্গে সংগীতে মানুষের রুচি বদলে যাচ্ছে। যেমন পাশ্চাত্য সংগীত ধারার সংমিশ্রণে এখন বাংলা গানে ফিউশন মিউজিকের জোয়ার চলছে। বাংলা গানের মূল ভিত্তি হলো মেলোডি। বাঙালি সংস্কৃতি যত দিন বেঁচে থাকবে, তত দিন গানের এ ধারাটি বেঁচে থাকবে। বাংলা গানের সেই ক্ল্যাসিক বা মূলধারাকে ধারণ করেই তোমার জন্য অ্যালবামের গানগুলো সাজানো হয়েছে। এতে আধুনিক, ফোক ও সেমি-ধ্রুপদিসহ বিভিন্ন ধারার গান রয়েছে।
আবদুল্লাহ আল মামুনের এই অ্যালবামে কাজ করেছেন আলী হোসেন, শেখ সাদী খান, আলম খান, লাকী আখান্দের মতো বাংলাদেশের কালজয়ী সুরকার। গান লিখেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মো. রফিকুজ্জামান ও অনুপ ভট্টাচার্যের মতো গীতিকার। বাংলাদেশের সংগীতজগতে কোনো অ্যালবামে একসঙ্গে তাঁরা কখনো কাজ করেননি।