সে রকম এক শূন্যতার কথা ফেসবুকে লিখেছেন শিল্পী কল্পনা আনাম। গানের স্কুল ছায়ানটের টিচার্স টেবিলে বসলে সেই শূন্যতা তাঁকে পেয়ে বসে। হয়তো তাঁর বসার জায়গার উল্টো পাশেই বসতেন মিতা হক। ক্লাস শেষ করে এসে লাল চায়ে গলা ভেজাতেন। প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে আপন মানুষের মতো আড্ডা দিতেন। কল্পনা আনাম তাঁর স্মৃতি খুঁড়ে লিখেছেন, ‘এতই কি তাড়া ছিল তোমার চলে যাওয়ার, মিতা আপা! এখনো ছায়ানটের টিচার্স টেবিলে বসলেই মনে হয় তুমি হন্তদন্ত হয়ে এসে বসবে, প্রিণনের (ছায়ানটের ক্যানটিন...সেটাও এখন আর নেই...) দিকে তাকিয়ে একটা হাঁক দেবে, ‘একটা চিনি ছাড়া লাল চা দে তো রে বাবু!’ তারপর শুরু হয়ে যাবে তোমার এক রাশ গল্প। এখন পয়লা বৈশাখের বটমূল, ছায়ানট—সবকিছুই অনেক ম্লান লাগে তোমাদের মতো প্রিয় মুখগুলো নেই বলে। খুব ভালো আছো নিশ্চয়ই। খুব খুব ভালো থেকো অনেক অনেক আদরের মিতা আপা!’

রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিতা হক তাঁর সময়ের অন্যতম সেরা শিল্পী ছিলেন। একবাক্যে সেটা স্বীকার করবেন যে কেউ। প্রায় দুই শ রবীন্দ্রসংগীতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন তিনি। এককভাবে বেরিয়েছিল তাঁর ২৪টি অ্যালবাম, ১৪টি ভারত থেকে আর ১০টি বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশের ঢাকা মতো, ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও তাঁর বন্ধু ছিলেন অনেকে। তারা ঢাকায় এলে মিতার বাড়িতে যেতেই হতো, খেতেই হতো। সেই সঙ্গ, স্মৃতি, আতিথেয়তা কেউ কোনো দিনও ভুলবে না। মিতা চলে যাওয়ার পর সে কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন কলকাতার শিল্পী, মিতাদের বন্ধুজন শ্রীকান্ত আচার্য।

মিতা হক জন্মেছিলেন পরাধীন বাংলায়, ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায়। চাচা ওয়াহিদুল হক ছিলেন দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক ও রবীন্দ্র গবেষক। তাঁর কাছেই গানে হাতেখড়ি। পঞ্চকবিকে ধারণ করতে মিতাদের শিখিয়েছিলেন তিনিই। পরে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খান ও সন্‌জীদা খাতুনের কাছে গান শেখেন মিতা। ১৯৮৫ সালের ১ জানুয়ারি তিনি বিয়ে করেন অভিনেতা খালেদ খান যুবরাজকে। দুইয়ে মিলে এক অদ্ভুত জোড় পায় ঢাকার সংস্কৃতি অঙ্গন। যুবরাজের অভিনয়ে মুগ্ধ ছিলেন মিতা। মিতার গানে মুগ্ধ ছিলেন যুবরাজ। ২০১৩ সালে দুজন দুজনকে হারিয়ে ফেলেন। সেই মৃত্যু যেন আরও শক্তিশালী করে তোলে মিতাকে। একা হাতে সংসার আর সন্তানকে মানুষ করে তোলেন তিনি। সঙ্গে সন্তানস্নেহে নিজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ভাইকেও। সেই লড়াকু মিতাকে দেখে অনেকে শক্তি পেত। সামনে থেকে দেখা সেই মিতা, সামনে বসে শোনা মিতার গান এখন কেবলই স্মৃতি। মিতা হককে এখন দেখতে চাইলে ভরসা ইউটিউব, শুনতে চাইলে ভরসা ধারণ করা গানগুলো।

তিনি ২০১৬ সালে মিতা পেলেন শিল্পকলা পদক। ২০২০ সালে একুশে পদক। মিতার প্রাপ্তির ঢের বাকি ছিল। দেওয়ারও ছিল অনেক কিছু। কিন্তু খেলিছে এ বিশ্ব লয়ে যে বিরাট শিশু আনমনে, সে কি আর দেনা–পাওনার হিসেব বোঝে?