যার ছায়া পড়েছে, মনের আয়নাতে

ফেরদৌসী রহমান
ফেরদৌসী রহমান

খুব খারাপ লাগছে হক ভাইয়ের জন্য। ইচ্ছা ছিল তাঁকে দেখতে যাব। কিন্তু নিজের অসুস্থতার কারণে যাব, যাচ্ছি করে আর সময় করতে পারিনি। এখন তো মানুষটা চলেই গেলেন। তাঁর বাড়ি আর আমার দাদার বাড়ি রংপুর। সে কারণে একটা নৈকট্য ছিল। ভীষণ স্নেহ করতেন তিনি আমাকে। অনেক কথাই মনে পড়ছে। তখন আমার ক্যারিয়ারের উঠতি সময়। একদিন তিনি আমাদের পুরানা পল্টনের বাড়িতে এলেন, আমার একটা সাক্ষাৎকার নিতে। তিনি তখন একটি পত্রিকায় কাজ করেন। পত্রিকার নামটি ঠিক এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। সাক্ষাৎকার দিতে গিয়েই প্রথম তাঁর সঙ্গে আলাপ, পরিচয়। ভারি সুন্দর একটি লেখা তিনি লিখেছিলেন।
যা-ই হোক, আমি তাঁর লেখা গান প্রথম গাই সুভাষ দত্ত পরিচালিত সুতরাং ছবিতে। সত্য সাহার সুরে ওই ছবিতে দুটি গান করি। প্রথম গানটি ছিল ‘পরানে দোলা দিলো এ কোন ভ্রমরা’। ওই ছবির আরেকটি গানও গাই ‘নদী বাঁকা জানি, চাঁদ বাঁকা জানি, তাহার চেয়ে আরো বাঁকা তোমার ছলনা’। দ্বৈত এ গানটি আমি গাই আমার ভাই মোস্তাফা জামান আব্বাসীর সঙ্গে। এটাই দুই ভাইবোনের একসঙ্গে গাওয়া প্রথম কোনো গান। দুটো গানই সুরকার সত্য সাহা আমাদের পল্টনের বাড়িতে এসে শিখিয়ে গিয়েছিলেন। একটু নিজের দোষও স্বীকার করি। ওই সময় কে গান লিখেছেন, কে সুর করেছেন, এগুলো নিয়ে এত মাথাব্যথা ছিল না। ডাক পড়লে স্টুডিওতে গিয়ে শুধু গান গেয়ে দিয়ে আসতাম। কিন্তু এখন এর গুরুত্ব বুঝি। কারণ এটি ছিল সুভাষ দত্ত, কবরী, সত্য সাহা, সৈয়দ শামসুল হক—প্রত্যেকেরই প্রথম চলচ্চিত্রে কাজ করা।
এরপর একই পরিচালকের আয়না ও অবশিষ্ট ছবিতে হক ভাইয়ের লেখা একটি গান করি। গানটি ছিল ‘যার ছায়া পড়েছে, মনের আয়নাতে, সেকি তুমি নও ওগো তুমি নও’। এই গানটিও বেশ জনপ্রিয় হয়।
হক ভাই সম্পর্কে অনেক কথাই আজ বলতে ইচ্ছে করছে। ৩০ বছর আগে অভিনেত্রী লায়লা সামাদের মেয়ের বিয়েতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা। একই টেবিলে সেদিন বসেছিলাম। তিনি তখন আমাকে বলছিলেন, আমার বাবা আব্বাস উদ্দিন আহমেদকে নিয়ে বই লিখতে। ভীষণভাবে বললেন, আপনার বাবা সম্পর্কে পাঠককে জানাতে আপনার চেয়ে ভালো কেউ লিখতে পারবে না। আমি এমনিতে খুব অলস। ‘অচল আনি’র মতো ভাবতাম নিজেকে। কিন্তু সেদিন তাঁর সেই উৎসাহ পরবর্তী সময়ে গানের পাখি ফেরদৌসী রহমান বইটি তৈরিতে ছিল সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
একটু অভিমানের কথাও বলি। আমার বইটিতে বিভিন্নজন লিখেছেন আমার সম্পর্কে। হক ভাইকে আমি ফোন করে একটা লেখা দিতে অনুরোধও করেছিলাম। কিন্তু তিনি দিচ্ছি, দেবেন করে আর দেননি। একদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হতেই বললাম, লেখাটা তো দিলেন না। তিনি বললেন, ‘লেখা রেডি। একটা সনেট লিখেছি আপনাকে নিয়ে।’ আমি বললাম, লোক পাঠিয়ে দিই। তিনি বললেন, পাঠিয়ে দিন। কিন্তু লোক পাঠানোর পরও লেখাটা পাইনি। অনেক অভিমান হয়েছিল। পরে ভেবেছি, কোনো দিন তাঁর সেই সনেটটি পেলে নতুন সংস্করণে বইয়ে সংযুক্ত করে নেব। কিন্তু তা আর হয়নি।