লাকী আখান্দ্‌ বাংলা গানের অন্যতম বরপুত্র। অথচ যেখানে থাকার কথা, আমরা তাঁকে সেই জায়গায় কি রাখতে পেরেছি? তিনি এমন একসময়ে চলে গেছেন, যখন বাংলাদেশের গানের ভুবন চূড়ান্তভাবে একটা অন্য বাস্তবতায় ঢলে পড়েছে। অনলাইনের নিরুদ্দেশযাত্রায় পাড়ি জমিয়েছে তাঁর সুরারোপিত গানগুলো। সেই গানের কথাকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী, প্রযোজক—সবার মধ্যে একটা নীরব দ্বন্দ্ব, কে হবে গানটির প্রকৃত মালিক! কার ভান্ডারে এসে জমা হবে গান থেকে উৎসারিত অর্থ। যদিও এসব গান থেকে সামান্যই পেয়েছিলেন লাকী আখান্দ্‌, অন্যদের জন্য রেখে গেছেন অগুনতি প্রাপ্তির সম্ভাবনা। ‘লিখতে পারি না কোনো গান, আজ তুমি ছাড়া’র কথা বললেই লোকে বলে, এটা জেমসের গান। কেউ বলে না এটা লাকীর গান। ‘কবিতা পড়ার প্রহর’ গেয়েছিলেন সামিনা চৌধুরী, ‘মামুনিয়া’ ফেরদৌস ওয়াহিদ, ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’ কুমার বিশ্বজিতের, ‘কে বাঁশি বাজায় রে’ গেয়েছিলেন তাঁরই ভাই হ্যাপি আখান্দ্‌। পরে গানটি যে কার, সে কথা আর কেউ মনে রাখেনি।

default-image

সত্তরের দশকের বাংলাদেশে গান করা লাকী ছিলেন এতটাই অগ্রসর যে বিশ্বসংগীতের সেদিনকার চর্চা তাঁর ছিল প্রায় নখদর্পণে। জ্যাজ-ব্লুজ ঘরানার ছায়া পাওয়া যেত তাঁর গানে। ম্যাক্সিকান, রুশ সংগীত উপভোগের অভিজ্ঞতাও লেপ্টে ছিল তাঁর সংগীতকর্মে। ‘এই নীল মণিহার’ গানটা মনে পড়ে? ভাষাটা হাওয়া করে চোখ বুজে কেবল সুরটুকু শুনলে কিছু বোঝা যায়? আবার ধরা যাক ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’ গানটার কথা। লাকী এ গানের সুর করেছিলেন ইমন রাগে। হিন্দুস্তানি রাগও আছে তাঁর সুরের ভান্ডারে। গানটি গেয়েছিলেন ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী। প্রয়াণের পর লাকীকে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, তাঁর গান ও সুর সত্যিই মানুষের মনের কোথায় যেন নাড়া দেয়।’

default-image

লাকী অনুভব করতেন, একটি গান যদি ২০-২৫ বছর না বাঁচে, গান করে লাভ কী? নিজেই বলেছিলেন এ কথা। নিজের করা প্রতিটি গানে তিনি সেই উপাদান রেখে গেছেন, যা গানগুলোকে বহুকাল বাঁচিয়ে রাখবে। তাঁর সুর বা সংগীত পরিচালনা বা গাওয়া গানগুলো বাংলার অমর সৃষ্টি। ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’, ‘আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না’, ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গানগুলো ইতিমধ্যে যে কালোক্তীর্ণ গানের মর্যাদা লাভ করেছে, তা বলাই বাহুল্য।

default-image

লাকী ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক। শিল্পী নকীব খান তাঁর গান প্রথম শুনেছিলেন বেতারেই। ‘জন্মভূমি বাংলা মাগো’ গানটি ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছিল তাঁকে। একদিন তিনিও বলেছিলেন আক্ষেপ করে, ‘বাংলা গানে এক ভিন্ন ধারার জন্ম দিয়েছিলেন লাকী। চলচ্চিত্রের বাইরে এত জনপ্রিয় গান আর কেউ আমাদের উপহার দিতে পারেননি। কিন্তু আমরা তাঁর সঠিক মূল্যায়ন করতে পারিনি।’

২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল গান ফেলে, সুর ফেলে চলে যাওয়া লাকীকে অমর করে রাখতে পারেন শিল্পীরা, যাঁরা তাঁর গানগুলো কণ্ঠে তুলে নেন। কেবল গাওয়ার সময় মনে করিয়ে দিলেই তরুণ প্রজন্ম জানতে পারবে, হৃদয় তোলপাড় করা গানটি কোন হৃদয় থেকে উৎসারিত।

গান থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন