'অনিন্দিতার ঠাকুরদার ঝুলি'

সুন্দর সংকলন। প্রতিটি গানই সুনির্বাচিত। পরিবেশনার মাঝে গানের সূত্র ধরে কথা। আয়োজনের শিরোনামও দর্শকদের মন কেড়েছে ‘অনিন্দিতার ঠাকুরদার ঝুলি’। আর বাইরে তখন ছিল ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। সব মিলিয়ে দারুণ এক সন্ধ্যা কেটেছে আজ ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে।
নজরুল-পুত্র অনিরুদ্ধ কাজী ও পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীর কন্যা অনিন্দিতা কাজী শুক্রবার ছুটির সন্ধ্যায় নজরুলকে তাঁর অনুরাগীদের সামনে মেলে ধরতে বেছে নেন বিচিত্র বিষয়। ওপার বাংলার একটি চ্যানেলে উপস্থাপনা আর বারবার এখানে আসায় ঢাকাবাসীর কাছে তিনি বেশ পরিচিত। অনিন্দিতা গান গাইবেন, কথা বলবেন দাদুকে নিয়ে- তা জেনে অনুষ্ঠান শুরুর আগেই শ্রোতারা আসতে থাকেন। নজরুলকে নিয়ে বললেন নিজের ভাবনার কথা। জানালেন নিজের জীবনের কিছু কথা আর গাইলেন সেসব কথামালার মাঝে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৭ তম জয়ন্তী আসন্ন। এ উপলক্ষে শুক্রবার ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তাদের গুলশানের মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। কেন্দ্রের পরিচালক জয়শ্রী কুণ্ড শ্রোতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন অনিন্দিতা কাজীর। সুপরিসর ছিমছাম ঘরটিতে উপস্থিত সকলের শুভেচ্ছা নিয়ে তিনি শুরু করলেন কবিতার মতো করে বলা, ‘ছোটবেলা থেকেই নিজের মনের মাঝে গেরুয়া বর্ণের এক যোগীকে নিয়ে বাস করতেন দাদু। নিজের আলো ছড়িয়ে তিনি অন্যের আঁধার কাটিয়েছেন। তবে যোগি তিনি হননি। হয়েছিলেন নতুন যুগের সঙ্গী...।’
কথা শেষে গান-‘আমার গানের মালা আমি করব কারে দান’। চর্চিত কণ্ঠে স্পষ্ট উচ্চারণ। প্রথম গানেই শিল্পী কুড়িয়ে নিলেন মিলনায়তনভর্তি শ্রোতার ভালোবাসার করতালি। এর পর গান, কবিতা আর কথাকে জড়িয়ে নিলেন একসঙ্গে। সুরের সঙ্গে বয়ে গেয়ে কবিতার শব্দমালা। সে সঙ্গে উঠে এলো সাম্যের কবির দুখু মিয়া থেকে কাজী নজরুল হয়ে ওঠার গল্প। কখনো তার শিক্ষাজীবন, কখনো লেটোর দলে যোগদান, দেশপ্রেমের টানে সৈনিক হওয়া কিংবা উচ্ছল নজরুলের বিনা টিকিয়ে রেল ও জাহাজে করে ঢাকায় আগমনের কথা। ছিল তার প্রেমের কথাও। সে সঙ্গে সৃষ্টিকর্মের প্রেক্ষাপটও উঠে এলো সবার সামনে।
নজরুলের যাপিত জীবন ব্যাখ্যা করে অনিন্দিতা কাজী বললেন, তিনি দিনের বেলায় রুটির দোকানে কাজ করতেন, রাতের বেলা করেছেন পুঁথিপাঠ। নজরুলের মানবপ্রেমের কাছে সকল ধর্মই হয়ে গিয়েছিল সমান। এভাবেই হয়ে উঠেছিলেন সাম্যের কবি। অন্যদিকে এই মানুষটিই আবার ছিলেন ক্রীড়ামোদী। ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে বন্ধুদের এক করে ফেলতেন। যে দলে ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসুর মতো সাহিত্যিকেরা। তুমুল আড্ডাবাজির বিষয়টি ছিল তার স্বভাবে। এমন করতে করতে তিনি বিনা টিকিটে ট্রেন আর লঞ্চে চড়ে চলে আসেন ঢাকায়। এমন অনেক গল্প আছে তার আড্ডাবাজির।
রবীন্দ্র-নজরুলের সম্পর্কের কথাও উঠে আসে তার কথায়। বলেন, ‘দাদু কবিগুরুর আশীর্বাদ পেয়েছেন সব সময়। তাকে নিয়ে দাদু কবিতাও লিখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন-‘হে কবি, হে ঋষি অন্তর্যামী আমারে করিও ক্ষমা।’ কবিতাটি আবৃত্তি করেও শোনান অনিন্দিতা।
দু’ঘণ্টার এ আয়োজনে অনিন্দিতা গেয়ে শোনান ‘প্রজাপতি প্রজাপতি’, ‘এই সুন্দর ফুল, এই সুন্দর ফল’, ‘জানি জানি প্রিয়’, ‘প্রিয় যাই যাই বলো না’, ‘পথ চলিতে যদি চকিতে’’, ‘ওরে নীল যমুনার জল’সহ নজরুলের বাছাইকৃত কিছু গান।