সোমবার সকালে যশোর সদর উপজেলার সুজলপুর গ্রামের বাড়িতে তাঁর মরদেহ পৌঁছালে শেষবারের মতো দেখতে ভিড় করেন একসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে রিকশা চালানো সহযোদ্ধা বন্ধুরা।

গতকাল রোববার বিকেলে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে মারা যান আকবর। হাসপাতালের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মিরপুর ১৩ নম্বর এলাকার বাসায়। বাদ এশা মিরপুর ১৩ নম্বর কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ নিয়ে স্ত্রী-কন্যাসহ আত্মীয়স্বজন রওনা করেন যশোরের উদ্দেশে। দিবাগত রাত দেড়টার সময় তাঁরা সেখানে পৌঁছান।  

গায়ক আকবর যশোর সদর উপজেলার সুজলপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি দুই স্ত্রী, তিন সন্তানসহ অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী রেখে গেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন। গ্রামে থাকেন তাঁর প্রথম স্ত্রী ও দুই ছেলে। আকবারের টিনের জীর্ণ বাড়িতে তাঁর প্রথম স্ত্রী ফাতেমা বেগম ও দুই ছেলে বসবাস করেন। দুই ছেলে রংমিস্ত্রির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আর প্রথম স্ত্রী অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী। আকবর তারকাখ্যাতি পাওয়ার বছর পাঁচেক পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সেই স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় থাকতেন। দ্বিতীয় সংসারে তাঁর একটি মেয়েও আছে। দ্বিতীয় বিয়ের পর প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের তেমন খোঁজ রাখতেন না।

আকবরের প্রথম স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আকবর যখন রিকশা চালাত, তখন আমি পরের বাসায় কাজ করতাম। আমাদের সংসারে কষ্টের মধ্যেও সুখ ছিল। গায়ক হওয়ার পর পাঁচ বছর আমরা একসঙ্গে সুখেই ছিলাম। “ইত্যাদি”র হানিফ সংকেত স্যারের কাছে গোপন করে আকবর দ্বিতীয় বিয়ে করে। আর আমাকে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। এর পর থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ কমতে থাকে।’

তবিবর নামের রিকশাচালক বলেন, ‘একসঙ্গে আমি আর আকবর এই শহরে কত রিকশা চালিয়েছি। আকবর কিশোর কুমারের মতোই গান করত।’

১০ বছর ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন আকবর। পাঁচ বছর হলো তাঁর শরীরে বাসা বাঁধে জন্ডিস, রক্তে প্রদাহসহ নানা রোগ। তাই আগের মতো মঞ্চে গাইতেও পারতেন না। এ বছরের জানুয়ারি থেকে তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। আকবরের দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শরীরে পানি জমে তাঁর ডান পা নষ্ট হয়ে যায়। গত অক্টোবরে সেই পা কেটে ফেলা হয়। পা কাটার পর বেড়ে যায় তাঁর কিডনি ও লিভারের সমস্যা। এ জন্য আকবরকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার কথাও ছিল। গত বুধবার ভিসাও পেয়েছিলেন। কিন্তু তখন আকবরকে নিয়ে ভারতে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না। গতকাল বেলা ৩টায় ৫৪ বছর বয়সে মারা যান তিনি।

২০০৩ সালে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে কিশোর কুমারের গাওয়া ‘একদিন পাখি উড়ে যাবে’ নতুন করে গেয়ে যশোরের রিকশাচালক আকবর সবার কাছে গায়ক আকবর হিসেবে পরিচিতি পান।

এই গানের পর ‘ইত্যাদি’তে ‘তোমার হাতপাখার বাতাসে’ গানটি দেশ-বিদেশের দর্শক-শ্রোতার কাছে তাঁকে আরও বেশি পরিচিত এনে দেয়। ১৯ বছর ধরে এভাবেই গাইছিলেন। একটা সময় টের পান, শরীরে বাসা বেঁধেছে নানান রোগ। কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে কয়েক দফায় দেশে ও দেশের বাইরে চিকিৎসা নেন আকবর।

গায়ক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার আগে যশোরে রিকশা চালাতেন আকবর। খুলনার পাইকগাছায় জন্ম হলেও আকবরের বেড়ে ওঠা যশোরে। ২০০৩ সালে যশোর এম এম কলেজের একটি অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন আকবর। বাগেরহাটের এক ব্যক্তি আকবরের গান শুনে মুগ্ধ হন। তিনি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে চিঠি লেখেন আকবরকে নিয়ে। এরপর ‘ইত্যাদি’ কর্তৃপক্ষ আকবরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ওই বছর ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানে কিশোর কুমারের ‘একদিন পাখি উড়ে’ গানটি নতুন সংগীতায়োজনে গেয়ে সবাইকে অবাক করে দেন।