গান দিয়ে বিভক্ত রাজনীতিকে এক করেছিলেন বব মার্লে
১৯৭৮ সালের ২২ এপ্রিল, সংগীতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রথমবারের মতো এদিন মঞ্চে ফেরেন বব মার্লে। ১৯৭৬ সালের ৩ ডিসেম্বর নিজ বাড়িতে হামলায় বুক ও হাতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে ছিলেন। প্রায় দুই বছর পর কিংস্টনের ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ান লাভ পিস কনসার্ট’-এ তাঁর এই প্রত্যাবর্তন হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক।
‘থার্ড ওয়ার্ল্ড উডস্টক’ নামে পরিচিত এই আয়োজনের লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক সহিংসতায় বিভক্ত জ্যামাইকায় ঐক্য ফিরিয়ে আনা। সেখানে দেশটির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মাইকেল ম্যানলি ও এডওয়ার্ড সিগাকে মঞ্চে এনে হাত মেলাতে রাজি করান মার্লে, যা সংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য মুহূর্ত।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে জ্যামাইকা তীব্র রাজনৈতিক সহিংসতায় জর্জরিত ছিল। পিপলস ন্যাশনাল পার্টি (পিএনপি) ও জ্যামাইকা লেবার পার্টির (জেএলপি) দ্বন্দ্বে রাজধানী কিংস্টনসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাং সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৬ সালের নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি এতটাই অবনতি হয় যে জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়। সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেই আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন মার্লে।
১৯৭৮ সালের ‘ওয়ান লাভ পিস কনসার্ট’, যেখানে প্রায় ৩০ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। বিকেল পাঁচটায় শুরু হয়ে পরদিন ভোর পর্যন্ত চলে এ আয়োজন। এটি শুধু একটি সংগীতানুষ্ঠান ছিল না; ছিল সহিংসতায় বিধ্বস্ত একটি দেশের জন্য সাময়িক স্বস্তি ও আশার বার্তা। যদিও সেই মুহূর্ত জ্যামাইকায় স্থায়ী শান্তি আনতে পারেনি, তবু মার্লের মঞ্চের সেই আহ্বান আজও সংগীতের মাধ্যমে ঐক্যের শক্তির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে।
এই কনসার্টে অংশ নেন জ্যামাইকান বড় বড় তারকা—বিগ ইয়ুথ, মাইটি ডায়মন্ডস থেকে শুরু করে আলথিয়া ও ডোনা। জ্যাকব মিলার সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে গান পরিবেশন করেন। পিটার টশ মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী ম্যানলিকে সরাসরি সমালোচনা করে পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত করে তুললেও পরে ‘লিগালাইজ ইট’ গান গেয়ে পরিস্থিতি সামলে নেন।
সবশেষে মঞ্চে আসেন বব মার্লে। ‘ট্রেঞ্চটাউন রক’, ‘ন্যাটি ড্রেড’, ‘ওয়ার’—এমন গান দিয়ে তিনি ঐক্যের বার্তা দেন। ‘জ্যামিং’ গান গাওয়ার সময় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ডেকে নেন ম্যানলি ও সিগাকে এবং বলেন, ‘চলো আমরা হাত মেলাই, সবাইকে দেখাই—আমরা ঐক্যবদ্ধ।’ এরপর তাঁদের সঙ্গে হাত মেলান তিনি। এরপর ‘ওয়ান লাভ’ গানে ধীরে ধীরে শেষ হয় অনুষ্ঠান।
নির্বাসনকালে লন্ডনে থেকেই মার্লে ও তাঁর ব্যান্ড দ্য ওয়েইলার্স রেকর্ড করেন ‘এক্সোডাস’ (১৯৭৭) অ্যালবাম। এতে ‘জ্যামিং’, ‘থ্রি লিটল বার্ডস’সহ একাধিক জনপ্রিয় গান রয়েছে। অ্যালবামটি পরবর্তী সময়ে সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। রোলিং স্টোনের তালিকায় এটি সর্বকালের সেরা ৫০০ অ্যালবামের মধ্যে ৪৮ নম্বরে স্থান পেয়েছে।
বায়োগ্রাফি ডট কম ও দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে